নির্মিত হচ্ছে গভীর সমুদ্রে চলার কার্গো বিলাসবহুল জাহাজ

এগিয়ে চলেছে বরিশালের জাহাজ নির্মাণ শিল্প। এখানে নির্মিত হচ্ছে দেশের সর্ব অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিলাসবহুল যাত্রীবাহী লঞ্চ। শুধু বিশাল বিশাল যাত্রীবাহী লঞ্চই নয়, এখানে নির্মিত হচ্ছে গভীর সমুদ্র এবং অভ্যন্তরীণ নদীতে চলাচলের উপযোগী কার্গো জাহাজ, কোস্টার জাহাজ ও অয়েল ট্যাংকার। এ শিল্প ঘিরে বিনিয়োগ হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ শিল্পে কাজ করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন সহস্রাধিক শ্রমিক। শিপইয়ার্ড মালিকরা বলছেন, নদীভাঙন, বিদ্যুতের ঘাটতি, জ্বালানি গ্যাসের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি এবং স্টিল প্লেট পরিবহনে লক্ষ্মীপুর ও মাওয়া ঘাটে ফেরি বিড়ম্বনা দূর করা গেলে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বরিশালের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের। একটা সময় ছিল, যে কোনো ধরনের নৌযান তৈরি করতে হতো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম কিংবা মংলায়। নৌযান তৈরিতে এ জেলাগুলোর ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হতো সবাইকে। ঢাকা থেকে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের সব রুটে চলাচল করা যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো নির্মিত হতো বিশেষ করে ঢাকার শিপইয়ার্ডে। পণ্য কিংবা জ্বালানিবাহী জাহাজও নির্মিত হতো ঢাকায়। নদীর দেশ বরিশালে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নৌরুট গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানে নৌযান তৈরির তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। নির্ভর করতে হতো ঢাকাসহ অন্যান্য শিপইয়ার্ডের ওপর। ষাটের দশকের মাঝামাঝি ১৯৬৪ সালে বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের নয়ানী এলাকায় সাহেবের হাট খালের পাশে ছোট পরিসরে একটি ডকইয়ার্ড করেন বরিশালের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাবেক পৌর চেয়ারম্যান প্রয়াত গোলাম মাওলা। সেখানে একে একে কাঠ দিয়ে আঞ্চলিক রুটে চলার জন্য চারটি লঞ্চ নির্মাণ করেন তিনি। এই লঞ্চগুলো বছরে একবার মেরামতের প্রয়োজন। কিন্তু এখানে লঞ্চ মেরামতের তেমন কোনো সুবিধা ছিল না। তাই সেখানেই স্লিপার দিয়ে একটি স্থায়ী ডক তৈরি করে ফেললেন গোলাম মাওলা। সেখানে নিজেদের লঞ্চ মেরামত ছাড়াও বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোট ছোট লঞ্চ ও নৌযান তৈরির কাজ শুরু হয়। এতে সাফল্য আসায় আরও বড় পরিসরে ডকইয়ার্ড (শিপইয়ার্ড) তৈরির পরিকল্পনা করলেন গোলাম মাওলা। এবার তিনি কীর্তনখোলা নদীর তীরে নগরীর উপকণ্ঠ বেলতলা ফেরিঘাট এলাকায় বিশাল জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন সুরভী শিপইয়ার্ড। প্রায় দেড় বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পর ২০০০ সালে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত একটি জাহাজ পানিতে ভাসাতে সক্ষম হন তিনি। এমভি সুরভী-৪ নামের দ্রুতগতির ওই লঞ্চটি ঢাকা-বরিশাল নৌ-রুটে ব্যাপক যাত্রীসমাদৃত হয়। এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের শিপইয়ার্ডে আরও একটি জাহাজ নির্মাণের কাজ শুরু করেন তিনি। ২০০৬ সালে এমভি সুরভী-৬ নামে আরও একটি বিশালাকার অত্যাধুনিক জাহাজ পানিতে ভাসিয়ে বাজিমাত করে ফেলেন গোলাম মাওলা। তখন নৌ-রুটের যাত্রীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সুরভী কোম্পানির লঞ্চ। এরপর ওই শিপইয়ার্ডে এমভি সুরভী-৭ এবং সম্প্রতি নির্মিত হয়েছে বরিশাল-ঢাকা রুটের সবচেয়ে আধুনিক বিলাসবহুল জাহাজ এমভি সুরভী-৯। একই মালিকানাধীন সুরভী শিপিং লাইন্স ও ক্রিসেন্ট শিপিং লাইন্সের ব্যানারে বর্তমানে চলছে যাত্রীবাহী তিনটি অত্যাধুনিক জাহাজ এবং পণ্য পরিবহনের বিশাল পাঁচটি কার্গো ভেসেল। কোম্পানির সবগুলো যাত্রী, পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জাহাজই নিজস্ব শিপইয়ার্ডে নির্মিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুরভী গ্রুপ অব কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার মো. নুরুল ইসলাম। গোলাম মাওলার দেখানো পথে বেলতলায় কীর্তনখোলা নদীর তীরে বিশাল জায়গা নিয়ে সুন্দরবন শিপইয়ার্ড গড়ে তুলেছেন বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় লঞ্চমালিক সমিতির সহসভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু। ঢাকা-বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে নিজের মালিকানাধীন অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি সুন্দরবন-৭, ৮, ৯ ও ১১ এবং সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ চলা এমভি সুন্দরবন ১০ ও ১২, সমুদ্রগামী তিনটি এবং নদীতে চলাচলের উপযোগী পণ্যবাহী দুটি কোস্টার ও একটি অয়েল ট্যাংকার নির্মিত হয়েছে নিজস্ব শিপইয়ার্ডে। এ ছাড়া বরিশাল-লক্ষ্মীপুর রুটে চলা সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী এমভি পারিজাত এবং ইলেকট্রনিক সামগ্রী উত্পাদনকারক এমইপি কোম্পানির দুটি মালবাহী জাহাজ সুন্দরবন শিপইয়ার্ড থেকে নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিন্টু। তিনি বলেন, অর্ডার পেলেই ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী বরিশালের শিপইয়ার্ড থেকে এখন বিশ্বমানের নৌযান তৈরি করা সম্ভব। তবে এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে নদীভাঙন থেকে শিপইয়ার্ড রক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, গ্যাসের সহজলভ্যতা এবং ব্যাংকঋণ সহজীকরণ জরুরি বলে মনে করেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর পরিচালক সাইদুর রহমান রিন্টু। তার মতে, বরিশালে জায়গা ভাড়া ও শ্রমিক মজুরি কম। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার চেয়ে কম খরচে বরিশালে কাঁচামাল (প্লেট) পরিবহন করা যায়। সবকিছু মিলিয়ে বরিশালে জাহাজ নির্মাণে খরচ কম। তাই এখানে জাহাজ নির্মাণে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। অভ্যন্তরীণ রুটে দেশের সবচেয়ে বড় একমাত্র ডাবল বটম (দুই স্তরবিশিষ্ট তলদেশ) যাত্রীবাহী এমভি কীর্তনখোলা-২ লঞ্চও নির্মিত হয়েছে বেলতলায় কীর্তনখোলা নদীর তীরে শিল্পোদ্যোক্তা মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌসের নিজস্ব শিপইয়ার্ডে। এর বহরে রয়েছে কীর্তনখোলা-১ নামে আরও একটি জাহাজ। দুটি জাহাজের সাফল্যে প্রথমবারের মতো লিফটসহ আরও আধুনিক সুবিধার সমাহার নিয়ে অভ্যন্তরীণ রুটের সর্বাধিক ৩০৫ ফুট দীর্ঘ ও ফ্যান্টারসহ ৫৯ ফুট প্রস্থ বিশাল একটি জাহাজ নির্মিত হচ্ছে কীর্তনখোলা শিপইয়ার্ডে। এই জাহাজে লিফট ছাড়াও থাকছে নাব্যতা পরিমাপক ইকোসাউন্ডার, কুয়াশা ভেদকারী ফগার সার্চ, স্যাটেলাইট টিভি সংযোগ এবং একাকী (সিঙ্গেল) নারী, পুরুষ ও ছাত্রীদের জন্য আলাদা জোন। আগামী বছরই নতুন এই জাহাজ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা লঞ্চ ব্যবসায়ী ফেরদৌসের। তিনি বলেন, বরিশালেও এখন অনেক দক্ষ কারিগর তৈরি হয়েছে। তাদের হাতে বিশ্বমানের জাহাজ তৈরি সম্ভব। সরকার কিছু সমস্যার সমাধান করে দিলে এ শিল্পে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এসব শিপইয়ার্ডের সাফল্যে কীর্তনখোলা নদীর দক্ষিণ পাড়ে দপদপিয়ায় অ্যাডভেঞ্চার নামে একটি শিপইয়ার্ড গড়ে তুলেছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি নিজাম উদ্দিন। তার শিপইয়ার্ডে অ্যাডভেঞ্চার-৪ ও ৫ নামে সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী দুটি ওয়াটার বাস এবং অ্যাডভেঞ্চার-৬ নামে একটি আধুনিক লঞ্চের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই শিপইয়ার্ডে একাধিক কোস্টার জাহাজও নির্মিত হয়েছে। বরিশালে বড়-ছোট মিলিয়ে অন্তত ২০টি শিপইয়ার্ডে দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।