দেশে প্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম যাচ্ছে ইউরোপে

সনাতন পদ্ধতিতে নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাতক্ষীরায় আম উৎপাদন হচ্ছে; যা দেশে প্রথম। সে আম যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবার ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হবে। এ কাজে স্থানীয় কৃষকদের সহায়তা করছে আম রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ন্যানো ইন্টারন্যাশনাল, বেসরকারি সংস্থা সলিডারিডাড ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ।

চাষীরা জানান, আর মাত্র ক’দিন পরই গাছ থেকে আম সংগ্রহ শুরু হবে। উন্নত দেশে যেভাবে গাছ থেকে নিরাপদে আম সংগ্রহ করা হয়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমাদের হাতে-কলমে তা শেখানো হয়েছে। এছাড়া আম প্যাকেটজাত ও নিরাপদ রাখতে যা যা করণীয়, তাও শেখানো হয়েছে। ফলে চাষীরা সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আম উৎপাদন ও সংগ্রহে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

সাতক্ষীরার আম রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ন্যানো ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. ইকবাল হোসেন জানান, সনাতন পদ্ধতি নয়, সাতক্ষীরা থেকে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদনে চাষীদের সহায়তা দিতে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে বাগানে উৎপাদিত আম তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি জানান, এ বছর তারা জেলার ১৫০টি বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে তা বিদেশে রফতানি করবেন।

জানা গেছে, নিরাপদে আম সংগ্রহের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট তাপে আমের পচন রোধে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, হ্যান্ড গ্লাভসসহ নানা সরঞ্জামও চাষীদের দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আমের পচন রোধে চাষীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। গুণগত মান বজায় রেখে বিষমুক্ত আম উৎপাদনে প্রাকৃতিক বালাইনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এজন্য গত বছরের আম মৌসুম শেষ হওয়ার পর পর গাছের পরিচর্যা শুরু করেন কৃষকরা।

সাতক্ষীরার ইলিশপুর গ্রামের আমচাষী শিমুল হোসেন জানান, আম উৎপাদনে তারা আর্সেনিকমুক্ত পানি ব্যবহার করেছেন। এছাড়া ফেরোমন ফাঁদ দিয়ে পোকামাকড় দমন করেছেন।

সাতক্ষীরায় বিষমুক্ত আম উৎপাদনে সহায়তাকারী বেসরকারি সংস্থা সলিডারিডাড প্রতিনিধি মুজিবল হক জানান, বাগানে সারের উত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। আম সংগ্রহ করে প্যাকেজিংয়ের আগ পর্যন্ত মনিটরিং করা হচ্ছে। নিরাপদ আম উৎপাদনের জন্য সাতক্ষীরার দেড় শতাধিক চাষীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

আমবাগান পরিদর্শনে আসা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান জানান, বিদেশে রফতানিযোগ্য আমের গুণগত মান নিশ্চিত করে ছাড়পত্র দেয়া হবে।

সূত্র জানায়, বৈজ্ঞানিক উপায়ে আম চাষে চাষীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। মুকুল থেকে গুটি পর্যন্ত তিন স্তরে স্প্রে করার পর আমে আর কোনো রাসায়নিক অথবা কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়নি। ফলে আম বেড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা সলিডারিডাড ও উত্তরণের যৌথ সহায়তায় চাষীরা আম চাষ করেছেন। চাষে জৈব সার, আর্সেনিকমুক্ত পানি ও পোকামাকড় দমনে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে গুড এগ্রিকালচার পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে।

হর্টিকালচার বিশেষজ্ঞ ড. নাজমুন্নাহার জানান, ক্ষতি যাতে কম হয়, সে বিষয়ে চাষীদের সতর্ক করা হয়েছে। রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ন্যানো সাতক্ষীরার চাষীদের কাছ থেকে আম ক্রয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বাগানে মনিটরিং চালিয়ে যাচ্ছে। হিমসাগর, ল্যাংড়া ও আম্প্রপলি জাতের আম পর্যায়ক্রমে সাতক্ষীরা থেকে নিয়ে যাওয়া হবে ইউরোপে রফতানির উদ্দেশ্যে।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরায় প্রায় চার হাজার হেক্টর জমিতে আমের বাগান করা হয়েছে। এখানে প্রায় ৪০ হাজার টন আম উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ টন আম বিদেশে রফতানি করা যাবে।

এরই মধ্যে সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়েছে। অচিরেই সাতক্ষীরা বাংলাদেশের ‘ম্যাংগো ক্যাপিটাল’ হয়ে উঠবে বলে করেন কৃষি কর্মকর্তারা।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কাজী আবদুল মান্নান বলেন, পরিবেশবান্ধব উপায়ে বিষমুক্ত আম উৎপাদনে কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে।