নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ

পাবনার বেড়ায় নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করা হচ্ছে। প্রবহমান পানির কারণে নদীতে চাষ করা মাছের বৃদ্ধি যেমন দ্রুত ঘটে, তেমনি পুকুরে চাষের তুলনায় খরচও বহুগুণ কম। এ প্রক্রিয়ায় মাছ চাষ করে চাষিরা ব্যাপক লাভবান হচ্ছে। নদীতে সফল মাছ চাষি বেড়া উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের আলী হাসান বাদশা জানান, তিনি ৩৫টি খাঁচা বানিয়ে স্থানীয় হুরাসাগর নদীতে মোনোসেক্স তেলাপিয়া মাছের চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি একজন সফল মৎস্য চাষি। তাঁর দেখাদেখি বেড়া পৌর এলাকার অনেকেই খাঁচায় মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এভাবে স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে স্বল্প আয়ের মানুষ আর্থিকভাবে ব্যাপক লাভবান হতে পারে।

আলী হাসান বাদশা জানান, তাঁর বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। এইচএসসি পাসের পর তাঁর আর লেখাপড়া হয়নি। ঢাকার দ্বিতীয় বিভাগসহ এলাকার বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলা হাসান একদিন টেলিভিশনে দেখেন চাঁদপুরের ডাকাতিয়া নদীতে খাঁচায় তেলাপিয়ার চাষ করা হচ্ছে। এ নিয়ে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তিনি জানতে পারেন ইতিমধ্যে সিরাজগঞ্জের কয়েক বন্ধু খাঁচা বানিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন এবং তাঁরা ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন। তাঁদের অনুপ্রেরণা ও পরামর্শে একদিন তিনিও খাঁচায় মাছ চাষের সিদ্ধান্ত নেন। অভিজ্ঞতা না থাকলেও সামান্য কিছু পুুঁজি নিয়ে তিনি নেমে পড়েন খাঁচায় মাছ চাষে।

বেড়া উপজেলার হুরাসাগর নদীতে প্রথমে তিনি ৩৫টি খাঁচা তৈরি করে মাছ চাষ শুরু করেন। প্রথমবার মাছ বিক্রি করে তেমন লাভ হয়নি। পরে বিভিন্নভাবে পুঁজি সংগ্রহ করে নতুন উদ্যোগে শুরু করে তিনি বেশ লাভবান হন। এরপর আর তাঁর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। স্বপ্নের মতোই এগোতে থাকে তাঁর ব্যবসা। তাঁর সাফল্যে উৎসাহী হয়ে এলাকার অনেক বেকার যুবক এ পদ্ধতিতে মাছ চাষে এগিয়ে আসে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বেড়া পাম্পিং স্টেশনসংলগ্ন হুরাসাগর নদীতে সারি সারি করে খাঁচা বসানো রয়েছে। জাল, বাঁশ, জিআই পাইপ ও প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে মাছের খাঁচা তৈরি করা হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ২০ ফুট, প্রস্থ ১০ ফুট। একটি খাঁচায় এক হাজার পোনার চাষ করা যায়। খাঁচায় পোনা ছাড়ার পর ৪০ দিনের মধ্যে মাছ বাজারে বিক্রির উপযুক্ত হয়। ৩৫টি খাঁচা দেখাশোনার জন্য রয়েছে দুজন প্রহরী। এদের একজন শমসের আলী জানান, প্রথমে খাঁচা তৈরির খরচ বাদে মাছ বিক্রি করে অল্প লাভ হলেও একবার খাঁচা তৈরি করলে অনেক দিন ব্যবহার করা যায়। সারা বছর এ পদ্ধতিতে নদীতে মাছ চাষ করা যায়।

মাছ চাষি বাদশা জানান, ভাসমান ওই মাছ চাষ করে অধিক মুনাফা লাভ হয়। একটি খাঁচা তৈরি করতে ১০-১২ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তাতে এক হাজার মাছ অনায়াসে চাষ করা যায়। ভাসমান ওই খাঁচায় চাষ করতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস। এ সময়ে খাদ্যের জন্য ব্যয় হয় ২২ থেকে ২৪ হাজার টাকা। সার্বক্ষণিক প্রকল্প দেখাশোনার জন্য দুজন প্রহরীর বেতন বাবদ ১৬ হাজার টাকা। একটি খাঁচায় (তৈরিসহ) ছয় মাস পর্যন্ত মাছ চাষে প্রথম অবস্থায় ব্যয় হয় ৫০ হাজার টাকা। ছয় মাস পর একটি মাছের ওজন হয় আট শ গ্রাম থেকে এক কেজি। এতে একটি খাঁচার মাছ ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা বিক্রি করা সম্ভব। এতে প্রতি খাঁচায় আয় হয় পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা। প্রথমবার ৫০ হাজার টাকা খরচ হলেও দ্বিতীয়বার খরচ হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এ পদ্ধতিতে একটি খাঁচায় তিন থেকে চার বছর মাছ চাষ করা যায়।

আলী হাসান বাদশা জানান, ৩৫টি খাঁচায় মাছ চাষ করতে খরচ হবে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা। আর ৩৫টি খাঁচায় মাছ চাষ করে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লাভ করা সম্ভব। তবে কেউ ইচ্ছা করলে কম পুঁজি নিয়ে কম খাঁচা দিয়েও ব্যবসা শুরু করতে পারেন। ইতিমধ্যে এ পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে অনেকেই তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে। এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে দেশের অন্যতম সমস্যা বেকারত্ব দূর করা সম্ভব।

চীনে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে জানিয়ে আলী হাসান বাদশা এ ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মাছের খাদ্যসহ ওষুধের দাম এখন বেশ বেড়ে গেছে। কক্সবাজার, যশোর, বগুড়া থেকে পোনা সংগ্রহ করতে ব্যয় অনেক বেশি। মোকাম থেকে রেণু পোনা এনে এক মাস নার্সারি করতে হয়। এরপর চাষের পুকুরে দুই মাস কালচার করে পরে খাঁচায় দেওয়া হয়। ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে মাছগুলো স্থানীয় বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করতে হয়।

বেড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান সরকার জানান, খাঁচায় মাছ চাষ মৎস্য বিজ্ঞানীদের বিশেষ উদ্ভাবন। এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা সম্ভব। নদীতে খাঁচা পেতে মাছ চাষে প্রবহমান পানি পাওয়া যায়। তা ছাড়া পুকুর তৈরির খরচ ও ভূমি ব্যবহার থেকেও বাঁচা যায়। আর পুকুরে ডিজলব অক্সিজেন থাকে ৪ থেকে ৫ এর মধ্যে, সেখানে প্রবহমান নদীতে তা থাকে ৬-এর বেশি। এ কারণে নদীতে মাছের দ্রুত বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগবালাইও কম হয়। তিনি বলেন, বেকার যুবকরা খাঁচায় মাছ চাষ করে নিজের ও দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে মাছ চাষ প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণ প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।