মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা সুদে গৃহঋণ দেওয়ার উদ্যোগ

নিজেদের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করে যারা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্য সরকার আরও একটি সুবিধা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের পাকা বাড়ি বানাতে বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কীভাবে এ ঋণ প্রকল্প চালু করা যেতে পারে তার পরামর্শ চাওয়া হয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পরামর্শমূলক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা সরকার থেকে যে ভাতা পান সেই ভাতার বিপরীতে অর্থাৎ ভাতা থেকে ঋণ সমন্বয়ের শর্তে এ প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। সরকার বাজেট বরাদ্দ দিয়ে এ প্রকল্পের অর্থ সরবরাহ করতে পারে অথবা ব্যাংকগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ দিতে পারে। কিন্তু ব্যাংক যেহেতু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সেহেতু বিনা সুদে ঋণ দেওয়া ব্যাংকের জন্য বাস্তবসম্মত নয়। তাই সুদ বাবদ সরকার ভর্তুকি দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য সুদ হারও ঠিক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পর্যালোচনা শেষে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মতামত নিয়ে ঠিক করা হবে কোন পদ্ধতিতে, কবে থেকে এ প্রকল্প কার্যকর করা হবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, সরকার এ প্রকল্প চালু করলে বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়েই করা ভালো। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা, যা সরকারই দিয়ে থাকে, সেখান থেকেই এ অর্থ ফেরত আসবে। আবার ব্যাংকগুলোও সহজে এ প্রকল্প পরিচালনায় আগ্রহী হবে। সরকার বাজেটে একবারে বরাদ্দ না দিয়ে ধাপে ধাপেও এ বরাদ্দ দিতে পারে। কিন্তু ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল হলে যেমন অতিরিক্ত অর্থ খরচের বিষয় রয়েছে, পরিচালনা নিয়েও অনেকের অনাগ্রহ থাকতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মুক্তিযোদ্ধাদের বিনা সুদে বাড়ি বানানোর ঋণ ব্যবস্থা চালু করার জন্য একটি পর্যালোচনা বৈঠক করেছে। পর্যালোচনায় বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও এলজিইডি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বাড়ি বানানোর প্রকল্পটিকে আদর্শ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পে দুই হাজার ৯৭১ মুক্তিযোদ্ধার জন্য বাড়ি বানানোর কার্যক্রম চলছে। প্রকল্পের একটি বাড়িতে রয়েছে দুটি বেডরুম ও বারান্দাসহ একতলা বাড়ি, আলাদা বাথরুম, টিউবওয়েল ও গরু এবং হাঁস-মুরগি পালনের শেড। এরকম একটি বাড়ি বানাতে ওই প্রকল্পে বাড়িপ্রতি সাত লাখ ৭৬ হাজার টাকা খরচ ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, দেশের সব মুক্তিযোদ্ধাকে ওই প্রকল্পের অনুরূপ বাড়ি বানানোর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে বাড়ি বানানোর খরচ আগের তুলনায় বাংলাদেশ ব্যাংক একটু বেশি ধরেছে। বর্তমান বাজারদরে এ ধরনের একটি বাড়ি বানাতে আট লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর তাতে দেশের ভাতাপ্রাপ্ত এক লাখ ৮৪ হাজার ৮৬ জন মুক্তিযোদ্ধার সবাই যদি এ প্রকল্পের ঋণ নেয়, তাহলে মোট ১৫ হাজার তিন কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ১০ বছর মেয়াদে এ ঋণ দেওয়া যেতে পারে। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক কিস্তি দিতে হবে ছয় হাজার ৭৯২ টাকা। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতি মাসে আট হাজার টাকা করে ভাতা পান। অর্থাৎ মাসিক কিস্তি পরিশোধের পরও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কিছু নগদ টাকা থাকবে। সোনালী, অগ্রণী, জনতা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে ভাতার এ অর্থ মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ঋণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এই ব্যাংকগুলোকেই সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে। যে বাড়ি নির্মাণ করা হবে সেই বাড়ি ও বাড়ির জমি ঋণের জামানত হিসেবে বন্ধক রাখবে ব্যাংক। কোনো মুক্তিযোদ্ধা ঋণ পরিশোধের আগে মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীরা ঋণ পরিশোধে বাধ্য থাকবে।

আর সরকার বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে যদি ব্যাংকগুলোকে অর্থায়নের জন্য বলে, সেক্ষেত্রে ৯ বা ১০ শতাংশ সুদ হার ধরা যেতে পারে বলে মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাতে ১০ বছরে ৯ শতাংশ সুদ হারে ভর্তুকি বাবদ সরকারকে ৩৭২ কোটি ৬২ লাখ আর ১০ শতাংশ সুদ হারে ৪১৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তবে সব মুক্তিযোদ্ধা যদি একসঙ্গে ঋণ গ্রহণ করেন তবে এ হিসাব প্রযোজ্য হবে।