‘দুর্ঘটনার পর শ্রমপরিবেশ উন্নত হয়েছে’

তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি (অর্থ) মোহাম্মদ নাসির বলেছেন, ‘সাভারের রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর দেশের শ্রমপরিবেশ উন্নত হয়েছে। বিদেশি  ক্রেতাদের তত্ত্বাবধানে অনেক গার্মেন্ট মালিক তাঁদের বিল্ডিং সংস্কার বা পুনঃসংস্কার করেছেন। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহত ও পঙ্গু শ্রমিকদের পরিবারের জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে অনেক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার অব্যাহত আছে। আমরা এখনো রানা প্লাজার দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের জন্য কাজ করছি।’ রবিবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের সমসাময়িক বিষয় নিয়ে পর্যালোচনাভিত্তিক টক শো সেভেন হর্স মুক্তবাক অনুষ্ঠানে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিক রাহুল রাহার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো আলোচনা করেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান ও টিআইবির কর্মকর্তা নুরুল হাসান।

মোহাম্মদ নাসির বলেন, ‘রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় আহত ৫১৫ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানে সহায়তা করেছে জার্মান সরকার। এসব শ্রমিক আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা এখন উপার্জন করছে। পক্ষাঘাত পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) ও অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে জিআইজেড। গার্মেন্ট মালিকদের পক্ষ থেকেও অনেক সহায়তা করা হয়েছে।’

ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, ‘বিশ্বে কোনো একক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যার বিচারে শুধু নয়, শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও লোভের বিচারেও রানা প্লাজা ধস ছিল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। সেদিন শ্রমিকরা কারখানায় ঢুকতে চায়নি। কিন্তু ভবনের মালিক ও ভেতরে অবস্থিত চারটি কারখানার মালিকদের কাছে দ্রুত অর্ডারের সাপ্লাই নিশ্চিত করাই ছিল প্রধান বিষয়। এতে মুনাফা নিশ্চিত হলেও শ্রমিকদের যে ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া হলো, তা নিয়ে তাঁদের কোনো চিন্তা ছিল না।  সমগ্র বিশ্বকে আজ একটি সিগন্যাল দেওয়া প্রয়োজন, সেটি হচ্ছে—প্রাণের বিনিময়ে মুনাফা উপার্জন চলবে না। তবে কেউ কেউ বলতে পারেন, এই শিল্প বাংলাদেশের ৪৪ লাখ শ্রমিকের চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছে, ২৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় সৃষ্টি করছে। বিশ্বে তুলা উত্পাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। সামনে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা।’ তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশের বিদ্যমান  পোশাকশিল্পের ইতিহাস কমবেশি ৩০ কি ৩৫ বছরের। এই সময়ে একটি শিল্পের এ রকম উল্কাসদৃশ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে সস্তা শ্রমসহ কতগুলো বিশেষ সুবিধা ও নিয়ন্ত্রণহীন বিকাশের সুযোগ থাকার কারণে। যেমন ধরুন, ভাড়া করা বাসাবাড়িতে ছোট্ট একটি মেশিন বসিয়ে একটি  পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছে, শিল্পের স্ট্যান্ডার্ড আইনে তা কখনো অনুমোদনযোগ্য ছিল না। পরবর্তী ধাপে এটা ‘শেয়ারড’ বিল্ডিংয়ে পরিণত হয়েছে। রানা প্লাজায়ও একইভাবে চার-চারটি ফ্যাক্টরি একই বিল্ডিংয়ে ভাড়া নিয়ে চালু ছিল। এভাবে এই দুর্ঘটনার পর যতটা পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন ছিল তা আজও হয়নি।”

এ পর্যায়ে টিআইবির কর্মকর্তা নুরুল হাসান বলেন, ‘রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর এখনো অনেক পরিবর্তন প্রয়োজন, এটা ঠিক। কিন্তু কিছু কাজ যে হয়েছে সেটাও আমাদের তুলে ধরতে হবে। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫০৯ জনকে চিকিৎসা ও ৩৯০ জনকে কারিগরি প্রশিক্ষণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সহায়তাপ্রাপ্ত এসব ব্যক্তির বেশির ভাগই বর্তমানে বিভিন্ন ব্যবসা উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ উপার্জনে সক্ষম হয়েছেন। গবেষণায় ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে তাঁরা বর্তমানে উপার্জন করছেন এবং তাঁদের বেশির ভাগই নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছে। ৬ শতাংশ ফিরে গেছে পোশাক কারখানার কাজে এবং ১৩ শতাংশ দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে এখনো কোনো কাজে যোগ দিতে পারেনি।’