ফাস্ট ট্র্যাকে যুক্ত হচ্ছে আরও দুই মেগা প্রকল্প

ফাস্ট ট্র্যাকে যুক্ত হচ্ছে আরও দুই মেগা প্রকল্প। ফলে মোট প্রকল্পের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে দশে। প্রথমে ছয়টি প্রকল্প নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে বর্তমানে চলমান মেগা আট প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতিও সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করছে সরকার। আজ বুধবার ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং কমিটির চতুর্থ বৈঠকে অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান জনকণ্ঠকে বলেন, মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই এগুলোর মনিটরিং করছেন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে তখন সহজেই অনুমান করা যায় প্রকল্পগুলোর সঠিক বাস্তবায়নে সরকার কতটা আন্তরিক। তিনি বলেন, ফাস্ট ট্র্যাকে যুক্ত হওয়া মানেই প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্বের দিকটি উঠে আসে।

নতুনভাবে যুক্ত হতে যাওয়া দুটি প্রকল্প হচ্ছে, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প এবং দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমারের নিকটে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল রেললাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প। বর্তমান যেসব প্রকল্প রয়েছে সেগুলো হচ্ছে পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, মেট্রোরেল প্রকল্প, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প, পায়রা সমুদ্র বন্দর ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি যেমন বাড়বে, তেমনি বদলে যাবে দেশের চেহারাও। তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম মনিটরিং করছে সরকার। প্রকল্পগুলোকে ফাস্ট ট্র্যাক হিসেবে গণ্য করে জোরেশোরে চলছে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া।

ফাস্ট ট্র্যাকে যুক্ত হতে যাওয়া পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পটির বিস্তারিত হচ্ছে, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের জন্য ঢাকা-ভাঙ্গা ও ভাঙ্গা-যশোর রেললিংক বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এ রেলপথটি সম্পন্ন হলে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত দূরত্ব হবে ১৬৬ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে যশোর যেতে সময় লাগবে মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টা। রেললিংক লাইন বাস্তবায়ন করতে গোরিয়ার পর থেকে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ^রী নদীর ওপর প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলিভেটেড রেলপথ নির্মাণ করা হবে। নির্মাণ করা হবে ৪০টি আন্ডারপাস সেতু ও ৩টি ওভারপাস, যা রেলওয়েতে এই প্রথম। বর্তমানে প্রস্তাবটি অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কাছে ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

অন্যটি দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমারের কাছে ঘুমদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পটির সার্ভে করতেই শত বছরের বেশি সময় চলে গছে তারপর পাঁচ বছর আগে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা না পাওয়ায় এতদিন গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আটকে ছিল। বর্তমানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়নে সম্মত হওয়ায় বাস্তবায়নে যাচ্ছে প্রকল্পটি। এটি বাস্তবায়িত হলে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যেই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে এটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, ২০১০ সালে এক হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হলেও বর্তমানে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। (এর মধ্যে সরকারী তহবিলের চার হাজার ৯১৯ কোটি ৭ লাখ এবং এডিবির ঋণ ১৩ হাজার ১১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা)। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের কাজ শেষ করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পের মাধ্যমে দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার এবং রামু হতে মায়ানমারের নিকটবর্তী গুমদুম পর্যন্ত ২৮ দশমিক ৭৫ কিলোমিটারসহ মোট ১২৯ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণের মাধ্যমে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের যোগাযোগ স্থাপনসহ ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে।

আজকের বৈঠকে সরকারী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দ্রুত করতে প্রজেক্ট প্রিপারেটরি ফান্ড বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে। প্রকল্পের প্রাক যোগ্যতা যাচাই, ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রিপারেটরি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস ও ব্যবহার পদ্ধতি সংক্রান্ত এই প্রজেক্ট প্রিপারেটরি ফান্ড গঠনের কর্মপন্থা বিষয়ে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিকল্পনা বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রণীত প্রস্তাবসমূহ সমন্বয় করে সুপারিশ করার জন্য গঠিত মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে একটি কমিটি কাজ করছে। গত ১০ এপ্রিল এ কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ১০ জুনের মধ্যে এই কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।

আজকের সভায় উপস্থাপন হতে যাওয়া চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে যা জানা গেছে তা হলো।

পদ্মা সেতু ॥ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমানে পুরো প্রকল্পের ৩৪ শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে। অংশ হিসেবে মূল সেতু এবং নদী শাসনে কাজের মবিলাইজেশন কাজ চলমান রয়েছে। জাজিরা প্রান্তে এ্যাপ্রোচ রোডের কাজ ৬৫ শতাংশ, মাওয়া প্রান্তে এপ্রোচ রোডের কাজ ৭৩ শতাংশ, সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজ ৭৮ শতাংশ, মূল সেতু নির্মাণ কাজের ২১ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। তাছাড়া নদী শাসন কাজের অগ্রগতি ১৮ শতাংশ হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র ॥ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নিমাণ প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় চুক্তির কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। তৃতীয় চুক্তির অধিকাংশ কাজ সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ীই চলছে। চতুর্থ চুক্তির মূল্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। চতুর্থ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত প্রধান কাজ হচ্ছে মূল নির্মাণ কাজের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ। মূল প্ল্যান্টের ডিজাইন ডকুমেন্টেশন প্রণয়ন এবং মূল নির্মাণ কাজের জন্য জেনারেল কন্ট্রাক্ট ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছে।

রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র ॥ রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্রটি বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড এবং ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানি ইন্ডিয়া লিমিটেড যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ওয়নারস ইঞ্জিনিয়ার এবং কোল কনসালটেন্ট নিয়োগের বিষয়, ইএআই ক্লিয়ারেন্স, ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন-১ এর কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ীই চলছে।

মাতারবাড়ি বিদ্যুত কেন্দ্র ॥ মাতাবাড়ী বিদ্যুত কেন্দ্রে ওনার ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ, ল্যান্ড হ্যান্ডেড, ইআইএ ক্লিয়ারেন্সের কাজ শতভাগ এভং বাউন্ডারি ফেন্সিংয়ের কাজ নব্বই শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে। প্রকল্পের জন্য পরামর্শক নিয়োগ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং অধিগ্রহণকৃত জমির চারদিকে সীমানা ফেন্সিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

মেট্রোরেল প্রকল্প ॥ মেট্রোরেল প্রকল্পটির সার্ভের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আরলি কমিশনিংয়ের জন্য ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসিক ডিজাইন ও ডিটেইল ডিজাইনের কাজ শেষ হয়েছে। এমআরটি লাইন-৬ এর জমির রেজিস্ট্র্রেশন সম্পন্ন হয়েছে।

এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প ॥ বিদ্যুত ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ আইন) ২০১০ এর আওতায় এ্যাস্ট্রা ওয়েল এ্যান্ড এক্সিলারেট এনার্জি কনসোর্টিয়াম সিঙ্গাপুরের সঙ্গে পেট্রোবাংলার সঙ্গে টার্ম শীট এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছে। টার্ম শীট এগ্রিমেন্টটি স্বাক্ষরের পরিপ্রেক্ষিতে স্টাডির কাজ শুরু হয়েছে। এলএনজি আমদানির জন্য কাতারের সঙ্গে একটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে টাইম বাউন্ড এ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে।

গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প ॥ কক্সবাজার জেলার সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য জাপানের পেসিফিক কনসালটেন্ট ইন্টারন্যাশনাল একটি টেকনো ইকোনমিক স্টাডি সম্পন্ন করেছে। প্রকল্পটি প্রাথমিকভাবে পিপিপিতে নির্মাণের জন্য নির্ধারিত থাকলেও আগ্রহী বিনিয়োগকারী না পাওয়ায় সরকার টু সরকার ভিত্তিতে (জি টু জি) বাস্তবায়নের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রাপ্ত প্রস্তাবসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে ১০ সদস্যের কমিটি কাজ করছে। অর্থের বিষয়টি চূড়ান্ত হলেই শীঘ্রই গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ শুরু হবে।

পায়রা বন্দর প্রকল্প ॥ এইচআরওয়ালিংফোর্ড নামের একটি ব্রিটিশ কনসালটিং ফার্মকে পায়রা বন্দরের টেকনো ফ্যাজিবিলিটি স্টাডি ও মাস্টারপ্ল্যান করার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে।

Views: 19