বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রশংসা করল বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রশংসা করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলেছে- বিশ্বের ১১৮টি দেশের মধ্যে মাত্র ১২টি দেশ ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। আন্তর্জাতিক বিবেচনায় এ অর্জন অনেক প্রশংসার। তবে চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ক্ষেত্রে সরকারি হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ব সংস্থাটি। বলেছে- চলতি অর্থবছর সরকার বলছে ৭ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। কিন্তু এ বছর শুধু রপ্তানি ও ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি ছাড়া কোনো সূচকই (প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে এমন) গত অর্থবছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি হয়নি, তাহলে কীভাবে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এত হবে। তবে আগামী অর্থবছর ২০১৭-এ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। বছরে দুবার এই আপডেট প্রকাশ করে থাকে সংস্থাটি। এতে বক্তব্য রাখেন ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান। আপডেট উপস্থাপন করেন প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। এ সময় যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহেরিন এ মাহবুবসহ বিশ্বব্যাংকের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রবৃদ্ধি অর্জনে অর্জিত সাফল্য অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উদ্বেগগুলো হচ্ছে- রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত সমস্যা ও ধীরগতি, বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন (বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন), আর্থিক খাতে আস্থার সংকট, জ্বালানি, অবকাঠামো ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ক্ষেত্রে আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে।

চিমিয়াও ফান বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে আর্থিক খাতে অগ্রগতি করছে, তা ধরে রাখা গেলে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানো সম্ভব। গত দশকে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। বিশেষ করে দারিদ্র্য নিরসন, মানব উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা আনয়ন, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা দেখিয়েছে। এসব অর্জন ধরে রেখে ভবিষ্যতে এগিয়ে যেতে হলে অকাঠামো উন্নয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। সে সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ নজর রাখতে হবে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক অনুমোদিত কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় আগামী পাঁচ বছর সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা দিয়ে যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। সুতরাং সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে এ বিষয়ে আরো সতর্ক হতে হবে।

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে অর্থনীতির জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- জ্বালানি সংকট, অবকাঠামো সংকট, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা, আর্থিক খাতে অনিয়ম, সুশাসন এবং সুব্যবস্থাপনা। এসব চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকি উন্নয়নে সরকারকেই কাজ করতে হবে। এখানে আন্তর্জাতিকভাবে সমাধানের খুব বেশি সুযোগ নেই। প্রাথমিক জ্বালানি সমস্যা সমাধানে দেশি-বিদেশি প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে জ্বালানি মূল্য নির্ধারণী নীতিতে সংস্কার করতে হবে।

মূল্যস্ফীতির বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখন সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারও সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সার্বিক মূল্যস্ফীতি চলতি অর্থবছরের মার্চে হয়েছে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা ২০১৫ সালের মার্চে ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে। এ ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য এবং বিনিময় মূল্য কমার কারণে এটা হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের মার্চে এ হার হয়েছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১৫ সালের মার্চে ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এটি হয়েছে চাহিদা ও ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি এবং সরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধির কারণে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বহির্বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো। রিজার্ভ বাড়ছে। কিন্তু সে সঙ্গে দেখা দিয়েছে সমস্যাও। বিশেষ করে রিজার্ভের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিনিময় হার ভালো অবস্থানে রয়েছে। তবে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স দ্রুত ওঠা-নামা করছে। যা আগে কখনো এতটা হয়নি। গত ৯ মাসে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ভালো ছিল না। ২ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এর কারণ হচ্ছে স্বাভাবিক শ্রমবাজার ভালো ছিল না। সুতরাং বিনিয়োগের যত ধরনের বাধা রয়েছে সেগুলোর দ্রুত সমাধান করতে হবে।

ব্যাংক সুদের হার সম্পর্কে বলা হয়েছে- শত কোটি টাকা তারল্য থাকা সত্ত্বেও সুদের হার সে অনুযায়ী কমছে না। সুদের হার কিছুটা ইতোমধ্যেই কমানো হলেও তা আরো কমানো সম্ভব ছিল। তবে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার করে ব্যাংক সুদের হার আরো কমানোর সুযোগ রয়েছে। বলা হয়েছে- সরকারি ব্যাংকে সুশাসন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ছিল, সেটা এখনো আছে। শেয়ারবাজারের অবস্থা খারাপ, আস্থার সমস্যা ছিল সেটা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে।

২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে যেতে পারবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়ার পথে রয়েছে। কিন্তু সেটি অর্জন করতে হলে এখন থেকে প্রস্তুতিমূলক ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলেই হবে না। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে জ্বালানি, যোগাযোগ, পরিবহন খাতে উন্নতি ঘটতে হবে। তা না হলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আসবে না। গত অর্থবছর ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে। সেটিকে ২৫ থেকে ২৬ শতাংশে নিতে হলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা কাটাতে হবে। বলা হয়েছে- অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে- শুধু ব্যক্তি খাতে ঢালাও বিনিয়োগ করতে দিলে হবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং ভঙ্গুরতা এই তিন সূচকের ওপর নির্ভর করে জাতিসংঘ স্বল্পোন্নত দেশের বাইরে যারা বেরিয়ে আসে সেসব দেশের তালিকা প্রকাশ করে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ একটি সূচকে ভালো করেছে। ২০১৮ সালের মধ্যে তিনটি সূচকের মধ্যে দুটিতে ভালো করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তখন জাতিসংঘের কমিটি বলবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হতে পারে।