সময়ের চেয়ে এগিয়ে যাওয়া মানুষ

ড. ওয়াজেদ মিয়া রাজনীতি সচেতন ছিলেন, গোটা জীবনে তিনি সেই সচেতনতা থেকে বিচ্যুত হননি। তা সত্ত্বেও তিনি দেশ ও জাতির জন্য রাজনীতির ক্ষেত্রে নয় বরং বিজ্ঞান গবেষণায় আত্মনিয়োগ করে দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন। যে পরিবারের তার দীর্ঘ জীবন কেটেছে সেখানে গোটা দেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার বিষয়টি কখনো কখনো কেন্দ্রীয়ভূত হলেও এগুলো কারো ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি, চাওয়া-পাওয়ার বা হওয়ার বিষয়ে পরিণত হয়নি। সে কারণেই হয়তোবা বঙ্গবন্ধু যখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ড. ওয়াজেদ তার স্নেহধন্য জামাতা ছিলেন, পরিবারের নিকটতম সদস্য ছিলেন, কিন্তু তাতে ড. ওয়াজেদের আপন কর্মক্ষেত্র থেকে চোখ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির দিকে চলে আসেনি। কেননা ওই পরিবারে রাজনীতি এসেছিল দেশকেন্দ্রিক আদর্শিক চিন্তা থেকে, ব্যক্তিগত যশ-খ্যাতি, প্রভাব, অর্থবিত্ত প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনা যখন ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি তো তখন ইচ্ছে করলে প্রধানমন্ত্রীর স্বামী হিসেবে চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ নিতে পারতেন, ক্ষমতার আধারে নিজেকে পরিণত করতে পারতেন। না, বঙ্গবন্ধুর আমলেও নয়, স্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর আমলেও তিনি ক্ষমতার নয়, বরং নিজের কর্মক্ষেত্র নিয়ে ব্যস্তজীবন কাটিয়েছেন। এমন মানুষ সত্যিই বিরল।

তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের একটি আণবিক কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করে এর উদ্যোগ গ্রহণ করেন, বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করান। তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতে বারবার তাগিদ দিয়ে আসছিলেন। আমাদের সরকার, নীতি-নির্ধারণী মহল বিজ্ঞানে এসব ক্ষেত্র সম্পর্কে ততটা ওয়াকেবহাল থাকেন না, সে কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিজ্ঞানের এসব ক্ষেত্র সম্পর্কে বিলম্ব ঘটান। ফলে দেরি হয়ে যায় অনেক সমস্যার সমাধান পেতে বা দিতে। এক্ষেত্রেও তার অবদান অনেক।

আমরা এত বছরেও জাতীয় জীবনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভূমিকা, গুরুত্ব ও অবদান কত বড় হতে পারে এবং হচ্ছে সে সম্পর্কে তরুণদের মোটেও অবহিত করিনি, উদ্বুদ্ধ করিনি। এসব নিয়ে সাধারণ আলোচনা জনসম্মুখে খুব একটা হয় না। হয় না বলেই বেশিভাগ মানুষ এ সম্পর্কে তেমন কিছু জানতে পারে না। অথচ এসব নিয়ে যদি লেখালেখি প্রচুর হতো, প্রচার মাধ্যমে নিয়মিত তুলে ধরা হতো, তাহলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এসবের প্রতি আকৃষ্ট হতো, বিষয়গুলো নিয়ে নিজেরাও চিন্তা-ভাবনা করতে পারত। এ ধরনের আলোচনা পর্যালোচনা দেশে হয় না বলেই চোখের কাছে রাজনীতি আর ব্যবসা-বাণিজ্য, বিত্ত ভোগ-বিলাস নিয়ে উঠতি তরুণ-তরুণীকে আকৃষ্ট হতে দেখা যায়। কিন্তু সেখানে তো সবার করার কিছু থাকে না। অথচ জীবন, জগৎ সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি বিজ্ঞান-য্ুিক্তর নানা দিক রয়েছে যা নিয়ে আমাদের পড়াশোনার করা উচিত, গবেষণা করা উচিত, তাহলে অনেকেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যেতে পারেন। আমার মনে হয়েছে, বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার মৃত্যুতে অনেকেই রাজনীতির বাইরেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের এদিকগুলো নিয়ে কিছুটা হলেও নতুনভাবে নতুন করে চিন্তায় এসেছে। ড. ওয়াজেদ মিয়ার মৃত্যু এ ভাবনায় কিছুটা হলেও নাড়া দিয়েছে।

সেই আলোচনার সুযোগ ও ক্ষেত্রটি তিনি তার কর্ম দিয়ে তৈরি করে গেছেন। এখন সরকার, শিক্ষা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিদ্বৎসমাজ দেশের বিজ্ঞান শিক্ষা, গবেষণা নিয়ে কী করবেন সেটি তাদেরই দায়িত্ব। ড. ওয়াজেদসহ যারা দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় পথিকৃৎ হিসেবে অতীতে কাজ করেছেন, এখনো করছেন সরকার তাদের কাজ ও অবদানকে তুলে ধরার ব্যবস্থা করবে, নতুন প্রজন্মকে সেদিকে ধাবিত করবে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সেভাবেই ঢেলে সাজাবেÑ সেটিই সবাই আশা করে। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেটিই হবে উত্তম পথ, উত্তম কাজ। ড. ওয়াজেদ মিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশে সে কাজটি আমাদের করতে হবে।