তরুণদের দেশ বাংলাদেশ

বাংলাদেশ এখন তরুণদের দেশ। দেশের ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স ২৪ বছর বা তার নিচে। আর, কর্মক্ষম মানুষ আছে ১০ কোটি ৫৬ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বড় সুযোগ এনে দিয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। ইউএনডিপি বলছে, জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আরও বেশি ও ভালো কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। আর বিনিয়োগ করতে হবে উৎপাদনশীল খাতে।
‘শেপিং দ্য ফিউচার: হাউ চেঞ্জিং ডেমোগ্রাফিকস ক্যান পাওয়ার হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি কাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার কথা আছে। এতে এই অঞ্চলের ৪৫টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য, পরিবর্তনের ধরন এবং করণীয় সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী) ১০ কোটি ৫৬ লাখ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশই কর্মক্ষম। আগামী ১৫ বছরে, অর্থাৎ ২০৩০ সালে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে, যা মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ। দেশে বয়স্ক বা ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ ৭ শতাংশ। ২০৩০ ও ২০৫০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে যথাক্রমে ১২ ও ২২ শতাংশে।
ইউএনডিপির নিউইয়র্ক কার্যালয়ের একদল বিশেষজ্ঞ এই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। এই দলের নেতা ও প্রতিবেদনের মূল লেখক থাঙ্গাভেল পালানিভেল গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ বেকার। যুব জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মা-বাবার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এরা কাজ চায়। এরা কাজ না পেলে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
থাঙ্গাভেল পালানিভেল বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ অনেক ভালো করেছে। এখন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় বেশি জোর দিতে হবে। মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ দেশে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া উচিত—এমন যুবগোষ্ঠীর মাত্র এক-চতুর্থাংশ সেখানে যায়। এই অঞ্চলের কিছু দেশে এ হার অনেক বেশি।
এদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, গত দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। অথচ প্রয়োজন ছিল বছরেই ১৩ লাখ। বিবিএস আরও বলছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা এখন গত দেড় দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। আর বেকারদের মধ্যে ৭৪ শতাংশই তরুণ-তরুণী।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমশক্তির মান উন্নয়ন করতে না পারলে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট) বোঝা হয়ে দেখা দিতে পারে বেকারত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে। এই সুবিধা তিন দশকের মতো সময় পাওয়া যাবে। এরপর বয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়বে। অর্থনীতির ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, যা চীনের ক্ষেত্রে হয়েছে। বয়স কাঠামোর সুবিধা পেতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে মানসম্পন্ন শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।
এই প্রতিবেদনের একজন লেখক ও ইউএনডিপির অর্থনীতিবিদ তাসনিম মির্জা প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্য কম, অনেক কাজে উচ্চ দক্ষতার দরকার হয় না। শ্রমশক্তির বড় অংশ নিয়োজিত কৃষি ও পোশাকশিল্পে। তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং—এসব ক্ষেত্রে উচ্চ দক্ষতার দরকার হয়। উচ্চ দক্ষতার দরকার হয়—এমন কাজ সৃষ্টি করতে হবে ও সেভাবে দক্ষ জনবল গড়তে বিনিয়োগ করতে হবে।
প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক (গবেষণা) ও যুক্তরাষ্ট্রের আইএফসি ইন্টারন্যাশনালের পরামর্শক আহমেদ-আল-সাবির প্রথম আলোকে বলেন, ইউএনডিপির এই প্রতিবেদনে জনসংখ্যাসংক্রান্ত যেসব তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে সেগুলোর মিল আছে। সামান্য যে তারতম্য আছে, তা তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে হতে পারে।