মোগল স্থাপত্যশৈলীতে বাংলার তাজমহল

সম্রাট শাহজাহানের অনুপম ভালোবাসার নিদর্শন আগ্রার তাজমহল। ভালোবাসার অমর নায়ক মধ্যযুগে পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি আশ্চর্য স্থাপনা তৈরি করেন। এখনও বিশ্বজুড়ে প্রেমের প্রতীক তাজমহল। প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে সম্রাট শাহজাহান তৈরি করেছিলেন তাজমহল।

আগ্রার তাজমহলের অনুকরণে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে ১০ মাইল পুবে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ের পেরাব এলাকায় বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার আহসান উল্লাহ মণি নির্মাণ করেছেন ‘বাংলার তাজমহল’।

ঢাকার সন্নিকটে প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ের ছায়া সুশীতল গ্রামে নিরিবিলি শান্ত পরিবেশে, পাখি ডাকা সবুজের সমারোহে মোগল স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে নির্মিত বাংলার তাজমহল এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

বাংলার তাজমহলের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার করা হয়েছে ১৭২টি কৃত্রিম ডায়মন্ড, যা বেলজিয়াম থেকে আনা হয়েছে। তাজমহলটি তৈরিতে বিদেশি উপকরণ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমে একজন দক্ষ প্রকৌশলীর মাধ্যমে এর মাপ এনে স্থাপত্য শিল্পের ওপর দক্ষ ছয়জন টেকনিশিয়ান নির্মাণ কাজ শুরু করেন।

বাংলার তাজমহলকে আগ্রার তাজমহলের অনুরূপ করতে আগ্রায় যেতে হয়েছে সাতবার। তাজমহলে প্রবেশের আগে অপূর্ব ১০টি ঝরনা রয়েছে। দক্ষিণে তাজমহল, দু’পাশে নিরিবিলি বসার স্থান ও উত্তরে প্রবেশ পথ। তাজমহলের ভেতরে ‘রাজমনি ফিল্ম সিটি স্টুডিও’ রয়েছে।

এদেশের সিংহভাগ মানুষের ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে ভারতের আগ্রার তাজমহল দেখার সুযোগ হয়ে ওঠে না। কিন্তু দর্শনার্থীরা বাংলার তাজমহল মাত্র ৫০ টাকার টিকিটের বিনিময়ে দেখতে পারেন। বাংলার তাজমহলকে ঘিরে বিভিন্ন হোটেল, খাবার দোকান, শৌখিন জিনিসপত্রের দোকান, আবাসিক ভবন ও পিকনিট স্পটসহ বেশ কিছু অবকাঠামো গড়ে উঠেছে।

বাংলার তাজমহলটি প্রকৃত তাজমহলের একটি রেপ্লিকা। এটি তৈরি করতে সময় লেগেছে মাত্র ৫ বছর। এটি তৈরি করতে ৫৮ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। দেশের দরিদ্র মানুষ, যাদের ভারতে গিয়ে প্রকৃত নিদর্শন দেখার সামর্থ্য নেই, তারা যেন তাজমহল দেখার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন সেই লক্ষ্যেই এটি নির্মিত।

এই রেপ্লিকাটি তৈরির পর ভারত ক্ষুব্ধ হয় এবং বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস থেকে জানানো হয়, আহসানুল্লাহ মণিকে প্রকৃত তাজমহলের (৩০০ বছরেরও বেশি পুরোনো) মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন করার দায়ে অভিযুক্ত করা হবে। দাবি করা হয়, বাংলার তাজমহলের জন্য মার্বেল পাথর আমদানি করা হয় ইতালি থেকে, হীরা আমদানি করা হয় বেলজিয়াম থেকে।

এ ছাড়া প্রায় ১৬০ কিলোগ্রাম ব্রোঞ্জ আমদানি করা হয় গম্বুজের জন্য। যদিও অনেকে দাবি করেন, রেপ্লিকাটি সম্পূর্ণ নয় এবং উল্লেখিত উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়নি। প্রায় ১৮ বিঘা জমির ওপর নির্মাণ করা হয় ‘বাংলার তাজমহল’। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে এটি উদ্বোধন করা হয়। এছাড়াও আশপাশে পর্যটনের জন্য প্রায় ৫২ বিঘা জমি সংরক্ষিত রয়েছে।

বাংলার তাজমহলের মূল ভবন স্বচ্ছ ও দামি পাথরে মোড়ানো। এর অভ্যন্তরে আহসানউল্লাহ্ মণি ও তার স্ত্রী রাজিয়া দু’জনের কবরের স্থান সংরক্ষিত আছে। চার কোণে চারটি বড় মিনার, মাঝখানে মূল ভবন, সম্পূর্ণ টাইলস করা। সামনে পানির ফোয়ারা, চারদিকে ফুলের বাগান, দুই পাশে দর্শনার্থীদের বসার স্থান।

এখানে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রাজমনি ফিল্ম সিটি রেস্তোরাঁ, উন্নতমানের খাবার-দাবারের ব্যবস্থা। তাজমহলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রী, জামদানি শাড়ি, মাটির গহনাসহ আরও অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর দোকান। তাজমহলের কাছাকাছি পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম মিসরের পিরামিডের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে পিরামিড।

করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর। এখানে ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়াও পাশেই রয়েছে, শুটিং স্পট, সেখানে যে কোনো নাটক-সিনেমার সব ধরনের শুটিং করা সম্ভব। আরও রয়েছে ২৫০ আসনের সিনেমা হল ও সেমিনার কক্ষ। সুইমিংয়ের কাজ চলছে, তার সঙ্গে পরিকল্পনা রয়েছে আইফেল টাওয়ার করার।

বর্তমানে দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক এখানে ভিড় করছেন তাজমহল দর্শনের জন্য। তাজমহল প্রতিদিন খোলা থাকে সকাল ১০ থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। জনপ্রতি প্রবেশ ফি ৫০ টাকা। এখানে রয়েছে নিরাপত্তার সুব্যবস্থা। ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে বাংলার তাজমহলে খুব সহজেই যাওয়া যায়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে কুমিল্লা, দাউদকান্দি অথবা সোনারগাঁগামী যেকোনো গাড়িতে চড়ে মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে নামতে হয়। সেক্ষেত্রে ভাড়া লাগে ১৫ টাকা। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশা বা স্কুটারে জনপ্রতি ২৫ টাকা ভাড়ায় সহজে যাওয়া যায়।

অন্যভাবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে ভৈরব, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জগামী যেকোনো গাড়িতে চড়ে বরপা বাসস্ট্যান্ডে নামতে হয়, সেক্ষেত্রে ভাড়া হবে ২০ টাকা। এখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ মদনপুর হয়ে, বস্তল এশিয়ান হাইওয়ে থেকে প্রায় ২-৩ কিমি. ভেতরে। অথবা সিলেট মহাসড়কে কাঁচপুর হয়ে রূপগঞ্জের বরপা দিয়েও যাওয়া যায়। বাংলার তাজমহল প্রতিদিন সকাল ১০টা-৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ৫০ টাকা মাত্র।