কয়লা খনির সন্ধান তাজপুরে!

উত্তরাঞ্চলের নওগাঁয় চিনামাটি, চুনাপাথরের পর এবার কয়লা খনি থাকার আভাস পাওয়া গেছে। এই খনি উদ্ধারে এরই মধ্যে ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ দল অনুসন্ধান কাজ শুরু করেছে। তারা আশা করছেন, শিগগিরই সুখবরটি তারা পারবেন।

এ বিষয়ে ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মাসুম ও উপ-পরিচালক ড্রিলিং প্রকৌশল মাসুদ রানা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল বলেছেন, ‘তাজপুর মৌজায় ভূ-গর্ভের ২ হাজার ২১৪ ফুট থেকে ২ হাজার ৩০৫ ফুট পর্যন্ত চুনাপাথরের সন্ধান পাওয়ার পর থেকে সেখানে কয়লা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ কারণে তাজপুর মৌজায় খননকৃত স্থানের চারপাশে ৫০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত চুনাপাথর এবং কয়লা পাওয়ার আসা নিয়ে ড্রিলিং করে যাচ্ছি। এখন এটুকু বলতে পারি, এখানে বড় কয়লা খনি পাওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।’ খননকাজে নিয়োজিত উপ-পরিচালক ড্রিলিং প্রকৌশল মহিরুল ইসলাম বলেন, ‘এ পর্যন্ত সেখানে ২ হাজার ৪৮৭ ফুট খনন করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য কয়লা উত্তোলন। সে জন্য খননকাজ অব্যাহত রেখেছি। চুনাপাথরের নিচের স্তরেই থাকে কয়লা, আমরা সেই কয়লার অনুসন্ধানেই কাজ করছি।’ বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের  মহাপরিচালক ড. নেহাল উদ্দীন বলেন, ‘তাজপুরে চুনাপাথরের খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়ার পর এবার কয়লা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আশা করছি এখান থেকে চুনাপাথর এবং কয়লা উত্তোলন সম্ভব হলে তা দিয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে।’ তিনি আরও জানান, সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো চুনাপাথর। আর সিমেন্ট তৈরিতে প্রায় ৭৫ ভাগই চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়। তাজপুরের খনিতে যে পরিমাণ চুনাপাথর রয়েছে- তা দিয়ে আগামী ১৫০ বছর বাংলাদেশের সব সিমেন্ট ফ্যাক্টরি চলবে। তারপরও মজুদ থাকবে। তিনি বলেন, ‘এখানে বিশাল আকারে চুনাপাথর রয়েছে। যা উত্তোলন করলে বিদেশ থেকে আর চুনাপাথর আমদানি করতে হবে না।’ সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় দুই বছর ধরে বগুড়ার সান্তাহার, নওগাঁর তিলকপুর, বদলগাছীর তাজপুর ও জয়পুরহাটের আক্কেলপুর এলাকায় জিএসবির এক ভূ-তাত্ত্বিক জরিপে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় চুনাপাথর খনির সন্ধান পাওয়া যায় বদলগাছীর তাজপুরে। এরপর চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর এ খনির খননকাজ শুরু করে। ২ হাজার ২১৪ ফুট গভীরে মেলে চুনাপাথর। এরপর আবারও চালানো হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অভিযান। গত ১৯ এপ্রিল মাটির স্তর পরীক্ষার জন্য জিএসবি ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু জানিয়েছেন, তাজপুরে বড় চুনাপাথর খনির সন্ধান পাওয়া গেছে। এরপরই ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ দল ড্রিলিং কাজ শুরু করেছে। সূত্র জানায়, এই খনি আবিষ্কারের পেছনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন চারজন প্রকৌশলী ও চারজন ভূ-তত্ত্ববিদ। তারা হলেন— মহিরুল ইসলাম (উপ-পরিচালক, ড্রিলিং প্রকৌশল), মাসুদ রানা (উপ-পরিচালক, ড্রিলিং প্রকৌশল), মঈন উদ্দিন আহমেদ (উপ-পরিচালক, ড্রিলিং প্রকৌশল), মিনহাজুল ইসলাম (সহকারী পরিচালক, ড্রিলিং প্রকৌশল), হাসান শাহরিয়ার (উপ-পরিচালক, ভূ-তত্ত্ব), মোহাম্মদ মাসুম (সহকারী পরিচালক, ভূ-তত্ত্ব), এ জে এম এমদাদুল হক (সহকারী পরিচালক, ভূ-তত্ত্ব) ও জোবায়ের মাহমুদ (সহকারী পরিচালক, ভূ-তত্ত্ব)। তাদের পেছনে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন বাংলাদেশ ভূ-তত্ত্ব জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. নেহাল উদ্দীন। এদিকে চুনাপাথরের পর কয়লা খনি আবিষ্কারের খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই খনির প্রয়োজনে লোকজনকে বাড়িঘর-সহায়-সম্পদ থেকে উচ্ছেদ করা হবে। তাজপুর গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন, নাজিরপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেন, মহেশপুর গ্রামের বারেক আলী, লক্ষ্মীপুর গ্রামের মোবারক, বসন্তপুর গ্রামের চাঁন মোহাম্মদ ও দ্বীনেশ চন্দ্র দাশ বলেন, ‘আমরা উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছি। সরকার সুষ্ঠুভাবে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত আমাদের  যেন উচ্ছেদ না করে। তা ছাড়া উত্তোলিত খনিজ সম্পদের একটা অংশও যেন আমাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।’ বিলাশবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমরান হোসেন খান রতন বলেন, ‘চুনাপাথর উত্তোলনে যেন এলাকার লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, মানুষ যাতে জমির নায্যমূল্য পায় এবং এই এলাকার লোকবলকে যেন কাজে লাগানো হয়। এ ছাড়া খনিজ থেকে যে আয় হবে- তার একটি অংশ যেন এলাকার মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়। এটাই আমার প্রত্যাশা।’ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ জ ম শফি মাহমুদ বলেন, ‘দেশের উন্নয়নের স্বার্থে খনিজ সম্পদ উত্তোলন প্রয়োজন। এ সম্পদ থেকে আয়ের ৫০ ভাগ এখানকার মানুষের জন্য অর্থ ব্যয় করার দাবি জানাচ্ছি।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুসাইন শওকত বলেন, ‘এলাকাবাসী ও খননকাজে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলেছি। এলাকাবাসী খুব খুশি।’ নওগাঁর জেলা প্রশাসক ড. মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘যদি কয়লার খনি পাওয়া যায় তাহলে এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। এলাকায় ভারী শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। এতে এলাকার লোকজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দেশেরও অর্থনৈতিক উন্নতি হবে।’ নওগাঁ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আলী দ্বীন বলেন, ‘প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ প্রাপ্তির খবরে শিল্পোদ্যোক্তারা আশার আলো দেখছেন। এর ভিতর দিয়ে আগামীতে উত্তরাঞ্চলে ভারী শিল্পায়নের স্বপ্ন দেখছি।’ নওগাঁ তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মহসিন রেজা বলেন, ‘যাতায়াত ব্যবস্থাসহ এলাকার কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা গেলে নওগাঁ হতে পারে খনিজ সম্পদ আহরণের একটি বড় ক্ষেত্র। এ ছাড়া এই অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া যেতে পারে।’