ধৈর্য ও সাহসের প্রতিমূর্তি শেখ হাসিনা

দিনটি ছিল ১৭ই মে, ১৯৮১। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা ফিরে এলেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে। এদেশের ভাগ্যাকাশে যখন দুর্যোগের কালো মেঘের ঘনঘটা, ক্যু-হত্যা যখন নিত্য নৈমিত্তিক, জাতি যখন নেতৃত্বশূন্য ও লক্ষ্যভ্রষ্ট; তখনই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা। ওবায়দুল কাদের তখন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন আর আমি সাধারণ সম্পাদক। নেতা আসবেন, তাই তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য একমাস আগে থেকেই আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম। আমরা সংগঠিত করেছিলাম ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের। ১৫ ই আগস্টের সেই হূদয়বিদারক ঘটনার পর আমরা বঙ্গবন্ধুর রক্ত ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিলাম—এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব সৃষ্টি হবে, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেবো, ছাত্রলীগকে সংগঠিত করবো । আমরা সারা বাংলাদেশের ছাত্রলীগকে সংগঠিত করেছিলাম। ছাত্রলীগের সকল নেতাকর্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় জড়ো হয়েছিল সেদিন। তারপর সেখান থেকে আমরা গিয়েছিলাম বিমানবন্দরে, নেতাকে স্বাগত জানাতে। পুরো বিমানবন্দর এলাকা লোকে লোকারণ্য, যেন জনসমুদ্র। গণতন্ত্রের মুখোশধারী স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু আর অপপ্রচারকে উপেক্ষা করে সেদিন জনসমুদ্র ছুটে এসেছিল প্রাণের নেতাকে শুভেচ্ছা জানাতে। সবার মুখে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান। হাতে বঙ্গবন্ধুর ছবি, রঙ্গিন পোস্টার, ব্যানার, নৌকার প্রতিকৃতি। সেই জনসমুদ্র দেখে আবেগে অশ্রুু গড়িয়ে পড়েছিল। পিতা এবং তাঁর কন্যার প্রতি মানুষের এত গভীর ভালোবাসা দেখে আবেগের অশ্রুকে রুদ্ধ করতে পারিনি সেদিন।

আকাশ ছিল মেঘলা। নেত্রীকে এক নজর দেখার জন্য সবাই রানওয়ের ভেতর ঢোকার চেষ্টা করছিল। নিরাপত্তা বাহিনীকে বেশ হিমসিম খেতে হয়েছিল। আমরা রানওয়ের ভেতরে ছিলাম। নেতাকে বয়ে আনা বিমান যে অবতরণ করবে সে জায়গাও ছিল না। সেদিন আমরা জনতাকে বহুকষ্টে সরিয়ে বিমান অবতরণের জায়গা করে দিয়েছিলাম। জাতির পিতার রক্তে ভেজা মাটিতে বিমান স্পর্শ করার খানিক পরেই আকাশ ভেঙে নেমেছিল বৃষ্টি। বাংলার আকাশ বঙ্গবন্ধুর প্রাণপ্রিয় তনয়ার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খুশিতে আবেগে অঝোরে কেঁদেছিল সেদিন। নেত্রীকে বহনকারী বিমানটি রানওয়ে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে জনতার মিছিল যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।

এর কিছুক্ষণ পর বিমানের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পুষ্পার্ঘ্যে শোভিত বঙ্গবন্ধুর কন্যা জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানানোর সাথে সাথেই আনন্দ-বেদনায় কান্নার রোল ওঠে সমগ্র বিমানবন্দর এলাকা জুড়ে। ‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, শ্লোগানের মাধ্যমে নেত্রীকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি জনতার কণ্ঠে বজ্রনিনাদে ঘোষিত হচ্ছিল ‘হাসিনা তোমায় কথা দিলাম-পিতৃ হত্যার বদলা নেবো’ শ্লোগানটি। এই শ্লোগানটির মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি, শেখ হাসিনার প্রতি মানুষের তীব্র আবেগ ও ভালোবাসা। মানুষের সেই তীব্র ভালোবাসা দেখে শেখ হাসিনা নিজেও কান্না ধরে রাখতে পারেননি। এতদিন হূদয়ের রক্তক্ষরণ জমাট বেঁধে ছিল বুকের ভেতরে, তা অশ্রুবিন্দু হয়ে দু’চোখ বেয়ে নেমেছিল তাঁর। সেদিন তিনি পিতা-মাতা, ভাই-বোনসহ স্বজন হারানোর বেদনায় কাতর হয়ে শেরেবাংলা নগরের সমাবেশে বলেছিলেন, ‘ বাংলার জনগণের পাশে থাকার জন্য আমি এসেছি, মুক্তির সংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য আমি এসেছি- আমি আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার জন্য আসিনি। আমি আপনাদের বোন হিসেবে, কন্যা হিসেবে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আপনাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। আমি সামান্য মেয়ে। সক্রিয় রাজনীতি হতে দূরে থেকে আমি ঘরসংসার করছিলাম। কিন্তু সবকিছু হারিয়ে আপনাদের মাঝে এসেছি।

যাঁর জন্য আমাদের এই স্বাধীন দেশ, তাঁকেই নরপিশাচের দল স্বাধীনদেশে সাড়ে তিন বছরের বেশি বাঁচতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর হত্যার বদলা নিতে আমরা যখন সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিলাম, তখন আমাদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার,নিপীড়ন। মিথ্যা হুলিয়া, গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলা-হামলায় দিশেহারা, দিকভ্রান্তের মতো পালিয়ে বেড়াতে যখন বাধ্য হচ্ছিলাম, তখন নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আমাদেরকে আবারো নতুনভাবে লড়াইয়ে উজ্জীবিত করে তুলেছিল। সেই লড়াই ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই। জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধের লড়াই। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার লড়াই। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে আমরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম সেই লড়াইয়ে।

দেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নিতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে যখন হত্যা করা হয়েছিল, তখন যদি তার দুই আত্মজা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশে থাকতেন, তবে নরপিশাচদের গুলি তাঁদেরকেও বিদ্ধ করত নি:সন্দেহে। জাতির পিতার রক্ত রাখা যাবে না এই বাংলার মানচিত্রে, এমনি ছিল ওই নরঘাতক চক্রের লক্ষ্য। ‘নির্বংশ’ করতে চেয়েছিল জাতির জনকের পুরো পরিবারকে। সৌভাগ্যক্রমে জনকের দুই তনয়া তখন জার্মানিতে ছিলেন, নাহলে মৃত্যু ছিল তাঁদের জন্যও অবধারিত। ১৫ আগস্টের মাত্র কয়েকদিন আগেই তিনি স্বামীর সাথে তাঁর কর্মস্থল পশ্চিম জার্মানিতে গিয়েছিলেন। তাঁদের দেশে ফিরিয়ে এনে হত্যা করার জন্য বঙ্গবন্ধুর খুনিরা সব ধরনের চেষ্টা করেছিল। জার্মানি দূতাবাস তাঁকে আশ্রয় দিতে পারেনি বিভিন্ন চাপের মুখে। ওরাই লন্ডনে যোগাযোগ করে শেখ হাসিনা ও রেহানাকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু লন্ডনে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন দু’বোন। তত্কালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী পরম মমতায় তাঁদেরকে নিজ দেশে আশ্রয় দেন।

ওই সময়টা ছিল উত্তাল এক সময়। খুনি সামরিক শাসক চক্র কারাগারের অভ্যন্তরে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করেছিল। রাজনীতিবিদদের বিশেষ আইনে কারান্তরীণ করে রেখেছিল। সেনাবাহিনীর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের অফিসার ও জওয়ানদের ফায়ারিং স্কোয়াডে অথবা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হচ্ছিল। বেসামরিক প্রশাসনে মুক্তিযোদ্ধা ও সত্ অফিসারদের কোণঠাসা করে পাকিস্তানিকরণ ও সামরিকীকরণ চলতে থাকে। স্বঘোষিত খুনিরা ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার সহযোগী, আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দুর্দমনীয়। ঐতিহাসিক অ্যান্থনি ম্যাসকার্নহাস ওই সময়ের অবস্থা বর্ণনা করে লিখেন— ‘সে সময় দুর্নীতির মাত্রা দারুণভাবে বেড়ে যায়। জিয়া নিজকে আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখার মানসে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক করে তোলেন।’ জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদের ইনডেমেনিটিই কেবল দেওয়া হয়নি, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী ঘাতক-দালালরা কেবল অপরাধ থেকে মাফ পেয়ে যায়নি, রাজনৈতিক দল করার পর্যন্ত অধিকার পেয়েছিল। এক ব্যক্তির স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির শাসনকে আড়াল করার জন্য সেনাশাসক জিয়া সামরিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই সময়। তার নির্দেশে সারাদেশে নির্বিচারে গুম-হত্যা চলতে থাকে। দেশব্যাপী এক অস্থির ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যেন আগ্নেয়গিরির ওপর বসেছিল দেশ। আওয়ামী লীগ ছিল কোণঠাসা, ছত্রভঙ্গ, বহুধা বিভক্ত। এমন পরিস্থিতির মাঝেই ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আবদুল মালেক উকিল, সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, আব্দুল মান্নান, বেগম সাজেদা চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ডা. এস.এ. মালেকসহ ডাকসাইটে নেতারা এবং অগণিত কর্মী সমর্থকরা শেখ হাসিনাকে সভাপতি করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। ‘জাতির পিতার রক্ত বইছে যাঁর দেহে, তিনিই পারবেন আওয়ামী লীগকে তার ক্রান্তি দশা থেকে উঠিয়ে অতীত ঐতিহ্যের মত সমুজ্জ্বল করে তুলে ধরতে’, এমন বিশ্বাস থেকেই নেতাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল।

কিন্তু ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের বিভীষিকাময় বৈরী পরিবেশে স্বদেশের মাটিতে এসে রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ছিল অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু শেখ হাসিনার শরীরে প্রবাহিত হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি অকুতোভয় দেশপ্রেমিক শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনার এই পদ গ্রহণে সম্মতি প্রদান করা ছিল এক বিরল সাহসী পদক্ষেপ। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি তার চেয়েও বেশি সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। ১৯৮১ সালের ৫ মে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় বক্স আইটেমে শেখ হাসিনা এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেই তিনি বাংলাদেশে যাচ্ছেন। সেই সময় থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে ফেরার পরদিন থেকেই শেখ হাসিনা একদিকে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও ভাবাদর্শগতভাবে সুসংবদ্ধ করে তোলার লক্ষ্যে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতে থাকেন। বহুধাবিভক্ত ব্র্যাকেটবন্দী আওয়ামী লীগকে জাতীয় মূলধারার প্রধান দল হিসেবে গুছিয়ে তোলা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সব ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করে দেশের সর্ববৃহত্ ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটিকে যুগোপযোগী করে তুলেছেন।

১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশে ফিরে এসেই তিনি গণতন্ত্রের জন্যে আজীবন সংগ্রামের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। সেই প্রত্যয়ের স্বরূপ দেখি ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চে এরশাদ কর্তৃক ঘোষিত সামরিক শাসনের দুইদিন পর স্বাধীনতা দিবসের দিনে শেখ হাসিনা সাভার স্মৃতিসৌধে দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, ‘আমি সামরিক শাসন মানি না, মানব না। বাংলাদেশে সংসদীয় ধারার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবই করব।’ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে গিয়ে তাঁকে অনেক চড়াই উত্রাই পার হতে হয়েছে। শত কোটি প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে। তা করেই দীর্ঘ একুশ বছর পর ঊনিশ’শ ছিয়ানব্বই সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তিনি। তাঁর সুযোগ্য বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যেতে থাকে দ্রুতগতিতে। ভারতের সাথে ত্রিশ বছর মেয়াদী গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি,যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণসহ অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজে দেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে। কিন্তু ২০০১ সালে নির্বাচনী সূক্ষ্ম কারচুপি এবং ষড়যন্ত্রের কারণে পরাজিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানি ভাবধারায় বিশ্বাসী শাসকগোষ্ঠীর জন্য, রাজাকার আলবদর দিয়ে গঠিত সরকারের কারণে দেশ উল্টোরথে যাত্রা করে ক্রমশ অন্ধকারের দিকে যেতে থাকে । তারা শেখ হাসিনার প্রাণনাশের প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। শেখ হাসিনা জীবিত থাকতে তারা এদেশকে জঙ্গিদের আস্তানা ও পাকিস্তানের তাঁবেদারি রাষ্ট্র বানাতে পারবে না, এ জন্য তারা ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করেছিল শেখ হাসিনার ওপর। ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলায় সৌভাগ্যবশত নেতা বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু মারাত্মক আহত হয়েছিলেন তিনি। প্রাণ হারিয়েছিলেন আইভি রহমানসহ চব্বিশজন নেতাকর্মী, আহত হয়েছিলেন পাঁচ শতাধিক। সেবারই শুধু নয়, উনিশবারের মত তারা আপাকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। কখনো তাঁর বাসভবনে, কখনো জনসভায়, আবার কখনো গাড়ি বহরে। কিন্তু তিনি ভয় পাননি। সব সময়ই তিনি বলেন, ‘বাবার মত আমাকে যদি জীবন উত্সর্গ করতে হয়, আমি তা করতে প্রস্তুত।’ অনেকবার হোঁচট খেয়েছেন, কিন্তু কখনোই মুখ থুবড়ে পড়েননি। অপরাজেয় সাহসে উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেছেন সামনের দিকে। এক এগারো পরবর্তী শাসনামলে সেনা ও নিরপেক্ষ দাবিদার সুশীল সমাজ সমর্থিত ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে বিদেশে নির্বাসনে রেখে দেশকে সামরিক শাসনের দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ২০০৭ সালের ৭ মে দ্বিতীয়বারের মতো স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে সেই প্রচেষ্টাকে বানচাল করে দেন তিনি। তাঁকে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তিনি অপশক্তির কাছে মাথানত করেননি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দেশের জনগণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে তিন-চতুর্থাংশ ভোটে বিজয়ী করেছিল। এরপর থেকে এ পর্যন্ত তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির সোপানে।

তাঁরই হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের ফাঁসি, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে ঝোলানোর মধ্যে দিয়ে দেশ দায়মুক্ত, কলঙ্কমুক্ত হতে পেরেছে। তাঁরই বলিষ্ঠ ও সাহসী নেতৃত্বগুণে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। স্বপ্ন দেখছে উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছার। অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা থেকে শুরু করে সর্বত্রই আজ উন্নয়নের জোয়ার। ডিজিটাল বাংলাদেশের দ্বারপ্রান্তে আমরা। মানুুষের মুখে ফুটেছে হাসি। আজকের বাংলাদেশের এই উন্নয়নের ভিত্তিমূল শেখ হাসিনার সেই স্বদেশ প্রত্যার্বতনের মধ্যেই রয়েছে। তিনি যদি দেশে ফিরে না আসতেন, না হাল ধরতেন, তবে বাংলাদেশ আবারো ফিরে যেত পাকিস্তানের করতলে। আজ আমরা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার দ্বারপ্রান্তে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। বঙ্গবন্ধুুর পরই ক্যারিশমেটিক নেতা হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হচ্ছে। কর্ম ও গুণের স্বীকৃতিস্বরূপ সাউথ সাউথ, চ্যাম্পিয়নস অব দ্যা আর্থসহ বিভিন্ন পুরস্কারে তাঁকে ভূষিত করছে দেশ-বিদেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। ধৈর্য ও সাহসের প্রতিমূর্তি শেখ হাসিনা বহুমাত্রিক এক জ্যোতিষ্ক। তাঁকে কেন্দ্র করে, তাঁর নেতৃত্বেই আবর্তিত হচ্ছে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। সেজন্যই প্রয়াত কবি ত্রিদিব দস্তিদার শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই বলতে হয়, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ’। আপনি দীর্ঘজীবী হউন।

n লেখক: সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ