বলী খেলা :আবহমান বাংলার লোকজ ঐতিহ্য

চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘি মাঠে বলীখেলার ও মেলার আয়োজন করেন সংলগ্ন বদরপাতি নিবাসী আবদুল জব্বার সওদাগর। তিনি ছিলেন হাটহাজারীর বিখ্যাত ফতেপুর গ্রামের অধিবাসী। ফতেপুরের বলীখেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে ও ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে উত্সাহিত হয়ে আবদুল জব্বার সওদাগর এই বলী খেলা প্রচলন করেন ১৯০৯ সালে। বাংলা ১৩১৬ সালে ১২ই বৈশাখ প্রথম এই খেলা দেন।

গ্রামবাংলার জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার মধ্যে বলী খেলা শীর্ষস্থানীয়। বলীখেলা আবহমান বাংলার জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, লোকজধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত, মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার এক মহাকাব্য বিশেষ এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পরিচায়ক। শত শত বছরের পরিক্রমায় বলী খেলার খ্যাতি, গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য দেশের সীমানা ছাড়িয়েছে।

একদা প্রধানত বলী খেলাই ছিল গ্রামীণ জনসাধারণের অবসরযাপন ও চিত্তবিনোদনের অন্যতম খোরাক। গ্রামীণ জনপদে অনেক খেলাই ছিল; কালের বিবর্তনে অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। অনেক নতুন নতুন খেলার উত্পত্তি হয়েছে। কিন্তু লৌকিক খেলাধুলার অংশ হিসেবে বলীখেলা সীমিত পরিসরে হলেও টিকে রয়েছে। আগের দিনে প্রায় প্রতিটি গ্রাম-ইউনিয়ন পর্যায়ে বড় আয়োজনে বলীখেলা হতো, দেশের এক স্থানের বলী অন্য স্থানে গিয়ে খেলতেন ও বিজয়ী হয়ে বীরের বেশে ঘরে ফিরতেন। সঙ্গে আনতেন পুরস্কার হিসেবে অর্থ ও মেডেল। পরিবারের সঙ্গে গ্রামবাসী আনন্দে শরীক হতেন। কেউ কেউ দূর-দূরান্তে সঙ্গী হয়ে চলে যেতেন ও নিজেদের বলীদের উত্সাহ দিতেন। সমাজে বলী খেলা ছিল একাধারে অনাবিল আনন্দের উত্স, অপরদিকে দৈহিক ও মানসিক প্রশান্তি। এছাড়া ব্রিটিশ যুগে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য স্বদেশপ্রেমের পরিচায়ক। স্বদেশি তরুণ ও যুবকগণ নিয়মিত শরীর চর্চা করতেন এবং বলী খেলা আয়োজনসহ নিজেরাও খেলায় অংশ নিতেন। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক যুববিদ্রোহের নেতৃস্থানীয়দের অনেকেই ছিলেন বিখ্যাত কুস্তিগীর। তাঁরা ব্যতীত ভারতের অনেক বিপ্লবী ছিলেন শারীরিক শক্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে চট্টগ্রাম, ঢাকা, কলকাতাসহ বিভিন্ন বিপ্লবী কেন্দ্রসমূহে বহু ব্যায়ামাগার গড়ে উঠেছিল, যাতে বিপ্লবী তরুণ-যুবকেরা নিয়মিত শরীর চর্চা করতে পারেন। বলীখেলা, লাঠিখেলা ও শারীরিক কসরত প্রদর্শনে বিপ্লবীরা ছিলেন কিংবদন্তিতুল্য।

বলীর আভিধানিক অর্থ পরাক্রমশালী বীর পুরুষ। দ্বৈরথ যুদ্ধ-যা দু’জন মল্লবীরের শারীরিক শক্তির পরীক্ষা বিশেষ। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে খেলাটি ‘কুস্তি’ নামে পরিচিত। কুস্তি ফারসি শব্দ। শক্তি, সাহস ও কৌশলই বলীদের বিজয়ী হবার প্রধান মন্ত্র। তবে বিখ্যাত বলীদের সেকালে মাল বা মল্ল নামে অভিহিত করা হতো। সমাজে এরা ছিলেন সম্মানের পাত্র। কোথাও কোথাও পাড়া-মহল্লা বা বাড়ির নাম মাল-মল্ল এবং বলীদের নামে নামকরণ হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বলীখেলা অনুষ্ঠিত হলেও চট্টগ্রাম-নোয়াখালী অঞ্চলে বলীখেলা বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। প্রাচীন কাল থেকে পৃথিবীর নানা দেশের নানা জাতি-সমপ্রদায়ের লোক চট্টগ্রাম বন্দর সুবিধার কারণে চট্টগ্রামে এসেছেন, বসতি গড়েছেন। ফলে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ সুনাম রয়েছে। তবে ধারণা করা হয় বলীখেলা মুসলমান যুগে আরব দেশের লোকদের দ্বারা প্রচলিত হয়েছে। সুলতানী ও মোগল আমলে বলীখেলা ও বলীদের সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হতো। প্রভাব-প্রতিপত্তি, সুনাম বৃদ্ধি ও শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য মুসলিম আমলে শাসনকর্তা, সেনাপতি, দেওয়ান কিংবা ছোট-বড় জমিদারগণ অর্থ-সম্পদ দিয়ে কুস্তিগীর পুষতেন। খাজনা আদায়, প্রজাবিদ্রোহ কিংবা ক্ষমতা ও শক্তি প্রদর্শনের জন্য কুস্তিগীরদের ব্যবহার করতেন। কুস্তিগীররা প্রয়োজনের সময় লাঠিয়াল হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন।

আঠার শতকের মাঝামাঝি সময়ে ত্রিপুরা রাজ্য ও চাকলা রোশনাবাদের শাসক শমসের গাজীর সামরিক শাখার প্রধান ছিলেন তাঁর জ্ঞাতি ভাই জাদু গাজী, যিনি ছিলেন শারীরিক শক্তিতে অদ্বিতীয়। তাঁর সঙ্গে একবার কুস্তি লড়েন পার্শ্ববর্তী নিজামপুর পরগনার ভূস্বামী শাহজাদা খান মুহাম্মদ ভূঞা। শমসের গাজীর জীবনীভিত্তিক পুঁথি শমসের গাজীনামায় লেখা হয়েছে সে মল্লযুদ্ধের কথা। সকাল থেকে শুরু করে দুপুর গড়ালেও কেউ কাউকে হারাতে পারে না। অগত্যা শমসের গাজী দুই মল্লবীরকে থামিয়ে দেন এই ভেবে যে, দম ফাটি দুই বীর যদি মরি যায় /লোকমুখে অপযশ ঘুচিব সদায়

এখানে স্মরণ করা যায় যে, শমসের গাজীর উত্থানে ও ত্রিপুরা রাজ্যসহ অন্যান্য বিজয়ে প্রধান ভূমিকা রাখেন তার এই জ্ঞাতি ভাই।

চট্টগ্রাম শহরে আয়োজিত আবদুল জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলাটির প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি। চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘি মাঠে এই বলীখেলার ও মেলার আয়োজন করেন সংলগ্ন বদরপাতি নিবাসী আবদুল জব্বার সওদাগর। তিনি ছিলেন হাটহাজারীর বিখ্যাত ফতেপুর গ্রামের অধিবাসী। ফতেপুরের বলী খেলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে ও ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে উত্সাহিত হয়ে আবদুল জব্বার সওদাগর এই বলী খেলা প্রচলন করেন ১৯০৯ সালে। সেই থেকে তাঁর বংশপরম্পরায় এই খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক বছর যাবত্ এই বলী খেলা টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি সমপ্রচারিত হয়ে থাকে। আবদুল জব্বারের বলী খেলা একদিন হলেও সংশ্লিষ্ট বৈশাখী মেলাটি ৭-৮ কিলোমিটার স্থান জুড়ে ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। একশ বছর আগে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর প্রদত্ত বিবরণ মতে, “১৯১৫ সালে অনুষ্ঠিত বলী খেলা প্রায় ৫ হাজার দর্শক উপভোগ করেন। ৮-১০ জোড়া বলী একসঙ্গে কুস্তি লড়তেন এবং দেড়-দু’শ জন বলীখেলায় অংশ নিতেন।” বার্মা থেকে ও ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানের বলীরা অংশগ্রহণ করতেন। দেশভাগের আগে একবার ইংরেজ গভর্নর সস্ত্রীক জব্বারের বলী খেলা উপভোগ করেন। ১৯৬২ সালে দু’জন ফরাসি মল্লবীর দেশীয় বলীদের সঙ্গে খেলেন ও ২০০৭ সালে ৯৯তম আসরে আরো একজন ইউরোপীয়ান দেশীয় বলীর সঙ্গে কুস্তি লড়েন।

বলীখেলা ও মেলা শত শত বছরের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। ধর্ম-সমপ্রদায় নির্বিশেষে, দেশের ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও ক্রীড়ামোদী মানুষ মেলায় অতীতের মত বর্তমানে আসেন, ভবিষ্যতেও আসবেন। লাখো গ্রামীণ মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করেন, ব্যবসায়ীরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন মেলার। এ ঐতিহ্য শত শত বছরের।

n লেখক :গবেষক, প্রাবন্ধিক