এ বছরই দৃশ্যমান হবে কাঠামো

বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু’র এক-তৃতীয়াংশ কাজ শেষ হয়েছে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। গত ১৭ মাসে মূল সেতুর কাজ শেষ হয়েছে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। সেতুর চারটি পিয়ারের (পিলার) পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে এসব পাইলিংয়ের ওপর গড়ে উঠবে সেতুর পিলার। তখনই দৃশ্যমান হবে সেতুর কাঠামো।

গত শুক্রবার পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়কের কাজ। চলছে নদীশাসনেরও কাজ। তবে পাইলিং-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সেতুর কাজ ধীরে চলছে। পাইলিংয়ের কারণে নেতিবাচক কোনো প্রভাব সৃষ্টি না হলে, পরবর্তী পর্যায়ের পাইলিং শুরু হবে। সেতুর ৪০টি পিলারের জন্য ছয়টি করে ২৪০টি এবং মূল সেতুকে ডাঙার সঙ্গে যুক্ত করতে দুটি পিলারের জন্য ১২টি পাইলিং করতে হবে। সর্বমোট ২৬৪টি পাইলিং করতে হবে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন।

পাইলিং এলাকায় দেখা যায়, পিলারের ভিত্তি তৈরি করতে নদীতে পাইল গাইড বসানো হয়েছে। মূল সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আবদুল কাদের বলেন, ‘গাইডগুলোর মাধ্যমে একটি সিলিন্ডারের মতো তৈরি করা হয়েছে। নদীর তলদেশ পর্যন্ত এ গাইড বসানো হয়েছে। এর মধ্য থেকে পানি সেচে ফেলে দেওয়া হবে। পাইলিংয়ের মাধ্যমে নদীর তলদেশে পিলারের ভিত্তি করা হবে। এই ভিত্তির ওপর তৈরি হবে পিলার। পিলারের ওপর তৈরি হবে সেতু।’ তিনি জানান, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত দুটি পিলারের কাজ শেষ হবে। তখন সেতু সবার কাছে দৃশ্যমান হবে।

শুক্রবার সেতুর অগ্রগতি পরিদর্শনে যান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সেতুটি শুধু প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার নয়, ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের সেতু।’ মন্ত্রী জানান, পদ্মা সেতুতে ঠিকাদারদের এক টাকাও বাকি নেই। দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সরকার কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিকাদারদের পাওনা পরিশোধ করছে। পরিদর্শনের পর মাওয়া প্রান্তে সার্ভিস এরিয়া-২-এ সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৯৭১ কোটি ব্যয় হয়েছে। নদীশাসনের ৮ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। তিনি জানান, এ প্রকল্পের জন্য অর্থের ঘাটতি নেই। নির্ধারিত সময় ২০১৮ সালের মধ্যেই শেষ হবে সেতুর কাজ। সংবাদ সম্মেলনের আগে মুস্তফা কামাল মূল সেতুর পাইলিং ও সংযোগ সড়কের কাজ পরিদর্শন করেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের প্রধান দুই প্যাকেজ মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ প্রত্যাশিত গতিতেই এগিয়ে চলছে। নদীশাসনের কাজ ইতিমধ্যে ১৮ দশমিক ২৭ ভাগ শেষ হয়েছে। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়ার কাজ শেষ হওয়ার পথে। যথাসময়েই সেতু হবে।

মূল সেতুর কাজ করছে চীনের প্রতিষ্ঠান মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (এমবিইসি)। নদীশাসনের কাজ করছে চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো। প্রকল্পের অন্যান্য প্যাকেজের কাজ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেও, নদীশাসনে কাজ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।

সেতু বিভাগ জানিয়েছে, নদীশাসনের জন্য ১ কোটি ৩৩ লাখ কংক্রিট ব্লক তৈরি করতে হচ্ছে। ২০১৪ সালের ৩১ জানুয়ারি নদীশাসনের কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে ২৭ লাখ ব্লক তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে প্রায় ১২ কিলোমিটার নদীশাসন করতে হবে। জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ হয়েছে প্রায় ৪০ ভাগ।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। সেতুর মাওয়া প্রান্তে ১ হাজার ৪৭৮ মিটার ভায়াডাক্ট (ঝুলন্তপথ) থাকবে। জাজিরা প্রান্তে ভায়াডাক্ট থাকবে ১ হাজার ৬৭০ মিটার। পদ্মা সেতু হবে দেশের প্রথম দ্বিতল সেতু। এর উচ্চতা হবে ১৩ দশমিক ৬ মিটার বা প্রায় ৪৪ ফুট। নিচতলায় (লোয়ার ডেক) চলবে ট্রেন। মিটার ও ব্রড গেজ উভয় ধরনের ট্রেন চলাচলে ডাবল গেজ রেললাইন থাকবে। দ্বিতীয় তলার (আপার ডেক) চার লেন সড়কে চলবে গাড়ি।