ফলে রাসায়নিক ব্যবহার রোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ

শুরু হয়েছে আম, আনারস ও লিচুসহ হরেক রকম দেশী ফলের মৌসুম। প্রতি বছরের মতো এবারো মৌসুমি এসব ফল সংরক্ষণ ও কৃত্রিমভাবে পাকানোর জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় ফলে ফরমালিন, কার্বাইডের মতো রাসায়নিকের ব্যবহার রোধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একই অনুরোধ জানিয়ে শিল্পমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা ও বিভিন্ন মহল থেকে দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে রাজশাহী, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে ভেজালবিরোধী অভিযান।

গত ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিল্প সচিবকে দেয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ফল সংরক্ষণ বা কৃত্রিমভাবে পাকানোর জন্য ফরমালিন, কার্বাইড ছাড়াও গাছের ফলন বৃদ্ধিতে ‘কালটার’ নামক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। কালটার ব্যবহারে স্বল্পমেয়াদে উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন কমে আসবে। এ ধরনের কী কী ক্ষতিকর পদার্থ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার করা হয়, সে-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে পদার্থগুলোর উৎপাদন, আমদানি বিষয়ে নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। খাদ্য সংরক্ষণে নিরাপদ প্রিজারভেটিভ প্রচলন ও ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহার রোধে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয় ওই চিঠিতে।

নিরাপদ খাদ্য আইনের ২৩ ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি বা তার পক্ষে নিয়োজিত ব্যক্তি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অথবা বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী রাসায়নিক দ্রব্য বা উপাদান ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট, কীটনাশক, খাদ্যের রঙ বা সুগন্ধি ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ পাঁচ ও সর্বনিম্ন চার বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৫ লাখ ও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে আইনে দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

এদিকে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শিল্পমন্ত্রীকে একটি চিঠি দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। ওই চিঠিতে বলা হয়, দেশীয় আমের পাশাপাশি আমদানিকৃত ফলের ওপরও ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। এতে দেশী ফলের মতো আমদানিকৃত ফলেও ফরমালিন রয়েছে কিনা, সে বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব। সেই সঙ্গে ক্ষতিকর এসব রাসায়নিক বাজারজাতকরণ বন্ধে কার্যকর মনিটরিং জোরদারের অনুরোধ করা হয় ওই চিঠিতে।

মৌসুমি ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার রোধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (প্রশাসন) তাহের জামিল বণিক বার্তাকে বলেন, ফলের মৌসুম ও রমজান সামনে রেখে অভিযান জোরদার করা হচ্ছে। অচিরেই তারা দেশী-বিদেশী ফলে ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে কিনা, তা পরীক্ষার জন্য অভিযানে নামবেন।

বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান: মৌসুমি ফলে ফরমালিন ও কার্বাইডের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন মহলের উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে রাজশাহী ও নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—

রাজশাহী: বাঘা উপজেলার পীরগাছা বাজারে কেমিক্যাল মেশানো ১৫ মণ আম জব্দের পর ধ্বংস করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল দুপুরে ওই অভিযান চালানো হয়। ওই সময় অপরিপক্ব আম পেড়ে কেমিক্যাল মিশিয়ে সেগুলো বাজারে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ব্যবসায়ীরা। তবে অভিযান টের পেয়ে পালিয়ে গেছেন ওই দুই ব্যবসায়ী।

ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুল ইসলাম। পরে তার নির্দেশেই জব্দকৃত আম জনসম্মুখে ধ্বংস করা হয়।

বাঘা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল গাফফার জানান, সকালে অপরিপক্ব লকনা ও গুটি আম গাছ থেকে নামিয়ে কেমিক্যাল দিয়ে পাকাচ্ছিলেন উপজেলার মিলিকবাঘা গ্রামের ব্যবসায়ী মাতবর আলী ও স্থানীয় পীরগাছা এলাকার আবদুল খালেক। স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পেরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে খবর দেন। পরে পুলিশ নিয়ে সেখানে অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হামিদুল ইসলাম। কিন্তু টের পেয়ে আগেই পালিয়ে যান দুই ব্যবসায়ী।

নাটোর: গত বৃহস্পতিবার বাগাতীপাড়া উপজেলার রহিমানপুর খামার বজরাপুর গ্রামে অপরিপক্ব আমে কেমিক্যাল মেশানোর দায়ে মতিন ওরফে মতিউর (৩৮) নামে এক আম ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন বাগাতীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খোন্দকার ফরহাদ আহমদের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ইউএনও অফিস সূত্রে জানা যায়, মতিন ওইদিন সকালে একটি আমের বাগান থেকে অপরিপক্ব লকনা আম পেড়ে তাতে আম পাকানোর নিষিদ্ধ কেমিক্যাল মেশাচ্ছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশ মতিন ও তার সহযোগী মিঠুনকে (৩০) ঘটনাস্থল থেকে আটক করে এবং আম পাকানোর জন্য ব্যবহূত কেমিক্যালসহ ওইসব আম জব্দ করে। পরে তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করলে আদালত মতিনকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন। এ সময় জব্দকৃত আম ধ্বংস করা হয়।