বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যম

আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিবেশনের প্রতি বছর ৩ মে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এখন প্রতি মাসেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিবস বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে থাকে। কোনো কোনো দিবসের কথা খুব বেশি জানার সুযোগ হয় না। মিডিয়ায় দিবসটি সম্পর্কে খবর প্রকাশিত না হলে কিংবা সে রকম কোনো আয়োজন না থাকলে তেমন কেউ জানতেই পারেন না দিবসটির বৃত্তান্ত সম্পর্কে। মিডিয়ার ওপর সবারই নির্ভরশীলতা কতখানি তা এভাবেই বোঝা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে মিডিয়ার নিজস্ব একটি আন্তর্জাতিক দিবস সম্পর্কে জানার সুযোগটি মিডিয়াই আমাদের করে দিচ্ছে। বিশেষত দিবসটি যখন স্বয়ং জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হয় তখন এর গুরুত্বই আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে যখন ইউনেস্কোর নাম যুক্ত থাকে তখন বিষয়টি কয়েক গুণ তাৎপর্য বাড়িয়ে দেয়। আমি গণমাধ্যমের ভেতরের কেউ নই, তবে নিবিড়ভাবে এই মাধ্যমের সঙ্গে নিজেকে তিন দশকের অধিক সময় ধরে জড়িয়ে রেখেছি, তাই গণমাধ্যমকে এই দিনের মহিমায় দেখা ও পাওয়ার প্রত্যাশা বেশি বেশি করা থেকেই নিজেকে উপস্থাপন করছি। অভিনন্দন জানাচ্ছি এ জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের প্রসার কতটা ব্যাপক হয়েছে- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আশির দশকেও আমরা যখন পত্রপত্রিকায় কিছু লেখার চেষ্টা করতাম- তখন সরকারের বিরুদ্ধে কিছু লেখা ছিল প্রায় অকল্পনীয় ব্যাপার। পত্রপত্রিকাই ছিল তখন একমাত্র বেসরকারি গণমাধ্যম। তাই সরকারের বিরুদ্ধে পত্রিকাগুলো লেখালেখিতে অধিকারহীন ছিল। ১৯৭২-’৭৫ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন ছিল না। গণকণ্ঠ, হককথা, হলিডে তো সরকারের বিরুদ্ধে মারদাঙ্গা লেখালেখির জন্যই যেন জন্ম নিয়েছিল। দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা, এমনকি ইত্তেফাক, সংবাদ, পূর্বদেশ ইত্যাদি পত্রিকায় তখন সরকারের নানা বিষয়েই সমালোচনামূলক লেখালেখিতে তেমন কোনো ঘাটতি দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে গণকণ্ঠ, হককথা, হলিডের মতো কিছু কিছু সংবাদপত্র যতটা না সংবাদমাধ্যম তারচাইতে বেশি ছিল উগ্র হঠকারী রাজনীতিনির্ভর পত্রিকা। ফলে গণকণ্ঠ, হককথা পত্রিকা দুটো তাদের তথাকথিত মিশন শেষে আপনা আপনিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিচিত্রাও অনেক ক্ষেত্রে এ ধারাকেই অনুসরণ করেছিল, কিছুটা ভিন্নতা ছিল বলেই তার আয়ু অপেক্ষাকৃত বেশি হতে পেরেছে। তবে এ ধরনের সংবাদ মাধ্যমকে কতটা গণমাধ্যম বলা যাবে- তা বিচার্য বিষয়। এসব তথাকথিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দেশের স্বাধীনতাকে কতটা সহায়তা করে তা নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট-৭ নভেম্বর উত্তর সামরিক শাসনামলে বাংলাদেশে সংবাদপত্র কতটা স্বাধীন ছিল- তা দেখানোর জন্য সেই সময়ের পত্রিকাগুলোর পাতা উল্টানোর কথা বলাই শ্রেয়। বাংলাদেশে সংবাদ পরিবেশন এবং মুক্ত মনে উপসম্পাদকীয় পাতায় লেখার বিষয়টি তখন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তা দরবার-ই-জহুর-এর লেখকের জেলে যাওয়ার ঘটনা স্মরণ করার মাধ্যমেই এখনকার পাঠক সমাজ জানতে পারেন। সরকারি বাধা-নিষেধ তখন কতটা ছিল তা প্রমাণ করে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেয়া সরকারের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ অর্ডিনেন্স জারি করে উক্ত বাধা-নিষেধ প্রত্যাহার করার ঘটনা। সেই থেকে বাংলাদেশে স্বাধীন সংবাদপত্রের যুগ শুরু হয়। নতুন নতুন পত্রপত্রিকা অনুমোদন লাভ করতে থাকে। পত্রিকার সংবাদ ও লেখালেখিতে বৈচিত্র্য আসতে থাকে, রুচিশীল বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হয়, সাংবাদিকতা পেশায় অসংখ্য তরুণ সংবাদকর্মী, মালিক এবং সৃজনশীল মানুষ আসতে থাকেন। এটি বিস্তৃত হয় ১৯৯৯-এর পর থেকে বেসরকারি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার আত্মপ্রকাশ ঘটার অধিকার পাওয়ার পর। এখন পত্রপত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন, কমিউনিটি রেডিও ইত্যাদি মিলিয়ে অসংখ্য ধারা-উপধারায় গণমাধ্যম গ্রাম-গঞ্জে বিস্তৃত হয়েছে। সরকারের হাতে এক/দুটি টিভি চ্যানেল এবং বাংলাদেশ বেতার ছাড়া কোনো পত্রিকাও নেই। গণমাধ্যমের অংশ হিসেবে প্রতিটি জেলা, উপজেলা থেকে একাধিক পত্রপত্রিকা প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে। প্রায় ২৬-২৭টির মতো বেসরকারি টিভি চ্যানেল নিয়মিত প্রতিদিন দেশি, বিদেশি ও জনপদের সংবাদ কিছুক্ষণ পর পরই প্রচার করছে, সন্ধ্যার পর থেকে টিভি টকশো তো গভীর রাত পর্যন্ত চলছে। এসব বেসরকারি গণমাধ্যমের মালিকরা নিঃসন্দেহে দেশের কর্পোরেট হাউস বা ধনিক শ্রেণির প্রতিনিধি। তাদের মূলধনে এসব টিভি চ্যানেল, সংবাদ মাধ্যম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবে শেষ পর্যন্ত তাদের চলতে হচ্ছে নানা ধরনের বিজ্ঞাপনের ওপর। এসব গণমাধ্যমে কয়েক লাখ সংবাদ কর্মী কাজ করছেন, পেশাদারিত্ব অর্জন ও প্রদর্শন করার সুযোগও পাচ্ছেন। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠলেও ১৯৭৫-’৯০ সাল সময়ে পথহারা ছিল, ১৯৯০-এর ডিসেম্বর উত্তরকাল থেকে এটি দ্রুতই সম্প্রসারিত, বিস্তৃত এবং বহুমাত্রিক মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে।

বলতে দ্বিধা নেই, ১৯৯০ উত্তরকালের পর্বটি অপেক্ষাকৃত স্বাধীন ধারণাকে ধারণ করেই বিকশিত হচ্ছে। এখানে পেশাদারিত্বের জানা-অজানা নানা বাস্তবতার মুখোমুখিও হতে হয়েছে প্রতিটি গণমাধ্যমকে। তবে গণমাধ্যম নামের ভেতরে কিছু পত্রপত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের অনুপ্রবেশ ঘটেছে যেগুলোর আসল উদ্দেশ্য কিন্তু গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব অর্জন বা সেভাবে দেশ ও জাতিকে সংবাদ পরিবেশন ও লেখালেখি করা নয় কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনায় অবদান রাখা নয়। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের নিজস্ব দলীয় রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করা, এর বিরুদ্ধমতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা। এভাবেই তারা তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শে জনমতকে ধরে রাখা, পরিচালিত করার জন্য মিডিয়া হাউস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব ঘরানার এক সময়ের রাজনৈতিক কর্মীদের গণমাধ্যমে নিয়ে এসেছে, সংবাদকর্মী, লেখক, বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, বলা চলে এক ধরনের পাল্টা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার সুযোগ নিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যমের আড়ালে এ ধরনের বর্ণচোরা গণমাধ্যমের প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের বিষয়টি মোটেও গোপনীয় কিছু নয় বা আমার কল্পনাপ্রসূত বিষয় নয়। মনে রাখতে হবে, আমাদের মতো অনুন্নত সমাজ ও রাজনৈতিক চেতনার বাস্তবতার, ধর্মের ব্যাপক প্রভাব থাকা দেশে ওই সব বর্ণচোরা গণমাধ্যম রাজনৈতিক ইতিহাসকে বিকৃত, বানোয়াট তথ্য-উপাত্ত এবং অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় নানা বিষয়কে অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষ, উঠতি শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত এবং সহজ-সরল বিশ্বাসী মানুষকে বিভ্রান্ত করতে ভীষণভাবে কাজ করে থাকে, দিনশেষে তারাই বেশি বেশি লাভবান হয়, শক্তিশালী হয়, বাক স্বাধীনতার প্রকৃত ফসল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক শিক্ষা-সাংস্কৃতিক শক্তি খুব সামান্যই ঘরে তুলে নিতে পারে। মুক্ত প্রেসের নামে বিশাল গণমাধ্যম নিজস্ব পেশাদারিত্বের আবহে থেকে কাজ করছে সত্য, কিন্তু তাদের অর্জনের চাইতে ঢের বেশি বিভ্রান্তি ঘটাচ্ছে সংখ্যায় কম হলেও সাম্প্রদায়িক মতাদর্শিক শক্তির মিডিয়া হাউসগুলো। কেননা, আমাদের মতো উত্তরণকাল অতিক্রমকারী দেশে গণমাধ্যমের নামে বিভ্রান্তি সৃষ্টির মিশন খুব সহজে বাস্তবায়ন করা যায়। আর সমাজিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন করার মিডিয়ার দায়িত্ব পালনে বাকি সবাই একত্রে থেকেও এই ক্ষতি সহজে পুষিয়ে নিতে পারেন বলে মনে হয় না।

তাছাড়া বেসরকারি সবকটি মিডিয়া হাউসের নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা অনুসরণীয় বাধ্যবাধকতায় রয়েছে, তারা এর বাইরে খুব একটা এগুতে যাবেন কেন? এমন বাস্তবতায় যে ছোট্ট শূন্যতাটি তৈরি হয় সেটির বড় ধরনের সুবিধা নিয়ে থাকে মিডিয়া নামধারী বিশেষ বর্ণচোরা প্রতিষ্ঠান যেগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক বিষবাষ্প ছড়ানো, দেশ ও স্বাধীনতার ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতির ভিন্ন ভার্সনকে উপস্থাপনের নামে একটি গভীর বিভ্রান্তি তৈরি করা। সেটি তারা সফলভাবে করার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। তারা তা করেও থাকে। বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যমের যুগে সেই ধারাটি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের পেছনে দেশি-বিদেশি নানা প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও পরামর্শক শক্তি নিয়োজিত ছিল বা আছে। গণমাধ্যমের অভ্যন্তরের এমন বিপরীত শক্তির অবস্থানের কথা জানা থাকার পরও অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠানকেও তাদের সহযোগী গণমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন, তাদের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকেও গণমাধ্যমের স্বাধীন অবস্থানের অভিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করেন, একাকার করার চেষ্টা করেন। এখানেই মস্ত বড় প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের গণমাধ্যমের প্রকৃত চরিত্র নিরূপণ ও ভূমিকা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কারণ নিহিত। আমরা দেখেছি এ ধরনের বর্ণচোরা বেশকটি গণমাধ্যম নামধারী সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল এমন সব অপশক্তি মদদদাতার ভূমিকা অবতীর্ণ হয়েছিল যারা সফল হলে বাংলাদেশে কোনো গণতন্ত্র থাকে না, কোনো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার অস্তিত্ব থাকে না। খুব সূ²ভাবেই এসব প্রতিষ্ঠান এক সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অপশক্তির মদদদাতা হিসেবে অবতীর্ণ হয়। সেখান থেকে সেসব প্রতিষ্ঠানের নিষিদ্ধকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়, কোনো গণমাধ্যমের প্রতি বিরূপ বা এর কণ্ঠ রোধের উদ্যোগ এতে নেয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। সেসব প্রতিষ্ঠান যাদের কর্মকাণ্ডকে নিরঙ্কুশভাবে সমর্থন দিচ্ছিল, সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে সাহায্য করেছিল সেগুলোর অনুপস্থিতিতে দেশে অপরাজনীতির প্রসার তেমন একটা ঘটার সুযোগ পাচ্ছে না। দেশে জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর রাজনীতির প্রসারে যেসব নামধারী মিডিয়া কাজ করছিল তাদের প্রচারণা বন্ধ থাকাকে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ বলে কোনো কোনো মহলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শের চর্চা হচ্ছে না, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নানা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী তৎপরতায় নিরীহ মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়েছে এটি মোটেও মিডিয়ার সমস্যা নয়, এটি রাজনৈতিক দলগুলোর সমস্যা। সেগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দ্ব›দ্ব-সংঘাত এ সবই স্বাধীন গণমাধ্যমের সম্পূর্ণ বাইরের বিষয়। রাজনৈতিক বিষয় যা রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিরসন করতে হবে। সেই রাজনৈতিক লড়াইয়ে স্বাধীন বা মুক্ত গণমাধ্যমের সহযোগিতা সবারই পাওয়ার অধিকার রয়েছে- যদি রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি নিষ্ঠ থাকে। কিন্তু যেসব দল মুখে গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলবে, কিন্তু বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সহায়ক শক্তি জঙ্গিবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষক হবে তাহলে সেই দলের রাজনীতিকে প্রচার ও প্রসারে মুক্ত গণমাধ্যম কতটা সহযোগিতা করবে- তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি এবং মুক্ত গণমাধ্যমের ভূমিকায় এসব বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই দেখতে হবে, বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। এখানে সরলীকরণ করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা, পৃথিবী এখন একদিকে গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িকতা অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের দ্ব›দ্ব, বিরোধ ও সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যবর্তী কোনো সহজ-সরল রেখা নেই। মুক্ত গণমাধ্যমকে অবশ্যই তাদের সহজাত শত্রুর বিরুদ্ধে ও স্বাভাবিক মিত্র গণতান্ত্রিক শক্তির স্বার্থে অবস্থান নিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। অনেকেই এমন বিশ্ব বাস্তবতার কথা বুঝতে ভুল করেন।

সম্প্রতি ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের দুই ধাপ এগিয়ে এখন ১৪৪তম স্থানে আসার খবর দিয়েছে। ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ড এবং নরওয়ের মতো দেশগুলো এক্ষেত্রে শীর্ষ স্বাধীন ভোগকারী দেশ। ১৮০টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান সংগঠনটির বিবেচনায় এ বছর ১৪৪তম স্থানে, দুই বছর আগে তা ১৪৬-এ ছিল। ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যথাক্রমে ১৫১ এবং ১৫০তম স্থানে। যারা এখন দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই বলে প্রতিদিন মিডিয়ার সম্মুখে বলছেন তাদের শাসনামলে তো দেশ এই র‌্যাঙ্কিংয়ে আরো পেছনে ছিল। নিজেদের শাসন সম্পর্কে সচেতন থেকে কথা বললে মনে হয় বলার কিছু ছিল না।

আমরা আমাদের বাস্তবতায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার এখনো অনেক সমস্যা বেশ গভীরে নিহিত যা ফিনল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডের নেই। সেটি বুঝেই আমরা মনে করছি দেশ নানা সীমাবদ্ধতার পরও এগুচ্ছে, মুক্ত গণমাধ্যমও এগুচ্ছে, এগুবে- এটি নিয়ম।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।