দেশের গর্ব টাঙ্গাইলের শাড়ি

টাঙ্গাইলের পরিচিতি তুলে ধরতে কবিতার এ দুটি চরণই যথেষ্ট-
‘চমচম টমটম গজারির বন,
টাঙ্গাইল শাড়ি তার গরবের ধন।’
টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির সুনাম রয়েছে দেশব্যাপী। টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের সুতি শাড়ির পাশাপাশি বিগত শতাব্দীর আশির দশক থেকে জামদানি শাড়িও বেশ জনপ্রিয়।

টাঙ্গাইল শাড়ি শুধু টাঙ্গাইলেরই গর্বের বস্তু নয়। এ নিয়ে বাংলাদেশও গর্ব করে। আর এর সুনাম ও চাহিদা শুধু দেশে নয়, প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তান ছাড়িয়ে ইউরোপ-আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসহ জাপানেও বিস্তৃত।

Tangail-Picture-(01)-11.04.16টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ভারত, লন্ডন, আমেরিকা, দুবাই, সৌদি আরব, কানাডা, ইউকে, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশেও রফতানি করা হয়। টাঙ্গাইলের এই শাড়ির ঐতিহ্য প্রায় আড়াইশ’ বছরের।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের গোড়াপত্তনের সময় ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে মসলিন শাড়ির কিছু শিল্পী এসে টাঙ্গাইলে বসতি স্থাপন করেন। তাদের মাধ্যমেই সমৃদ্ধ কুটিরশিল্প হিসেবে তাঁতশিল্পের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সে সময় টাঙ্গাইলে মসলিন শাড়িও তৈরি হতো। টাঙ্গাইলের তাঁত শাড়ির বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা অতি মিহি সুতোয় নিপুণভাবে বোনা। তাঁতে এই শাড়ি বোনার সময়ই মাড় দেয়ার কৌশলটিও লক্ষণীয়। বোনার পর তা বাজারজাত করার জন্য ইস্ত্রির প্রয়োজন পড়ে না।

এই শাড়ি বোনার সময়ই নিপুণ শিল্পীরা এতে নানা রকম ফুল বা নকশা কাটেন। আর এই নকশা কাটা শাড়ির নামই জামদানি। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের পাথরাইল, চন্ডি, পুটিয়াজানি, বেলতা, বাজিতপুরসহ আশপাশের এলাকার তাঁত শ্রমিকরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।

Tangail-Picture–11.04.16কেউ চরকায় সুতা কাটছেন, কেউ বা সুতা টানা দিচ্ছেন, কেউ কেউ আবার তাঁতে শাড়ি বুনছেন। সব মিলিয়ে তারা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। বর্তমানে তাঁত শ্রমিক, মালিক ও ব্যবসায়ীদের যৌথ প্রচেষ্টায় এখন আর কোনো প্রতিকূলতা নেই।

যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তাঁতের শাড়িতে এসেছে আধুনিক বৈচিত্র্য। পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও তাঁতের শাড়ি তৈরির কাজ করছেন। ‘জামদানি’ আরবি শব্দ যার অর্থ ফুল-কাটা বা নকশা-তোলা। আর এ কারণেই নকশা তোলা শাড়ির নাম হয়েছে ‘জামদানি’।

জামদানি শাড়ির আদি এলাকা মূলত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। কিন্তু টাঙ্গাইলের মিহি তাঁতের শাড়িতে ফুল তোলার মধ্য দিয়ে টাঙ্গাইলের জামদানি শাড়ির যাত্রা শুরু হয়। তবে এই শাড়ির ঐতিহ্য এখন টাঙ্গাইলের দখলে। টাঙ্গাইলের জামদানি শাড়ির রঙেও নানা বাহার।

শুধু জামদানি নয়, টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িও চিরায়ত বাঙালি নারীর প্রথম পছন্দ। জামদানি শুধু সুতিই হয় না, এখন সিল্ক ও সিনথেটিক সুতাতেও এ শাড়ি বোনা হয়ে থাকে। এর নামও যেমন হরেকরকম, দামেও তেমন রকমফের অনেক।

টাঙ্গাইলের মিহি তাঁতসমৃদ্ধ বিশেষ করে যে তাঁতের শাড়িকে মোহনীয় নকশায় জামদানি হিসেবে প্রস্তুত করা হয় এমন তাঁতসমৃদ্ধ উল্লেখযোগ্য গ্রামগুলো হচ্ছে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বাজিতপুর ও সন্তোষ এবং দেলদুয়ার উপজেলার চন্ডি, পাথরাইল, নলসোঁধা, নলুয়া, দেউজান ও বকুলতলা।

এছাড়াও মোটা তাঁতের শাড়ি প্রস্তুত হয় টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বিন্যাফৈর, বেলতা, বড় বেলতা এবং কালিহাতী উপজেলার বল্লা, রামপুর, কুকরাইল প্রভৃতি গ্রামে। মিহি তাঁতের শাড়িই টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য এবং এই শাড়ির খ্যাতিই দেশের গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।

টাঙ্গাইলের তাঁতপল্লী এলাকা হিসেবে খ্যাত দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইলের বিশিষ্ট শাড়ি প্রস্তুতকারী ও ব্যবসায়ী রঘুনাথ বসাক জানান, সিল্ক জামদানির মূল্য মাত্র ৭০০ টাকা থেকে সাধারণত সর্বোচ্চ ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ৭০-৮০ হাজার টাকা মূল্যের সিল্ক ও সুতি জামদানিও টাঙ্গাইলে প্রস্তুত হয়। এছাড়াও রয়েছে তসর (রেশম সুতা) জামদানি ৫০০ টাকা থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা, হাফসিল্ক জামদানি ৭০০ থেকে তিন হাজার টাকা, ফুলসিল্ক জামদানি, সফ্টসিল্ক জামদানি ও ফোরপ্লাই জামদানি চার হাজার থেকে ২৮ হাজার টাকা।

আরো রয়েছে ডেনু জামদানি। যার মূল্য ৭০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। রঘুনাথ বসাক জানান, ডেঙ্গু নামে সিনথেটিক সুতায় তৈরি শাড়িকে মূলত ডেনু জামদানি নামে অভিহিত করা হয়। ভীতিকর ডেঙ্গুজ্বরের নামের সঙ্গে এর নাম মিলে যাওয়াতেই এ-ব্যবস্থা।

তাঁতসমৃদ্ধ টাঙ্গাইল জেলায় হস্তচালিত তাঁতসহ বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় দেড় লাখ তাঁত রয়েছে। এসব হচ্ছে পিটলুম তাঁত, চিত্তরঞ্জন তাঁত ও পাওয়ারলুম তাঁত। মূলত হস্তচালিত তাঁতে বোনা টাঙ্গাইল শাড়িই প্রধান। এই তাঁতশিল্পের সঙ্গে মালিক পর্যায়ের ১০ হাজারেরও বেশি এবং শ্রমিক পর্যায়ে নারী-পুরুষ মিলিয়ে দুই লাখেরও বেশি মানুষ যুক্ত।

একজন শ্রমিক সাধারণত হস্তচালিত তাঁতে একদিনে একটি শাড়ি বুনতে পারেন। জটিল ও বেশি মাত্রার সূক্ষ্ম কারুকাজ করা শাড়ি বুননে সময় লাগে বেশি। ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মূল্যের মাত্র একটি শাড়ি বুনতে তিন মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তবে খুব কম হলেও ৭০-৮০ হাজার টাকা মূল্যের শাড়ি বিশেষ অর্ডারে বোনা হয়।

আর এ শাড়ির বুননে কখনো এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে। বুননের সময়ের ভিত্তিতে শ্রমিকের মজুরি দিতে হয় বলেই শাড়ির দাম বেড়ে যায়। বিভিন্ন রঙের সুতা ব্যবহারের মাধ্যমে বুননশৈলীর মধ্যেই রয়েছে শাড়ির ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্য।

বুননের পর ফুল-তোলা বা নকশা-কাটার বাড়তি সুতা কাঁচি দিয়ে কেটে চূড়ান্তভাবে নকশা ফুটিয়ে তোলেন মহিলা তাঁতশিল্পীরা। একজন পুরুষ তাঁতশিল্পী দিনে ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ও মহিলা তাঁতশিল্পী বাড়ির কাজের ফাঁকে ফাঁকে চরকা কাটা ও নকশা কাটার কাজে দিনে ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন।