বাংলাদেশী পোশাকের জন্য ভারত ও চীনের ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের বাজার ধরাই গুরুত্বপূর্ণ

ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স ফেডারেশন (আইটিএমএফ) প্রতিষ্ঠা হয় ১৯০৪ সালে। বস্ত্র খাতের আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম হিসেবেই নিজেদের পরিচিতি দাবি করে বেসরকারি বাণিজ্য সংগঠনটি। বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান ডেলকট লিমিটেডের আহ্বানে আইটিএমএফের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি দেশে আসে। দলটির নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির মহাপরিচালক ড. ক্রিশ্চিয়ান পি. শিন্ডলার। বণিক বার্তার সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন বাংলাদেশের বস্ত্র খাত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন বদরুল আলম।

তুলাজাত প্রাকৃতিকের সঙ্গে কৃত্রিম সুতা-কাপড়ের বর্তমান চাহিদার তুলনামূলক অবস্থান প্রসঙ্গে জানতে চাই।

পূর্ব ইতিহাসের ভিত্তিতে বলা যায়, বিশ্বব্যাপী পলিয়েস্টার ফিলামেন্টের (কৃত্রিম সুতা) অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। কার্যকারিতা ও গুণগত মানই এর জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে। এতে কাপড় তৈরিও অনেক সহজ। কর্তৃপক্ষ যখন খুশি এর উত্পাদন বন্ধ ও চালু করতে পারে। বৈশ্বিক উত্পাদন ব্যবস্থা পর্যালোচনায় বোঝা যায় পণ্যটির সরবরাহ, চাহিদা ও মূল্য নির্ধারণ এখন অনেক সহজ হয়ে এসেছে। তবে তার মানে এই নয় যে, কটনপণ্য (তুলাজাত সুতা-কাপড়) বিশ্ব থেকে হারিয়ে যাবে। গোটা বিশ্বেই কটন পণ্যের কার্যকারিতা বৃদ্ধির চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে তুলা ও কৃত্রিম বা মানুষের তৈরি সুতা ব্যবহারের আনুপাতিক হার ২৮:৭২। বিশ্বব্যাপী দুই ধরনের সুতায় উত্পাদিত কাপড়ের ব্যবহার বাড়বে।

চাহিদা বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে রফতানির সম্ভাবনাময় বাজার সম্পর্কে আপনার মত কী?

২০১২ সালে ভারত ও চীনের বাজারে বস্ত্রপণ্যের খুচরা মূল্য ছিল ১৯৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা দাঁড়াবে ৭৫০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাত্ ২০১২-২৫ সালের মধ্যে বস্ত্রপণ্যের খুচরা বাজারে বিক্রি বাড়বে ১১ শতাংশ। এ থেকে বাংলাদেশের জন্য যে বার্তাটি পরিষ্কার ও গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এশিয়ার মধ্যে ভারত ও চীনের বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজার ২০১২ সালে ৫৭৫ বিলিয়ন ডলারের হলেও ২০২৫ সালে এর পরিমাণ হবে ৭২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ বাংলাদেশের জন্য দুই বাজারের বিস্তৃতি প্রায় সমান আকার ধারণ করবে।

চীনের বস্ত্র উত্পাদনের ৮০ শতাংশ তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের জন্য। মাত্র ২০ শতাংশ উত্পাদন হয় রফতানির লক্ষ্যে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি পুরোই উল্টো। চীনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের বেলায় গুরুত্ব বেশি রফতানি বাজারের। যেটা বলতে চাইছি, চীনের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ব্যাপক। আর চীনে প্রতি বছর ১০-১৫ শতাংশ হারে মজুরি খরচ বাড়ছে। ফলে দেশটির উত্পাদনও সরে যাবে অন্য সম্ভাবনাময় দেশগুলোয়। জনপ্রতি বস্ত্রপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি ও সামগ্রিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ভারত ও চীন ক্রমেই আকর্ষণীয় বাজার হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের বস্ত্র খাতকে আরো টেকসই করার জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত?

শিল্প খাত বিবেচনায় একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বাজার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকে। সময়মতো পণ্য সরবরাহে কোনো সমস্যা হয় না। শুধু রফতানি বাজারের ওপর নির্ভরশীল না থেকে অভ্যন্তরীণ বাজার থাকলে সামগ্রিকভাবে তা খুবই নিরাপদ। বাজার বৈচিত্র্যের প্রয়োজনেও এর গুরুত্ব অনেক। এজন্য নিজস্ব ব্র্যান্ড ও সাপ্লাই চেইন তৈরি করা জরুরি। ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে রাখায় এটা গুরুত্বপূর্ণ। মূল্য ওঠানামা, রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকি বিবেচনায় একটা শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার থাকলে তা অনেক সুবিধাজনক।

বস্ত্রপণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোয় আরো কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

বিশ্বব্যাপী সাধারণ পোশাকের কদর কমছে। এর জায়গা দখল করে নিচ্ছে স্মার্টফোনের মতো ইলেকট্রনিক পণ্য। মানুষ এখন এ ধরনের পণ্যের পেছনে ব্যয় অনেক বাড়িয়েছে। দুর্ভাগ্যবশে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষ মৌলিক বস্ত্রপণ্যে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। তবে বিলাসী বস্ত্রপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। যেমন কিছু পোশাক আছে, যা গায়ে দিলে স্বাস্থ্যগত অবস্থার ধারণা পাওয়া যায়। আসল বিষয় হলো, বস্ত্রপণ্য উত্পাদনে প্রযুক্তির সঙ্গে মেলবন্ধন তৈরি প্রয়োজন। বাংলাদেশের বস্ত্র খাতে সংশ্লিষ্ট মূলধনি যন্ত্র আমদানির পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায় এতে বিনিয়োগ বাড়ছে। এছাড়া প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি শ্রম দক্ষতাও বাড়াতে হবে। কারণ বিশ্বব্যাপী বস্ত্রপণ্য উত্পাদনে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি রয়েছে।