বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ঘিরে নাগরিক প্রত্যাশা পর্ব-১

আন্তর্জাতিক নদী কৃত্য দিবস ’১৬ উপলক্ষে গত ১৩ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ‘জাতীয় নদী রক্ষা আন্দোলন’ সংস্থা দুটি থেকে জানানো হয়, ‘দেশের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত না করে শুধু বিদেশী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তা দেশের নদীগুলোর জন্য নতুন অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দেবে। ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের নামে ভুল পরিকল্পনায় দেশে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর দেশের বেশির ভাগ উপকূলীয় নদী আজ মৃত্যুর প্রহর গুনছে। এখন আবারো বিদেশী বিশেষজ্ঞনির্ভর ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (ডেল্টা প্ল্যান) নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। নেদারল্যান্ডসের ব-দ্বীপের আদলে করা ওই পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য কখনই বাস্তবসম্মত হবে না। বরং দেশের যে নদীগুলো কোনোমতে টিকে আছে, তা চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. শামসুল আলম বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনার কিছু কৌশলগত দিক নিয়ে বণিক বার্তায় (২৯ মার্চ ’১৬) আলোচনা করেছেন, যা অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। পানি ব্যবস্থাপনায় ডাচদের অভিজ্ঞতা অদ্বিতীয় বর্ণনা করে জ্যেষ্ঠ সচিব ব-দ্বীপ পরিকল্পনাকে বাংলাদেশের নিজস্ব বলে উল্লেখ করে বলেছেন যে, সম্পূর্ণ দেশীয় বিশেষজ্ঞ কর্তৃক এর খসড়া প্রণীত হচ্ছে। বিস্তারিত বর্ণনায় বলা হয়েছে, ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব হ্রাস করে, জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচনায় রেখে কৃষি, পানিসম্পদ, ভূমি, শিল্প, বনায়ন, মত্স্যসম্পদ প্রভৃতিকে গুরুত্ব প্রদানপূর্বক সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুষ্ঠু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি (৫০ থেকে ১০০ বছর) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের কর্মকৌশল নির্ধারণ করা। ব-দ্বীপ পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো হচ্ছে— ১. বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ২. পানি ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা ও পানির পর্যাপ্ততা বৃদ্ধি করা ৩. সমন্বিত ও টেকসই নদী ও নদী মোহনা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা ৪. জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং তাদের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা ৫. অন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও ন্যায়সঙ্গত সুশাসন গড়ে তোলা এবং ৬. ভূমি ও পানিসম্পদের সর্বোত্তম সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।’

উল্লিখিত ছয়টি বিষয়ের প্রতিটিতে দেশের সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট, নদী অববাহিকা ও উপকূলীয় জনসাধারণের লব্ধ জ্ঞানকে (ব্যাপক সার্ভেভিত্তিক) মহাপরিকল্পনায় সমন্বিত করার প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়গুলোকে দেশে বিশেষজ্ঞদের বিতর্ক হিসেবে উন্মুক্ত করে মহাপরিকল্পনায় তা যোগ করা সময়ের দাবি। আলোচনায় প্রবেশ করছি বাপার অভিযোগ দিয়ে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ দিয়ে নদী হত্যার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা নিরেট সত্য; তবে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান নিয়ে বিশেষ পয়েন্টনির্ভর সমালোচনা কাম্য ছিল বাপার কাছে। নাগরিক ও নাগরিক সংগঠনকে তথ্য সরবরাহের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের দায় থেকে যায়। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যানের ওপর দলিল কিংবা নাগরিক আলোচনার পরিসর উন্মুক্ত করা হয়নি এখনো।

নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশে ডেল্টার সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য

নদীমাতৃক হলেও নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক জীবনধারা ভিন্ন। নেদারল্যান্ডস উপকূলে বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ নেই, বিস্তৃত উপকূল অসংখ্য ড্যাম ও ডাইক দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়েছে। এ ডাইকগুলো দিয়ে সাগর থেকে ভূমি উদ্ধার করা হয়েছে, যা দেশটির মোট আয়তনের তিন ভাগের এক ভাগ প্রায়। অর্থাত্ দেশটির ১/৩ ভাগ সমুদ্র সমতলের নিচে! ডাইকগুলো সমতলে লোনা পানির আগ্রাসন ও স্থায়ী বন্যা প্রতিবন্ধক। এখানে ধান চাষ একেবারেই হয় না, খাদ্যাভ্যাস স্বল্প পানিনির্ভর কৃষিজাত পণ্য গম, ভুট্টা, যব, আলু ও দুধজাতীয় পণ্য (চিজ অ্যান্ড ব্রেড) ইত্যাদি নির্ভর। দেশটির বিস্তৃত মধ্যাঞ্চল গবাদিপশুর সুবিশাল চারণভূমি। পুরো দেশের সমতলই আর্টিফিশিয়াল ক্যানেল নেটওয়ার্কের আওতায় এনে স্বল্প পানিনির্ভর কৃষিজাতের আবাদ করা হয়। এই অগভীর ক্যানেলগুলোয় উইন্ড মিলভিত্তিক স্বাদু পানিপ্রবাহ সঞ্চালিত হয়। উল্লেখ্য, শীতকালীন দেশ হওয়ায় বছরে একটি মাত্র আউটডোর ফলন সম্ভব এ দেশের মাঠে। তবে এখানে বছরব্যাপী বিভিন্ন জাতের সব জর ফলন হয় বিশালাকায় গ্রিনহাউজে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূল ম্যানগ্রোভবেষ্টিত (সুন্দরবন), যা টাইডাল ওয়েভনির্ভর এক মহাপ্রাণের আধার। এটি একদিকে প্রাকৃতিক কর্মসংস্থানের আধার, অন্যদিকে ভারত মহাসাগরীয় দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বাংলাদেশের রক্ষাকবচ। সুতরাং শাখা-প্রশাখার ন্যায় নদীর জালবেষ্টিত এ উপকূলীয় অঞ্চলে কোনো রকমের নদী শাসন ও পানি ব্যবস্থাপনার মহা ম্যান মেইড পরিকল্পনা অগ্রহণযোগ্য। তবে ম্যানগ্রোভ ছাড়া বাকি নদী অববাহিকায় ডাচ অভিজ্ঞতা বাস্তবায়ন করা যায়, যেখানে ড্যাম ও ডাইকভিত্তিক স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণে শুধু পাইলটভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো যায়। তবে স্বাদু পানির সুব্যবহার নিশ্চিতে ক্যানেল নেটওয়ার্কের নলেজ ট্রান্সফার করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, যদিও খাল খনন কর্মসূচি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন নয়; দরকার ভিশননির্ভর বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে গড় বায়ুপ্রবাহ নেদারল্যান্ডসের তুলনায় খুবই কম বিধায় এখানে উইন্ড মিলনির্ভর পানিপ্রবাহ পরিকল্পনা কাজ করবে না। বাতাসের গতিবেগের সঙ্গে কিউবিক রিলেশনে বিদ্যুত্ উত্পন্ন হয় বলে আমাদের উইন্ড এনার্জির ভবিষ্যত্ আসলেই নাজুক। তবে বাংলাদেশের সেচ ব্যবস্থাপনায় সৌরবিদ্যুত্ খুবই সম্ভাবনাময়। উপরন্তু বিস্তৃত সমভূমি শুধু গবাদিপশুর চারণ ভূমির জন্য ছেড়ে দেয়ার ডাচ পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নিছকই উচ্চাভিলাষ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডসের তুলনায় কমপক্ষে ১০গুণ ঘনবসতিপূর্ণ!

নেদারল্যান্ডসের সাউথ-ইস্টে খুব ছোট কিছু বিচ্ছিন্ন ফরেস্টকে (পুরোপুরি ম্যানগ্রোভ বলা যায় না) বাঁচাতে দেশটির এ কর্নারে বাঁধ দেয়া হয়নি। সুন্দরবন বাঁচাতে আমাদের এ রকম কিছু করা লাগবে। অর্থাত্ (উদাহরণস্বরূপ) বরগুনা-পটুয়াখালীর পশ্চিম ও পূর্বকে আলাদা করে সুন্দরবনের দিকে কোনো ধরনের ম্যান মেইড ম্যানিপুলেশন করা যাবে না। আর বরগুনা থেকে চট্টগ্রামের দিকে মহাপরিকল্পনার অবকাঠামো পরিকল্পনা নেয়া যায় (নদীর মোহনায় স্লুইস কন্ট্রোল্ড ড্যাম ও আউটার সিতে ডাইক)।

এর বাইরে যা আলোচনায় আসা দরকার, মোহনায়-মহীসোপানে বাঁধ ও ডাইক থাকায় নেদারল্যান্ডসের নদ-নদী মত্স্যশূন্য প্রায়। এক্সট্রিম ওয়াটার গাইডের কারণে এখানকার মিঠা পানিতে বিপুল মত্স্য প্রজনন হয় না। সেখানে নদীভিত্তিক মত্স্য আহরণ কোনো পেশা নয়, নাগরিকদের কেউই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে না। নির্দিষ্ট ফিসহ বার্ষিক লাইসেন্স নেয়া লাগে নদীতে শখের বসে মাছ ধরতেও, যা কিছু ধনী লোকের শখ। সুতরাং বাংলাদেশের ব্যাপক মত্স্যজীবী মানুষের জীবনধারার বাস্তবতায় এটি একটা চরম ব্যতিক্রম, যা ডেল্টা পরিকল্পনার অপরিহার্য ইনপুট।

হাজার বছরে অর্জিত স্থানীয় জ্ঞানকে আধুনিক পরিকল্পনায় সংযুক্ত করুন

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী ও খালের পাড়ে শহর-বন্দর, হাটবাজার গড়ে উঠেছে শতাব্দীপ্রাচীন নৌপথভিত্তিক মাস ট্রান্সপোর্টেশনের কারণে, যা সভ্যতার অত্যন্ত যৌক্তিক অধ্যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সড়কপথ করার সময় দেখা যায়, ঠিক নদী বা খালের একটি কূল বন্ধ করে রাস্তা বানানো হয়েছে (কথিত মাটিপ্রাপ্তির সুবিধার জন্য)। কিন্তু এতে চাষের জমিতে পলিপতনে চরম প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে, বিপরীতে পলিপতনজনিত উর্বরা শক্তি ত্বরান্বিত করতে সঠিক সময়ে ওয়াটার পাসের জন্য প্রবাহনির্ভর ডাটা বেইজড ডাইমেনশন করে পর্যাপ্ত কালভার্ট, ব্রিজ কিংবা স্লুইস গেটের বন্দোবস্ত করা হয়নি কখনই। অথবা বর্ষা-পরবর্তী জলাবদ্ধতা কিংবা ফসল কাটা, নতুন ফসলের জন্য জমি প্রস্তুতে দ্রুত পানি সরানোর বিবেচনায় ব্রিজ-কালভার্ট ডিজাইন ও ডাইমেনশনে পরিবর্তন আনা হয়নি। কাঁচা-পাকা রাস্তা করা হয়েছে কিন্তু সেই এলাকার কয়েক যুগে হওয়া বন্যাগুলোর পানির উচ্চতা কেমন ছিল, তার গড় পরিমান আমলে নেয়া হয়নি। ফলে ২০১৫ সালের বন্যায়ও অনেক গ্রামের ভেতরের সব রাস্তা ও মূল রাস্তাটির অনেক অংশের ওপরই পানি উঠতে দেখা গেছে, অথচ পাশেরই শত বছরের পুরনো রেলসড়ক বন্যামুক্ত। উপরন্তু, মাটি ভরাটের রাস্তার বেইজে কংক্রিট সাপোর্ট না রাখায় বর্ষা ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে ভেঙে যাওয়া অংশে মাটি ফেলে মেরামত করা লাগে বছর বছর। পলিপতনের জন্য নদী বা খালের দুই কূল উন্মুক্ত রেখে দুই স্রোতধারার মাঝের ভূমিতে নতুন খাল খনন করে রাস্তা তৈরির ডিজাইন কোথাও চোখে পড়ে না, যা বাড়তি পানিপ্রবাহ ও শুকনা মৌসুমে পানি ধারণের বন্দোবস্ত করতে পারত। এর বাইরে রয়েছে অতিকায় নদীর ভাঙন রোধে বালি ও সিমেন্টের ছোট ছোট বস্তা ফেলার হাস্যকর নদী শাসন কিংবা শহর রক্ষা ব্যবস্থাপনা, যুগ যুগ ধরে এভাবে ফলহীন কাজ করে বিস্তৃত জনসাধারণকে ইকোনমিক্যালি ডিসপ্লেস করার পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল কিংবা নদী অববাহিকায় নেই কোনো স্বাদু পানি পুনঃসঞ্চালনের পরিকল্পিত ক্যানেল নেটওয়ার্ক। অর্জন বলতে তিস্তা, কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের মতো দু-তিনটি বৃহত্ সেচ ব্যবস্থাপনা, যা প্রতিবেশী দেশের অন্যায্য পানি প্রত্যাহারে অকেজো হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিস্তৃত সমতলে চাষাবাদের জন্য স্বাদু পানি পুনর্ব্যবহারের কোনো সমন্বিত ক্যানেল নেটওয়ার্ক নেই। এগুলো একেকটি পানি ব্যবস্থাপনার ডিজাইন গ্যাপ নির্দেশক, যা আমরা হয় ধরতে পারিনি অথবা দুর্নীতিপরায়ণতার কারণে বাস্তবায়ন করিনি। এগুলো আমাদেরই ডিজাইন ত্রুটি, ডেল্টা প্ল্যানের টেকসই ডিজাইনে এ ভুলে ভরা পরিকল্পনা গ্যাপগুলোর অঞ্চলভিত্তিক ইনপুট দেয়া দরকার। অন্যথায় ডেল্টা পরিকল্পনা দিয়ে আমাদের বন্যার পানি, সেচ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় টেকসই প্রযুক্তি সংযুক্ত করার ভিশন অর্জন হবে না।

জলবায়ু পরিবর্তন, ঋতু বৈচিত্র্যের ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতা, অনিয়মিত বৃষ্টি (অতিবৃষ্টি কিংবা অনাবৃষ্টি), বন্যা, শক্তিশালী দেশগুলোর তৈরি ফারাক্কারূপী মরণফাঁদ, আন্তর্জাতিক নদ-নদীর পানি প্রত্যাহার ও প্রবাহপথের পরিবর্তন, উত্স থেকে প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ হ্রাস, পলিপতন আর কূলের ভাঙনজনিত নাব্য হ্রাস, অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক পানির উেসর গভীরতা বৃদ্ধি, সর্বোপরি সমতলের স্বাদু পানি অঞ্চলে সাগরের লবণাক্ত পানির আগ্রাসন ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের কৃষক দিন দিন পানিহারা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পানি আগ্রাসনে পড়ছেন। স্যালাইন পেনিট্রেশনের কারণে উপকূলীয় কৃষির স্বাভাবিক ক্যালেন্ডার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সমস্যায় পড়ছে ফলনের জাত ও বীজ ব্যবস্থাপনার সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো। এর বাইরে রয়েছে চাষাবাদের রাসায়নিক আগ্রাসনজনিত স্থানীয় ফলন জাতের বিলোপ। ফলে বীজ ব্যবস্থাপনা প্রাকৃতিক ক্যালামিটির বিপরীতে ন্যাচারাল রেজিস্ট্যান্স হারিয়ে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ছত্রাকনাশক হয়ে পড়ছে, যা মাটি ও পানিকে বিষিয়ে কৃষিজমি ও স্বাদুু পানির অণুজীব ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিচ্ছে, জমি দিন দিন অনুর্বর হচ্ছে। পরিবর্তিত জলবায়ুর অনিরাপদ বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যত্ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যানকে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তায় এখন থেকেই বহু পরিকল্পনা হাতে নেয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে, আলোচ্য বিষয়ের শুধু একটি মাত্র হতে পারে এমন যে, ‘আমরা আমাদের খাদ্যাভ্যাসকে ধীরে ধীরে কিন্তু কার্যকরভাবে পরিবর্তন করব, যেখানে পানি নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে আসে।’ ধান চাষ অতিমাত্রায় পানিনির্ভর, যাতে স্থির কিংবা বদ্ধ পানি আবশ্যক। এটাই প্রধান সমস্যা। সুতরাং ভাতপ্রধান জাতিগুলো খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম শিকার হবে। আজ থেকে ৫০ বছর পর এত বিপুল পরিমাণ ধান উত্পাদনের পানি আসবে কোথা থেকে? ধান চাষে স্বাদু পানি ব্যবস্থাপনার এ দিকটি অবহেলিত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান উপকূলীয় স্যানিটেশন ও আবাসন উন্নয়ন ছাড়া খাদ্যনিরাপত্তায় খুব বেশি উপকার দেবে না। আমরা চাই, ক্যানেল ও রিনিউঅ্যাবল সোর্স যেমন— সোলারভিত্তিক সেচ কাঠামো পরিকল্পনা; যা পুরো বাংলাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে পড়বে। যদিও এটি খুব এক্সপেনসিভ ইনস্টলেশন হবে, তাও করতেই হবে। বর্ষা মৌসুমের বিপুল মিঠা জলরাশি সাগরে গড়িয়ে যেতে না দিয়ে সংরক্ষণ ও সঞ্চালনে কার্যকর কিছু করতেই হবে, নইলে সমূহ বিপদ। উন্মুক্ত সারফেস ওয়াটার তো নদীতে একেবারেই নেই! (বাকি অংশ আগামীকাল)