বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা মিয়ানমারের

আগামীতে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে মিয়ানমার সরকার। এক্ষেত্রে দেশটি তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনবে না। তবে তাদের অ্যাপ্রোচ আগের সরকারের চেয়ে ভিন্ন হবে। বাংলাদেশের প্রতি মিয়ানমারের এ ধরনের মনোভাব স্পষ্ট করে দিলেন অং সান সুচির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বর্ষীয়ান নেতা উ টিন ও। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অভিন্ন সীমান্ত আছে। উভয় পাশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য আমরা পাঞ্চশিলা নীতি মেনে চলব।’ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্যে স্নায়ুযুদ্ধকালে পাঞ্চশিলা নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মূলনীতি হল পারস্পরিক সৌহার্দ ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব বিরোধের নিষ্পত্তি। ইয়াঙ্গুনে এনএলডি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্ষীয়ান এই নেতা বলেন, নির্বাচনে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এনএলডি সরকার গঠনের পর এখন হানিমুন পিরিয়ড অতিক্রম করছে। প্রথম একশ’ দিনের কর্মসূচি প্রণয়ন করতে গিয়ে পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের প্রশ্নও আসছে। সুচির পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে জানতে ইয়াঙ্গুনে বিদেশী কূটনীতিকরা খুবই উদগ্রীব। কূটনীতিকরা প্রায় সবাই সুচির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইছেন। এই অবস্থায় দারুণ ব্যস্ত এনএলডি নেত্রী সব বিদেশী কূটনীতিককে একসঙ্গে ডেকে ব্রিফ করেছেন। তিনি বলেছেন, পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন না হলেও তাদের অ্যাপ্রোচ আগের সরকারের থেকে ভিন্ন হবে।
বয়স নব্বইয়ের কোটা পার করার পরও উ টিন ও ন্যুব্জ হয়ে পড়েননি। বরং এখনও সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রাজনীতিতে দারুণ সক্রিয়। সুচি নিজে এই প্রবীণতম রাজনীতিবিদকে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। টিন ও রাজি হননি। কিন্তু ক্ষমতাসীন এনএলডি সরকারের নীতি প্রণয়নে তার অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শের সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করেন না।
এনএলডি নেত্রী অং সান সুচির নীতি সম্পর্কে উ টিন ও বলেন, জনগণের বিপুল প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে সুচির প্রতি। এ অবস্থায় তিনি জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার কাজ করছেন। সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এই সংহতির লক্ষ্যে তিনি কঠোর পরিশ্রম করছেন। জাতীয় সংহতি ছাড়া কোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য তিনি সবার মধ্যে আস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, অং সান সুচি একজন শান্তিপ্রিয় নেত্রী। তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সবকিছুর নিষ্পত্তি করতে চান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে কোনো বিরোধ নেই। নাফ নদী সংলগ্ন স্থল সীমান্ত চিহ্নিত করা হয়েছে। সমুদ্রসীমাও চিহ্নিত করা হয়েছে।
নতুন সরকার পরস্পরের প্রতি সম্মান জানিয়ে অগ্রসর হওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী। সুচি বাংলাদেশ সফরে আসতে পারেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, তিনি বাংলাদেশসহ সব প্রতিবেশী দেশই সফর করবেন। তবে কবে নাগাদ করবেন সেটা জানি না। টিন ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মিয়ানমার সফরেরও আশা প্রকাশ করেন।
সুচির দলের সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কোন দিকে নিয়ে যাবে এই প্রশ্নে মিয়ানমারে পার্লামেন্টের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির প্রধান উ বো বো ও এমপি রাখঢাক ছাড়াই বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, নতুন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে চায়। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের বিগত সরকারের খুবই শীতল সম্পর্ক ছিল। আমি আশা করি, মিয়ানমারে নতুন সরকার সম্পর্কের সেই ধারা পরিবর্তন করবে এবং বাংলাদেশ সরকারও সম্পর্ক উন্নয়নের বাধা দূর করবে।’
বো বো ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নতুন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের ওই ধারাটা পাল্টে দিতে চায়। তবে কাজটা যে খুবই কঠিন সেটাও তিনি মানেন। বো বো বলেন, ‘আমি মনে করি, এনএলডি সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে চেষ্টা করবে। এজন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও কাজ করতে হবে।’ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে কানেকটিভিটি প্রতিষ্ঠা করে দুই দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে বো বো বলেন, ‘আমাদের দেশের ওপর দিয়ে করিডোর নিয়ে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের খুব ভালো সুযোগ রয়েছে।’