রুখতে পারেনি দারিদ্র্য

নিজে হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তবু তার স্বপ্ন দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের বাল্যবিবাহ রোধ করা। কিন্তু এ স্বপ্নের পথে বিধবা মায়ের অভাবী সংসারের কোনো বাধা ঠেকাতে পারেনি পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা সদরের দক্ষিণ বাজারের বাসিন্দা খাইরুন্নাহারকে। একই উপজেলার ধাবড়ী গ্রামের দারিদ্র্যপিষ্ট জেলে দম্পতির মেয়ে মঞ্জিলার সংগ্রাম আরো কঠিন। তিন বেলার পরিবর্তে দিনে ভালোভাবে দুই বেলা খাবার জোটে না, রাতে কুপি জ্বলে না ঠিকমতো। কিন্তু কোনো বাধাই সামনে দাঁড়াতে পারেনি মঞ্জিলার। দারিদ্র্যজয়ী আরেক যোদ্ধা নাটোর সদর উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী মাশরাফি আহমেদ। মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করা মায়ের এ সন্তানটি বড় কোনো স্বপ্নই দেখতে চায় না। স্বপ্ন শুধু তার মায়ের কষ্ট দূর করা। এ তিনজনই এবার এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে নিজ নিজ এলাকায় বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। খাইরুন্নাহার : পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা সদরের দক্ষিণ বাজারের বাসিন্দা খাইরুন্নাহারের দুই বোন, এক ভাই আর মায়ের সংসারে উপার্জনক্ষম কোনো পুরুষ নেই। এমন কষ্টের সংসারে নিরন্তর জীবনসংগ্রামে টিকে থাকা বিধবা মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে দেয় দুই মেয়ে। ছোট মেয়ে খাইরুন্নাহার পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা সদরের সরকারি এসবি সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবার মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছে। এই খাইরুন্নাহার ২০১০ সালে কাউখালী সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে কাউখালী উপজেলার মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিল। অভাবী মায়ের সংসারে কোনো প্রকার প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পায়নি খাইরুন। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত আর বাড়িতে বসে মনোযোগী লেখাপড়ার কারণেই বিধবা মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছে সে। খাইরুনের বড় বোন কামরুন্নাহারও লেখাপড়ায় ভালো। সে বরিশাল বিএম কলেজে অনার্সে লেখাপড়া করছে। তার ছোট ভাইটি স্কুলে পড়ছে। পারিবারিক সূত্র জানায়, পিরোজপুরের কাউখালী শহরের দক্ষিণ বাজারের বাসিন্দা সাহিদা বেগমের স্বামী মো. মোফাজ্জেল হোসেন ২০০৯ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর জীবিকা আর দুই মেধাবী মেয়ে ও এক ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে তাঁকে বাসাবাড়িতে শিশুদের কোরআন শিক্ষা দিয়ে আয় করা অর্থে চলতে হচ্ছে। মা সাহিদা বেগম বলেন, ‘মেয়েটা কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে, স্কুলের স্যারেরা ওকে সহযোগিতা করেছে বলেই ও ভালো ফল করেছে। আমি খুব আনন্দ পেয়েছি। এ আনন্দ বোঝানোর ভাষা আমার নাই। আমার মেয়ে দুইটা যেন মানুষ হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে এ জন্য দোয়া করবেন।’ তিনি জানান, অভাবের কারণে ভালো কলেজে মেয়েকে পড়ানো নিয়ে তিনি চিন্তিত। খাইরুন্নাহার বলে, ‘মায়ের কষ্ট আর প্রিয় স্যারদের সহযোগিতায় যে ফল পেয়েছি তার জন্য কৃতজ্ঞ। মায়ের কষ্টের সংসারের অভাব দূর করতে চাই।’ সে বলে, ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করতে চাই। সহপাঠী অনেককেই ঝরে পড়তে দেখেছি। সমাজের এ ব্যাধি দূর করতে চাই।’ খাইরুন জানায়, সে ভবিষ্যতে সুচিকিৎসক হয়ে আর্তপীড়িত মানুষের সেবা করতে চায়। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘খাইরুন্নাহার অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। বিধবা মায়ের এ সন্তানটি অনেক কষ্টে লেখাপড়া করেছে। খাইরুন্নাহার নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ছিল। পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ায় ভালো ফল করেছে। ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।’ মঞ্জিলা : জেলে পরিবারের সন্তানরা মাছ ধরা ও জালের সঙ্গেই বেড়ে ওঠে। দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনে জেলে শিশুদের শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়াই নিয়তি। কিন্তু জেলের মেয়ে মঞ্জিলা ব্যতিক্রম। পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের ধাবড়ী গ্রামের দরিদ্র জেলে দম্পতি ইয়াকুব হোসেন ও লাল বানু বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে মঞ্জিলা দ্বিতীয়। সে এবার সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের ইজিএস শিক্ষানিকেতন থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ ৫ অর্জন করেছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মঞ্জিলার মা-বাবা দুজনই সন্ধ্যা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা চালান। সাত সদস্যের পরিবারের বাবার পক্ষে কোনো কোনো দিন চাল কেনার পয়সাও জোগাড় করা সম্ভব হয় না। জেলে মা-বাবাকে দুই বেলাও ঠিকমতো খাবারের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হয়। এরই মধ্যে মঞ্জিলাসহ তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব। এমন অবস্থায়ও এক দিনের জন্য স্কুল ফাঁকি দেয়নি মঞ্জিলা। লেখাপড়ায় সে ভীষণ মনোযোগী। মঞ্জিলা জিপিএ ৫ পাওয়ায় স্থানীয় লোকজন তাকে এখন ‘জেলের ঘরের আলো’ বলে ডাকে। অনেকেই মঞ্জিলাকে দেখতে আসছে। মঞ্জিলার বাবা জেলে ইয়াকুব হোসেন বলেন, ‘মাইয়ার স্কুলের সব খরচ জোগাড় করতে পারি নাই। নদীতে মাছ ধইরা ভাতের জোগান দিয়ে সম্ভব না। স্কুলের শিক্ষকরা মঞ্জিলারে সাহায্য করেছে। ওর এই ফলাফলে আমরা শুধু না, গ্রামের সব মানুষ খুশি হইছে।’ তিনি জানান, পাঁচ সন্তানই লেখাপড়ায় মনোযোগী হওয়ায় জেলে ইয়াকুব হোসেন ও লাল বানু কঠোর পরিশ্রম করেন। লাল বানু স্বামীর সঙ্গে মাছ ধরার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজও করেন। মা লাল বানু বলেন, ‘পোলা মাইয়ারে কখনো ভালো খাবার ও জামাকাপড় দিতে পারি নাই। তবে লেখাপড়ায় সাহস দিয়েছি। ওরা শুনেছে। আমার মঞ্জিলা নিশ্চয়ই একদিন আরো লেখাপড়া করে ডাক্তার হবে। আমাদের অভাবমোচন হবে। সবাই দোয়া করবেন।’ মঞ্জিলা বলে, মা-বাবার কষ্ট দূর করতে চাই। তাঁদের কষ্টেই লেখাপড়া চলছে। স্কুলের স্যারেরাও খুব সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতে লেখাপড়া করে ভালো চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা আছে।’ মঞ্জিলার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপন কুমার চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘মেধাবী মেয়েটি আমাদের বিস্মিত করেছে। আমরা ওর সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’ গতকাল দুপুরে মঞ্জিলার বাড়িতে যান স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবু সাইদ মিয়া মনু। তিনি মঞ্জিলার হাতে ফুল, কিছু উপহার সামগ্রী তুলে দেন। এ সময় চেয়ারম্যান আবু সাইদ মনু মঞ্জিলার এইচএসসিতে পড়ার পুরো দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মাশরাফি : দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা নাটোর সদর উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের মাশরাফি শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ পায়নি। ছোটবেলায় বাবা আনোয়ার হোসেন শিশু মাশরাফি ও তার মাকে ফেলে চলে যান। পরে তার ঠাঁই হয় মামার বাড়ি নাটোর সদর উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামে। এর পর থেকে আর কোনো দিন বাবা আনোয়ার মাশরাফি ও তার মায়ের খোঁজ নেননি। তাই ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী প্রতিবন্ধী মাশরাফির। মা মাফিয়া বেগম অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে বড় করে তুলছেন বাঁ হাত অকেজো মাশরাফিকে। অল্প আয় ও অন্যের সহায়তা নিয়ে তিনি মাশরাফির বই-খাতা ও লেখাপড়ার সামগ্রী জোগাড় করতে হয়েছে। যেদিন বাড়িতে তেলের অভাবে হারিকেন জ্বলত না, সেদিন মাশরাফি অন্যের বাড়িতে গিয়ে লেখাপড়া করেছে। খেয়ে না খেয়ে নিয়মিত স্কুলে গিয়েছে। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় সে জিপিএ ৫ পেয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। মাফিয়া বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যত দিন শরীরে সামর্থ্য ছিল, গায়ে-গতরে খেটে ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা করেছি। এখন আমি নিজেই কিডনি রোগে আক্রান্ত। নিজের চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নেই। তাই ছেলের লেখাপড়ার খরচ কিভাবে জোগাড় করব আর কিভাবেই সে লেখাপড়া করবে বুঝতে পারছি না।’ ছাতনী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, মাশরাফি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে মাশরাফির নামে প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এই সামান্য কটি টাকায় তো আর লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব নয়। সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আবেদন জানান তিনি।