পদ্মায় পাইলিং দৃশ্যমান, হচ্ছে পিলারও

ইংরেজি ‘ভি’ (ঠ) উল্টো করে দেখলে যেমন দেখায় ঠিক তেমনিভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে পদ্মা সেতুর পিলার। এখন জাজিরা অংশে যে চারটি পিলার গড়ে তোলার কাজ চলছে সেখানেও এ উল্টো ভি আকৃতির স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এ অবস্থায় ৩ মিটার পরিধির এক-একটি পাইল ১২০ মিটার পদ্মার তলদেশে গিয়ে থামছে। ৬টি পাইল ঘিরে দাঁড়িয়ে যাবে একটি পিলার। যে পিলারের ওপর স্প্যান বসালেই হয়ে যাবে সেতু। এখন পিলার গড়ে তোলার জন্য চলছে পাইল ড্রাইভ।
পদ্মা সেতুর চায়না মেজর ব্রিজ প্রকৌশল সূত্র জানায়, ২৬৪টি পাইলের মধ্যে ২৪০টি স্টিল ও ২৪টি কংক্রিট দিয়ে তৈরি। পদ্মার পাড়েই তৈরি হচ্ছে এসব পাইল। চীন থেকে নিয়ে আসা স্টিল প্লেট দিয়ে ফ্যাব্রিকেশন ইয়ার্ডে (কারখানা) পাইল তৈরি শেষে তা বার্জে তোলা হচ্ছে। এরপর পিলার পয়েন্টে পাইল এনে শুরু হয় ড্রাইভিং। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হ্যামারের প্রতি সেকেন্ডের আঘাতে একের পর এক পাইল যেতে থাকে নদী তলদেশে।

পদ্মা নদীর মাওয়া থেকে জাজিরা এ দুই অংশ ঘুরে সবচেয়ে দৃশ্যমান বলা যাচ্ছে_ এই পাইলিংয়ের কাজ। প্রতিটি পিলারে ছয়টি করে পাইল বসানো হবে। যার ৩টি করে পাইল বসানো হয়ে গেছে মাওয়া অংশের ৬ ও ৭নং পিলারে আর জাজিরা অংশে ৩৬নং পিলারের তৃতীয়টি বসানোর কাজ চলছে। এ ছাড়া ৩৫নং পিলারেও বসেছে একটি পাইল। এভাবেই একে একে শেষ করা হবে পাইলিংয়ের কাজ।
বলা হচ্ছে এটি সেতুর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ। এ কাজ শেষ হলেই পিলারের ওপর শুধু স্প্যান বসিয়ে দিলে শুরু করবে গাড়ি চলাচল। ৪২টি পিলারে ১৫০ মিটারের ৪১টি স্প্যান বসানো হবে। মাওয়া থেকে জাজিরায় চারলেন সেতু গিয়ে নামবে ৬ লেন সড়কে।
এ ছয়লেনের কাজও প্রায় সমাপ্তির দিকে। এজন্য কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট কাঁঠালবাড়ী ঘাটে সরিয়ে এনে খুলনা সড়কে যোগাযোগের জন্য নবনির্মিত ৮ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক খুলে দেয়ার প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে।
পদ্মা সেতুতে পাইল ড্রাইভের জন্য জার্মানি থেকে নিয়ে আসা শক্তিশালী ২৪০০ কিলোজুলের হ্যামারের সঙ্গে ২০০০ কিলোজুলের আরেকটি হ্যামার কিছুদিন পরে যোগ হচ্ছে। তখন ভরা পদ্মায় স্রোতের ধাক্কা বাড়লেও থামবে না কাজের গতি। বর্ষার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ৩৫ নাম্বার পিলারের কাছে করলী চরে আরেকটি ছোট কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড তৈরি করে সেখান থেকেও কাজ শুরু হয়েছে।
পদ্মা সেতুর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও চায়না মেজর ব্রিজ প্রকৌশল সূত্র জানায়, বর্তমানে পাইল ড্রাইভ করতে যে হ্যামার ব্যবহৃত হচ্ছে তার পুরো শক্তি প্রয়োগ করা লাগছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে দুইহাজার কিলোজুলই যথেষ্ট। এ কারণে পদ্মা সেতুর জন্য দুই হাজার কিলোজুলের আরেকটি হ্যামার জার্মানি থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে তিন-চার মাসের মধ্যে।
ওই হ্যামার চলে এলে দুটি হ্যামারই তখন পদ্মায় একসঙ্গে দুই পিলারের পাইলিং কাজ করবে। তবে কোনো পাইলে যদি ২০০০ কিলোজুলের চেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োগ করা লাগে সেক্ষেত্রে আবার ২৪০০ কিলোজুলের হ্যামারটি ওই পিলার পয়েন্টে নিয়ে আসা হবে।
বর্তমান হ্যামারটি প্রতিটি পাইলে মিনিটে ৩৭ বার চাপ দিতে পারে। আঘাতের ভারে পাইল ইঞ্চি ইঞ্চি করে যেতে থাকে পদ্মার তলদেশে।
চায়না মেজর ব্রিজ (এমবিইসি) প্রকৌশলীদের বর্ণনা মতে, কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে বার্জে তুলে পাইল নিয়ে আসার পর তা গোলাকার গাইডিং ফ্রেমে তোলা হয়। গাইডিং ফ্রেমের হাইড্রলিক জ্যাকের সাহায্যে তা ১/৬ অনুপাতে কোণ করে স্টেবল করা হয়। তারপর ক্রেইনের সাহায্যে ২৪০০ কিলোজুল ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রলিক হ্যামার দিয়ে পাইল পদ্মার তলদেশে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়।
ছয় কিলোমিটার প্রশস্ত পদ্মা সেতু শুধু সড়ক সেতু নয়। একই সঙ্গে এই সেতুর ওপর দিয়ে যাবে রেলপথ। এ ছাড়া যাবে গ্যাস পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। দুইতলা ব্রিজের ওপর দিয়ে যাবে গাড়ি আর সেতুর নিচের লেভেলে থাকবে ট্রেন লাইন। ব্রিজের নিচ দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রবাহিত হবে এক লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি। শত বছর টিকে থাকার শক্তি নিয়েই পিলার তলদেশ থেকে গড়ে আনা হচ্ছে।
আর দু’পাশে যে ছয়লেনের সড়ক হবে সেটি অন্তত একযুগ কোনো মেরামত ছাড়াই দ্রুতগতিতে গাড়ি চলবে।