বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় সমাধান

ড. বিয়রন লোমবোরগ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট

অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন, অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পরিকল্পনাগুলোর গুরুত্ব বিন্যাস করা এত জরুরি কেন? আমি উত্তরে বলি, আসলে সম্পদের পরিমাণ সীমিত, তাই আপনি যদি সম্পূর্ণ টাকাটা একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে খরচ করে ফেলেন; যেমন ধরুন, বায়ুদূষণ প্রতিরোধ, অনিবার্যভাবে তার কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি অথবা অন্য কোনো খাতের ক্ষেত্রে খরচ কম করতে হবে। আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেব যে, এই বিষয়গুলোর মধ্যে কোনগুলো খরচের উপযুক্ত, যেখানে তহবিল সীমিত? এবং আমরা কীভাবে জানব আমাদের প্রথম কোনটির সম্মুখীন হওয়া উচিত? এখানেই আমাদের গবেষণা অত্যন্ত মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মনে করুন, আপনি একটি রেস্তোরাঁয় গিয়েছেন এবং আপনাকে একটি খাদ্যতালিকা দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিটি খাবারের পাশে জিভে জল আনা বর্ণনা দেওয়া আছে; কিন্তু প্রতিটি পদের জন্য আপনাকে কত মূল্য পরিশোধ করতে হবে অথবা একটি থালায় কী পরিমাণ খাবার থাকবে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া নেই। এ ব্যাপারটির আসলে উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে ঘিরে যে পরিমাণ আলোচনা হয়, তার সঙ্গে অনেকটা মিল আছে। অধিকাংশ সময়ই মানুষ সেসব কর্মসূচির দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়, যেগুলো গণমাধ্যমে বেশি প্রচার পায় অথবা যেগুলোর সুসংগঠিত জনসংযোগ প্রচারাভিযান হয় অথবা যেগুলো প্রবলভাবে আবেগ এবং অনুভূতি উদ্রেক করতে পারে; কিন্তু অবধারিতভাবে এগুলোই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল নয়।

সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সমাধান কোনগুলো তা প্রকৃতপক্ষে অনুসন্ধান করতে আমাদের কার্যপ্রক্রিয়া ব্যয়-সুবিধা বিশেল্গষণ ব্যবহার করে আমরা তালিকায় দাম প্রকাশ করি এবং আমরা আপনাকে এটাও জানাই যে, প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য মূল্য পরিশোধের বিনিময়ে আপনি ঠিক কী পাবেন। আমরা সবচেয়ে কার্যকর উপায়ের জন্য সীমিত সম্পদ ব্যবহারের পরামর্শ দেই। আমরা মানুষকে ব্যয়িত প্রতি টাকায় বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সুফল পেতে অনুপ্রাণিত করতে চাই, হোক সেটি জাতীয় সরকার, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা অথবা বেসরকারি খাতের মাধ্যমে।

কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন সমাধানের গুরুত্ব বিন্যাস করা হয়, তার একটি উদাহরণ হতে পারে জরায়ুর মুখের ক্যান্সার। বাংলাদেশের নারীদের জন্য এটি সবচেয়ে খারাপ ক্যান্সারগুলোর অন্যতম এবং প্রতি বছর এর ফলে প্রায় ১০ হাজার নারী মারা যায়। আমরা জানি, কীভাবে এর মোকাবেলা করতে হয়, হয় টিকা দেওয়ার মাধ্যমে অথবা পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসার মাধ্যমে; কিন্তু এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে যায়। এটি এতটাই ব্যয়বহুল যে, ব্যয়িত প্রতি টাকায় এটি এক টাকারও কম কল্যাণ সাধন করবে। আর এই রোগটি যেমন ভয়াবহ, এর চেয়েও অনেক বেশি খারাপ রোগ আছে। উদাহরণস্বরূপ_ যক্ষ্মা, যার ফলে বাংলাদেশে প্রতি বছর জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের তুলনায় আটগুণ বেশি মানুষ মারা যায়। এর মানে প্রতি ঘণ্টায় নয়টি মৃত্যু। কিন্তু ওষুধের সাহায্যে যক্ষ্মার চিকিৎসার অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত উপায় রয়েছে এবং এটি অপেক্ষাকৃত সস্তা। এছাড়াও কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা করার মাধ্যমে আপনি ওই ব্যক্তি থেকে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবেন, যা যক্ষ্মার চিকিৎসাকে একটি অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগ করে তোলে। আমাদের গবেষণা অনুযায়ী, কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিকের মাধ্যমে যক্ষ্মার চিকিৎসা দেওয়া জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার চেয়েও ৫০ গুণ বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, জরায়ুর মুখের ক্যান্সার কোনো মারাত্মক রোগ নয়, যা অনেক মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ আমাদের এই সমাধানগুলোর তুলনামূলক খরচ এবং উপকার সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়, যা আমাদের আরও বেশি অবগত হতে সাহায্য করতে পারে; যেহেতু বাংলাদেশ সম্মুখীন হচ্ছে এমন সমস্যাগুলোর মোকাবেলা কীভাবে করতে হবে সেই বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিই।

যদি আমরা দেখতে চাই যে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পরিকল্পনাগুলো কী কী। দেখব সাশ্রয়ের দিক থেকে, সরকারের বিভিন্ন কার্যাবলির উন্নয়নের জন্য ডিজিটাল পদ্ধতির প্রবর্তন এমন একটি কৌশল যার মাধ্যমে অবিশ্বাস্য রকম কল্যাণ সাধন করার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি একটি বিষয় যা নিয়ে জাতীয় সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনুসন্ধানও করেছে; বিশেষ করে যখন ক্রয় সংক্রান্ত ব্যাপার এসেছে। সরকার প্রতি বছর ক্রয় পদ্ধতির পেছনে ৭২ হাজার কোটি টাকা খরচ করে পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে সরকারি অফিসের জন্য পেন্সিল পর্যন্ত সবকিছুর দাম পরিশোধ করতে। কিন্তু এই প্রক্রিয়াটি খুবই অনুপযোগী। কারণ ঠিকাদারদের দরপত্রের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করতে হয় এবং কখনও কখনও রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো অন্য প্রতিযোগীদের বাধা দিতে পারে। এটি খরচ বৃদ্ধি, দীর্ঘ বিলম্ব এবং নিম্নমানের উৎপাদনের দিকে পরিচালনা করে।

সরকারি ক্রয় পদ্ধতির জন্য একটি অনলাইন কর্মপন্থা তৈরি করার মাধ্যমে, সরকার যেটিকে ই-জিপি বলে থাকে, পুরো পদ্ধতিটি বদলে ফেলা যায়। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ অনলাইনে দরপত্র দাখিল করতে পারবেন, যা প্রতিযোগিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে। আমাদের বিশেল্গষণ দেখায় যে, ই-প্রকিউরমেন্ট ১০ শতাংশেরও বেশি মূল্য হ্রাস করে, করদাতা এবং দাতাদের জন্য অর্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে। সরকারের সব ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, প্রতি বছর সড়ক ব্যবস্থাপনায় সরকারি খরচ জোগান দেওয়ার মতো একটি বড় অঙ্কের টাকা বাঁচাতে পারবে। এটি একটি বিপুল সঞ্চয় যা দেশের জন্য বিপুল পরিমাণে সুফল বয়ে আনতে পারে, শুধু সম্পদগুলোকে আরও বেশি বুদ্ধিমত্তা ও কার্যকরভাবে খরচ করার মাধ্যমে।

একইভাবে জমি রেকর্ড করার পদ্ধতি ডিজিটালে রূপান্তর করাটা লাখ লাখ টাকা সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাছাড়াও সারাদেশের নাগরিকদের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগের দ্বার খুলে দেয়। বর্তমানে প্রকৃতভাবে যত জমি বিদ্যমান আছে তার চেয়ে বেশিসংখ্যক জমির রেকর্ড আছে। কম করে বললেও এই পদ্ধতিটি বিভ্রান্তিকর। রেকর্ডগুলো সেকেলে এবং সারাদেশে দায়ের করা হয় এমন কাগজের টুকরার ওপর নির্ভর করে এবং এই পদ্ধতির জটিলতা কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবি করার সুযোগ করে দেয়। তাই এর পরিবর্তে অনেক মানুষ অবৈধ স্বত্ব এবং দলিল ব্যবহার করতে পছন্দ করেন; কিন্তু এটি সম্পত্তির অধিকারকে দুর্বল করে দেয় এবং অর্থনৈতিক কার্যকলাপের গতিকে মন্থর করে দেয়।

স্বয়ংক্রিয় রেকর্ডের প্রবর্তন জমির স্থানান্তরকে অনেক বেশি সহজ করবে এবং বিপুল পরিমাণে সময় ও অর্থ বাঁচাবে। বর্তমানে গতানুগতিকভাবে একটি জমি রেকর্ডের জন্য লেনদেন করতে আপনার এক হাজার টাকার বেশি খরচ হবে, কমপক্ষে এক মাস সময় লাগবে এবং সরকারি অফিসে পাঁচবার ঘুরে আসতে হবে। ডিজিটালে রূপান্তর করার সঙ্গে সঙ্গে খরচ মাত্র ৮০ টাকায় নেমে আসবে, সময় লাগবে দুই সপ্তাহ এবং যেতে হবে দু’বার। কিন্তু এর ফলে সবচেয়ে বড় সুবিধা যা আসবে তা হলো অনেক বেশি নিরাপদ সম্পত্তির অধিকার পাওয়া, যা উচ্চমাত্রায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। অনেক দেশের ওপর করা বড় মাত্রার আনুমানিক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে আমাদের গবেষণা অনুমান করে যে, জমির ডিজিটালে রূপান্তর করাটা আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ১৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি কল্যাণ বয়ে আনবে। এই প্রত্যেকটি ডিজিটালে রূপান্তর সমাধান ব্যয়িত প্রতি টাকায় ৬০০ টাকার বেশি কল্যাণ সাধন করবে, যেগুলো বাংলাদেশের জন্য আমাদের অনুসন্ধানকৃত যে কোনো প্রস্তাব থেকে পাওয়া সর্বোচ্চ আয়গুলোর অন্যতম।

এই পরিপ্রেক্ষিতে এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের। তারা কোন বিষয়গুলো গ্রহণ করবে এবং কোন ক্রমবিন্যাসটি তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হয়। তবে আমাদের বিশেল্গষণগুলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করার ক্ষেত্রে দৃঢ় তথ্য-প্রমাণ প্রদান করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের গবেষণায় প্রাপ্ত একটি ফল হলো যে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে অধিকতর বিনিয়োগ পানীয় জলের ব্যবস্থা করার মতো ততটা কার্যকর হবে না। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধির ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে। তাই অতিরিক্ত সুবিধা এ ক্ষেত্রে একেবারে অল্পই হবে। কিন্তু ২৫ শতাংশ পরিবারে যে পানির উৎস আছে, তা আর্সেনিক দ্বারা দূষিত। যার ফলে প্রতি বছর ৬৩ হাজার মানুষ মারা যায়। আপনি প্রতি পরিবারপিছু দুই হাজার টাকারও কম ব্যয় করে এই পরিবারগুলোর জন্য ভালো কূপ অথবা পরিশোধন ব্যবস্থা পেতে পারেন এবং কার্যত এসব মৃত্যু রোধ করতে পারেন। এটি ব্যয়িত প্রতি টাকায় চার থেকে সাতগুণ বেশি কল্যাণ সাধন করতে পারে।

আরেকটি উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, শ্রেণীকক্ষে অধিক কম্পিউটার এবং পাঠ্যপুস্তক দেওয়ার কর্মসূচি সম্ভবত গড়ে তেমন খরচ-উপকারী হবে না। এটি অনেককে অবাক করতে পারে। কারণ শ্রেণীকক্ষে অধিক প্রযুক্তি স্থাপন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি কৌশল। আর এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ব্যাপার। কারণ এর পরিবর্তে আপনি ওই সম্পদগুলো প্রাক-শৈশব শিক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় করতে পারেন; যে ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য সব উপকার আছে বলে প্রমাণিত হয়েছে।