দৃশ্যমান উন্নয়নের ছোঁয়া

চোখে পড়ার মতো নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়নকাজ চলছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে। জনদুর্ভোগ যথাসম্ভব দ্রুত সহনীয় পর্যায়ে আনতে মেয়র আনিসুল হক দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা যে শুধু কথার কথাই নয়, তা বিশ্বাস করছেন লোকজন। তাদের ধারণা, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নাগরিক সমস্যার হাত থেকে তারা মুক্তি পাবেন।

ছয় মাস আগেও তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালের সামনের রাস্তায় মানুষের পক্ষে হেঁটে চলাফেরা করা ছিল দুঃসাধ্য। এখন সেখানে ট্রাক, কাভার্ডভ্যানের জট দূরে থাক, রেলগেট বন্ধ থাকলেও ট্রাফিক জ্যাম হয় না। একদা যা অসম্ভব মনে হলেও ডিএনসিসি এলাকা থেকে ইতিমধ্যে ২২ হাজার বিলবোর্ড অপসারণ করা হয়েছে। আবারও খোলা আকাশ দেখতে পাচ্ছেন নাগরিকরা। বর্তমানে চলছে এলইডি বোর্ড স্থাপনের কার্যক্রম। ফুটপাত, রাস্তা আধুনিকায়নের কাজ চলছে সর্বত্র। খুশির খবর, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় অসহনীয় প্রতিকারহীন দুর্ভোগে ভুগছিলেন নগরবাসী। এখন ডিএনসিসির বহু এলাকায় পুরোদমে ড্রেনেজের কাজ চলছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএনসিসি বিভিন্ন এলাকার প্রতিটি হোল্ডিংকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে শুরু হয়েছে পাঁচ হাজার ডাস্টবিন বসানোর কাজ। সবকিছু ঠিকমতো চললে অচিরেই পাল্টে যাবে ঢাকা উত্তর।

গত ১১ মাসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন মেয়র আনিসুল হক। বেশ কিছু সমস্যার সমাধানও করেছেন। ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাউল ইসলাম সমকালকে জানান, অতীতে সিটি করপোরেশনে টেন্ডার নিয়ে বিস্তর সমালোচনা ছিল। এখন আর সে

অভিযোগ নেই। কারণ, মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পরই সব ই-টেন্ডার করে দিয়েছেন। এখন পেশাদার ঠিকাদাররাই কাজ করছেন। কাজের মানও ভালো হচ্ছে। একটি রাস্তা নির্মাণ বা মেরামতের দু-এক বছরের মধ্যেই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই।

পাল্টে গেছে তেজগাঁও :ছয় মাস আগেও তেজগাঁও এলাকায় আসতে ইচ্ছা হতো না মানুষের। কিন্তু ট্রাক টার্মিনালের সামনের রাস্তাকে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানমুক্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক প্রমাণ করেছেন, সদিচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব। টার্মিনালের সামনের রাস্তা দখলমুক্ত করতে গিয়ে মেয়র আনিসুল অবরুদ্ধও হয়েছিলেন। কিন্তু থেমে না গিয়ে মন্ত্রী-এমপি, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সহযোগিতায় টার্মিনালের রাস্তাকে তিনি দখলমুক্ত করেন।

সম্প্রতি এই প্রতিবেদক সেখানে গিয়ে দেখেন, এরই মধ্যে সড়কবিভাজক নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। বিভাজকের গ্রিলগুলো রঙ করা হয়েছে। ভেতরে ফুলগাছ লাগানোর কাজ চলছে। রাস্তাও নতুন করে মেরামত হয়েছে। খুব সহজেই এখন সাতরাস্তা থেকে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, তেজকুনীপাড়া, তেজগাঁও রেলস্টেশনে যাতায়াত করা যায়।

চলাচল হচ্ছে ঝামেলামুক্ত, স্বাচ্ছন্দ্যের :শ্যামলী থেকে আমিনবাজার পর্যন্ত রাস্তাকে পার্কিংমুক্ত ঘোষণা করেছেন মেয়র আনিস। যদিও সম্প্রতি এ সড়কে আবার পার্কিং শুরু করেছে অসাধু চালকরা। মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেট থেকে বছিলা রোডকে দখলমুক্ত করে সেখানে নতুন প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। সহজেই এখন বছিলায় যাতায়াত করা যায়। রাস্তাটি দখলমুক্ত ও আধুনিকায়নের পর এ রুটে নতুন বাস সার্ভিসও চালু হয়েছে। বছিলা থেকে অনেকেই ঢাকা এসে স্বাচ্ছন্দ্যে অফিস করছেন।

এদিকে, গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফুটপাত, রাস্তা ও ড্রেন আধুনিকায়নের কাজ পুরোদমে চলছে। একই কাজ চলছে উত্তরায়। পুরো কাজ শেষ হলে এসব এলাকার দৃশ্যপট বদলে যাবে।

উত্তরা থেকে তেজগাঁও সাতরাস্তা পর্যন্ত সড়কে ২২টি ইউলুপ স্থাপনের কাজ চলছে। বর্তমানে এ সড়কের কয়েকটি পয়েন্টে ভয়াবহ যানজট হয়। এগুলো তৈরি হলে এ সড়কের যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।

ফুট ওভারব্রিজগুলো ব্যবহারোপযোগী করতে শুরু হয়েছে আধুনিকায়নের কাজ। শাহীনবাগে একটি ফুট ওভারব্রিজকে সাজানো হয়েছে দৃষ্টিনন্দন গাছগাছালি দিয়ে। বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে নতুন একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন :বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে ৭২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি। এরই মধ্যে দুটি স্টেশন চালু করা হয়েছে, সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়েছে আরও ১২টি। শিগগিরই এগুলোর উদ্বোধন করবেন মেয়র। ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন বিপন কুমার সাহা সমকালকে বলেন, ‘আগে নিকেতন এলাকায় উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলা হতো। সেখানে এসটিএস চালু হওয়ার পর থেকে এলাকার চেহারাই পাল্টে গেছে। কাউকে আর ওই পথে চলতে নাক চেপে রাখতে হয় না।’

এ ছাড়া নগরীতে পাঁচ হাজার ডাস্টবিন বসানোর কাজ চলছে। এরই মধ্যে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের শেওড়াপাড়ায় দুই শতাধিক ডাস্টবিন স্থাপন করা হয়েছে।

নিরাপত্তা :গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। এরই মধ্যে দুই শতাধিক ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ডিএনসিসি এলাকার প্রতিটি হোল্ডিংকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করা হবে।

ডিএনসিসির গাড়িতে জ্বালানি ও ট্রিপ চুরি বন্ধে সংযোজন করা হয়েছে ভিটিএস (ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি সংযোজনের ফলে কখন কোন গাড়ি কোথায় আছে, কী পরিমাণ রাস্তা চলাচল করেছে, এসবের তথ্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকেই জানা যাবে।

আমিনবাজার ল্যান্ডফিল সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। কারণ, একই ময়লা দু’বার ফেলে জ্বালানি চুরির অভিযোগ ছিল অসাধু চালকদের বিরুদ্ধে। আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ফাঁকি দেওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এতে সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তিতে পড়তেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ফাঁকি বন্ধে ডিজিটাল হাজিরা চালু করা হয়েছে। শিগগিরই গুলশানে ইউনাইটেড টাওয়ারে ‘নগর ভবন’ স্থানান্তরের পর তা ডিজিটাল করা হবে।

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেন পরিষ্কার রাখতে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি জেট অ্যান্ড সাকার মেশিন আমদানি করা হয়েছে। পাশাপাশি খালগুলোয় পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে ওয়াসার সঙ্গে কাজ শুরু করেছে ডিএনসিসি। ফুটপাত ও রাস্তা দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রেও কাউন্সিলরদের কাজে লাগানো হচ্ছে। মশক নিধন, রাস্তা মেরামত, সড়কবাতির আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও ডিএনসিসির সফলতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ভ্রাম্যমাণ হকারদের পুনর্বাসনের জন্য ভ্রাম্যমাণ গাড়ি দেওয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে ডিএনসিসি।