‘প্রাণ’ ফেরাতে নানা উদ্যোগ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন

রাজধানীর চানখাঁরপুল থেকে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার অনুপযোগী ছিল। দু’পাশের ফুটপাত ধরে কেউ হাঁটতে পারতেন না। নগর ভবনের পেছনের ফুটপাত থেকে মল-মূত্রের দুর্গন্ধও নগর ভবনে ঢুকে পড়ত। এ ছাড়া ছিল দখলদারদের দৌরাত্ম্য। রাস্তাটিকে প্রাণ দিতে ও ফুটপাতকে ব্যবহার উপযোগী করতে সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন নিজে ওই পথ দিয়ে নগর ভবনে যাতায়াত শুরু করেন। রাস্তাটি এখন অনেকটাই ব্যবহার উপযোগী।

কেবল এই একটি দৃষ্টান্তই নয়, ডিএসসিসি এলাকার বাসিন্দাদের ভোগান্তি কমাতে অনেক পদক্ষেপই নিয়েছেন তিনি। রাজধানীকে বর্জ্যমুক্ত করতে ২০১৬ সালকে পরিচ্ছন্ন বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কারণ তিনি মনে করেন, ডিএসসিসি এলাকার অন্যতম সমস্যা বর্জ্য। এ সমস্যার সমাধান করতে পারলে অন্য সমস্যাগুলোরও সমাধান হবে। সমকালকে তিনি বলেন, ‘আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। কিন্তু আমার একার পক্ষে নগরীর এত সমস্যার সমাধান সম্ভব না। প্রত্যেক নাগরিক এই শহরটাকে নিজের ড্রইং রুম ভেবে কাজ করলে একটি পরিচ্ছন্ন বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে ঢাকা।’

ডিএসসিসির যত উদ্যোগ :বর্তমানে ডিএসসিসি এলাকায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০টি ছোট-বড় রাস্তার উন্নয়ন কাজ চলছে। এ কাজগুলো শেষ হলে নগরীর পাড়া-মহল্লায় খারাপ রাস্তা থাকবে না। এরই মধ্যে ইংলিশ রোড পার্ককে দখলমুক্ত করা হয়েছে। এই পার্কটি দখলদাররা দখল করে সেখানে ট্রাক টার্মিনাল ও উঁচু বর্জ্যের ঢিঁবি বানিয়েছিল। সেটিকে পার্কের চেহারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। নগরীকে বর্জ্যমুক্ত করতে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে জনসচেতনতামূলক পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে বিশ্বনন্দিত ক্রিকেটার, এভারেস্টজয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারীসহ অনেকেই এসব অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নগরবাসীকে সচেতন করছেন। শাহবাগে বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে আয়োজন করা হয়েছে ‘লাভ ফর ঢাকা কনসার্ট’। এতে অংশ নিয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ হাজার ডাস্টবিন স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। গুলিস্তান, চানখাঁরপুল, দোলাইখাল, বাবুবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন দখলপ্রবণ এলাকাকে দখলদারমুক্ত করতে চলছে একের পর এক অভিযান। এসব অভিযানের মাধ্যমে গুলিস্তানসহ অনেক এলাকাকে অনেকটাই দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন স্থানে অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। ফুটপাতের হকারদের পুনর্বাসনের জন্য তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। ইতিমধ্যে প্রায় আড়াই হাজার হকারের তালিকা করা হয়েছে।

নগরীকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখতে প্রায় বিলবোর্ডমুক্ত হয়েছে ডিএসসিসি এলাকা। অথচ আগে অলি-গলিতেও ছিল অবৈধ বিলবোর্ডের দৌরাত্ম্য। বর্তমানে চলছে পরিকল্পিতভাবে এলইডি বোর্ড স্থাপনের কার্যক্রম। এরই মধ্যে শাহবাগে একটি এলইডি বোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। অতীতের মতো ভারী ভারী ঝুঁকিপূর্ণ বিলবোর্ড অনুমোদনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ।

গুলিস্তান এলাকার যানজট কমাতে নেওয়া হয়েছে এক ভিন্নধর্মী উদ্যোগ। গোলাপশাহ মাজার থেকে নবাবপুর রোড পর্যন্ত অংশে নির্মিত হচ্ছে দোতলা ফুটপাত (এলিভেটেড ওয়াকওয়ে)। বাংলাদেশের কোথাও এর আগে এলিভেটেড ওয়াকওয়ে নির্মিত হয়নি। পরিকল্পনা আছে দৈনিক বাংলা, নয়াপল্টন, কাকরাইল থেকে গুলিস্তান হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত এলাকাকে এলিভেটেড ওয়াকওয়ের আওতায় নিয়ে আসার। এটা করা হলে এসব রুটে চলাচলকারীরা হেঁটেই গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারবেন।

ডিএসসিসি এলাকাকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। সম্প্রতি মেয়র নিজে গোপীবাগে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। এ ছাড়া যানজট নিরসনেও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব ক্যামেরার সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগকে সম্পৃক্ত করা হবে। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এলে সন্ত্রাসও কমে আসবে।

বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে অতীতে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটা তেমন কাজে আসেনি। এবার বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় রায়েরবাজার থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গা ও নদীর পাড়কে আধুনিকায়ন করা হবে। এ প্রকল্পের আওতায় নদীর পাড়ে বিনোদন পার্ক, তিন-পাঁচ তারকা হোটেল, নদীতে প্রমোদভ্রমণের ব্যবস্থা, নদীর পানির মান ভালো রাখতে রিসাইক্লিং পন্ডও স্থাপন করা হবে।

অতীতে রাজপথের অর্ধেক সড়কবাতিই থাকত নষ্ট। এ অবস্থার ইতিমধ্যেই উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে ৮০ শতাংশ বাতি ভালো বলে দাবি ডিএসসিসির। এ ছাড়া কারওয়ানবাজার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পর্যন্ত সড়কে স্বচ্ছ আলোদানকারী এলইডি বাতি সংযোজন করা হয়েছে। সোডিয়াম লাইটের পরিবর্তে এলইডি বাতি সংযোজনের ফলে নগরীর সৌন্দর্য যেমন বেড়েছে, পাশাপাশি সন্ত্রাসও কমবে বলে বিশ্বাস। আগামী দুই বছরের মধ্যে পুরো ডিএসসিসি এলাকার সব সড়কে এলইডি বাতি স্থাপনের কাজ শেষ হবে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ফাঁকি রোধে স্থাপন করা হয়েছে ডিজিটাল হাজিরা পদ্ধতি। কর্মকর্তা থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদেরও আঙুলের ছাপ দিয়ে প্রতিদিন সকাল ৯টার ভেতর হাজিরা নিশ্চিত করতে হয়। পাঁচ মিনিট অতিবাহিত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই ব্যক্তি অনুপস্থিত হয়ে যান। ফলে দেরিতে অফিসে হাজিরা পুরোটাই এখন বন্ধ।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এলাকাবাসীর সমস্যার কথা জানতে

মেয়র নিজে জনতার মুখোমুখি হচ্ছেন, সমস্যার কথা শুনছেন এবং সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে পাঁচটি অনুষ্ঠানে মেয়র জনতার মুখোমুখি হয়েছেন। এর ফলে এলাকাবাসীর ছোট ছোট অনেক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হয়েছে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠনের কাজও শুরু হয়েছে।

নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে ১০০ হকারকে নিরাপদ খাদ্য গাড়ি দেওয়া হয়েছে। আরও ১০০ গাড়ি শিগগির দেওয়া হবে। এ ছাড়া পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করতে বিনামূল্যে ৭ লাখ মোটা পলিথিন ব্যাগ বিতরণ, ফুটওভারব্রিজের আধুনিকায়ন, কমিউনিটি সেন্টারগুলোর আধুনিকায়ন, ই-টেন্ডার চালু, পার্কগুলোর আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান, উত্তর সিটি করপোরেশনের অনেক এলাকাই পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। কিন্তু দক্ষিণে সেটা হয়নি। এ জন্য দক্ষিণে সমস্যাও অনেক বেশি। তার পরও মেয়র সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আন্তরিক।