মাথাপিছু আয় ও প্রবৃদ্ধি মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরের সফলতা

৬ এপ্রিল ২০১৬ তারিখ জাতীয় সব দৈনিকের প্রধান শিরোনাম-জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭.০৫ এ উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা এবং মাথপিছু আয় বৃদ্ধি। সংবাদটি নিঃসন্দেহে আশা জাগানিয়া এবং বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে একটি সুসংবাদ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ৫ এপ্রিল ২০১৬ তারিখ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পনামন্ত্রী সাংবাদিকদের সামনে এসব তথ্য তুলে ধরেন।

প্রতিবছর মার্চ বা এপ্রিল মাসে নতুন অর্থবছরের ৯ মাসের প্রকৃত তথ্য এবং বিগত বছরের তিন মাসের তথ্যের ভিত্তিতে জিডিপির এ প্রাক্কলন করা হয়। সেই অনুযায়ী বিগত বছরে জিডিপির প্রাক্কলন ৬ দশমিক ৬১ শতাংশ করা হলেও চূড়ান্ত হিসাবে অর্জন হয়েছে ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। বিশ্বের সব দেশ এভাবেই প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে থাকে। যদিও চূড়ান্ত হিসাব পেতে কমপক্ষে ৮ মাস সময় লাগে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিই বাংলাদেশ এবার ৭.০৫ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রায় পেঁৗছতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এর আগে দেশের ইতিহাসে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৭ দশমিক ০৬ শতাংশ, এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিল ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আশার কথা এই যে, এবারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকায় রয়েছে তৈরি পোশাক খাত।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত নয় মাসে মোট রপ্তানি আয় এসেছে দুই হাজার ৪৯৫ কোটি ৫১ লাখ ডলার। এর মধ্যে দুই হাজার ৪৪ কোটি ডলারই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতের ওভেন থেকে আয় এসেছে এক হাজার ৭৭ কোটি ডলার। এ আয় এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেশি। তৈরি পোশাকের অপর খাত নিটের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৯৬৭ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। গত বছর একই সময়ের তুলনায় আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

বিশ্ব যখন আগামীতে অর্থনেতিক মন্দার আগাম সতর্কবর্তা দিচ্ছে তখন বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা দেশের জন্য বড় আশা ও শক্তি হয়ে উঠছে। এর মূলে মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিশাল ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো দেশের পক্ষেই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভভব নয়। বাংলাদেশের এই অসামান্য অর্জনের পেছনে এদেশের আপামর জনতার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগের অবদান রয়েছে। অগ্রযাত্রার গতিপথ আরো মসৃণ হোক। এটি অস্বীকার করার জো নেই। আগামীতে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে উদাহরণ ও অনুসরণযোগ্য একটি দেশের মর্যাদায় উন্নীত হবে-এমন প্রত্যাশাই আমাদের।

এ অর্জন ধরে রাখা :

আট বছর আগে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল ৭ শতাংশ। তখন এডিবি ও বিশ্বব্যাংকও এই অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রাক্কলন বলছে, অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এই অর্জন ধরে রাখতে এখন সচেষ্ট হতে হবে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে উন্নয়ন কর্মকা-। রপ্তানি বাণিজ্য থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা যায়নি। দেশের অভ্যন্তরে গত এক বছরের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে বিভিন্ন খাত। কৃষি ও সেবা খাতের পাশাপাশি শিল্প খাতও প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। যদিও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আগের তুলনায় চলতি অর্থবছরে কমেছে। আমাদের দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের জনপ্রশাসনকে সত্যিকার অর্থে কল্যাণমুখী প্রশাসন হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে এ সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে সেবা খাতের সহায়তা পেতে এখনো মানুষকে অনেক সমস্যা পোহাতে হয়। দীর্ঘসূত্রতার সমস্যাও উন্নয়নের বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। এই বাধা দূর করতে না পারলে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা যাবে না। দেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আগ্রহ হারাবে। তার অনিবার্য ফল পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।

আমরা দেখতে পাই, চলতি অর্থবছরের এডিপি থেকে সাত হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৯১ হাজার কোটি টাকায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাজেটে যে এডিপি দেয়া হয়, তা প্রতিবছরই একপর্যায়ে এসে কাটছাঁট করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হওয়ার একটি প্রধান কারণ হচ্ছে, সংশ্লিষ্টদের অদূরদর্শিতা ও অদক্ষতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ ও জনগণের প্রতি কতটুকু দায়বদ্ধ, সে প্রশ্নটাই এখানে এসে পড়ে। দেশের অর্থনীতিতে যে গতির সঞ্চার হয়েছে, তা ধরে রাখতে এখন আমাদের ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে নজর দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স কমলেও রপ্তানি বাণিজ্যে গত বছরের এই সময়ের তুলনায় আয় বেড়েছে ৯ শতাংশ।

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, রপ্তানি আয় ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। এই পরিস্থিতি ধরে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হলে আমাদের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। ব্যবসাবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। যে বাধাগুলো এখনো দৃশ্যমান, তা দূর করতে পারলেই উন্নত দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ :

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ভালো খবর। সামর্থ্য ও শক্তিকে সম্ভাবনাময় আখ্যা দিয়ে অনেকেই আমাদের দেশকে উদীয়মান বাঘ বলে গণ্য করেন। এটা যে বাহুল্য নয় তা আমরাও জানি। বেশ কিছুদিন আগে বিশ্বমন্দা যখন উন্নত অনেক দেশকে ভাবিয়ে তুলেছিল তখনো আমরা এগিয়ে গেছি সাবলীলভাবে। আবার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বৃহত্তম অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগও আমাদের শক্তিমত্তার পরিচায়ক। এবার জানা গেল, আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.০৫ শতাংশ অতিক্রম করবে, একই সঙ্গে বাড়বে মাথাপিছু আয়।

অর্থবছরের শুরুতে বাজেট ঘোষণার সময় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে এমন আশার কথা বলেছিলেন সরকার। তবে নয় মাসে অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি দেখে এডিবি এবং বিশ্বব্যাংকও বলেছে, এবার বাংলাদেশ ৬.৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। এ বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক এবং ইউএনডিপির পর ইউরোপও বলছে বিনিয়োগের পরবর্তী ঠিকানা বাংলাদেশ; যা আমাদের আশান্বিত করে।

তথ্যমতে, খাতওয়ারি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন হয়েছে কৃষি খাতে ২.৬০, শিল্প খাতে ১০.১০ এবং সেবায় ৬.৭০ শতাংশ। এ ছাড়া মৎস্য খাতে ৬.১৯; খনিজ সম্পদে ১২.০৬, শিল্পোৎপাদনে ১০.৩০; বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ খাতে ১১.১৫; নির্মাণশিল্পে ৮.৮৭ হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে ৭ এবং পরিবহন খাতে ৬.৫১ শতাংশ। বিবিএর এ প্রাক্কলনকে জাতীয় অগ্রগতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের (২০১৫-১৬) বাজেটে ১ লাখ ৯৯৭ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন করা হলেও ৭ শতাংশ কাটছাঁট করে ৯৩ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে যার মধ্যে মূল এডিপির আকার ৯১ হাজার কোটি টাকা। আর স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এটা লক্ষণীয় যে, সরকার প্রতি অর্থবছরেই শতভাগ এডিপি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে এলেও ধীরগতির কারণে অর্থবছরে শেষ ভাগে এসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কাঁচি চালাতে হয়। অন্যদিকে তড়িঘড়ি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কাজ হয়ে পড়ে মানহীন। এভাবে গত অর্থবছরে এডিপির মাত্র ৪১ শতাংশ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। ফলে অতীতের নিরিখে চলতি বছরেও বাকি কাজের বাস্তবায়ন নিয়ে আশঙ্কার যৌক্তিকতা থাকে বৈকি। আমরা মনে করি, প্রতি বছরের এ ধারাবাহিকতার অবসানই কাম্য।

যেহেতু, আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের পথে হাঁটছি, সেহেতু, আমাদের পরিকল্পনা এমন হওয়া সংগত যাতে আমাদের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। মেয়াদকালীন সময়ের মধ্যে প্রকল্পগুলো যাতে মানসম্পন্ন করে বাস্তবায়ন ঘটানো যায় তার জন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা দরকার। মাথাপিছু আয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে দেখা দেয়, এটা অতীত অভিজ্ঞতা। সুতরাং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে যথাযথ পদক্ষেপ। কেননা, দেশের প্রতিটি মানুষই জাতীয় অগ্রগতির প্রত্যাশা করে।

স্মর্তব্য যে, যখন দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা ধরনের সমস্যা অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দেখা দেয় তখন প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী, সৃষ্টিশীল এবং উদ্যোগী। আমাদের রয়েছে নিজস্ব সম্পদ। এ সম্পদও কাজে লাগাতে হবে। যাদের নেতৃত্বে রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে তাদের সততা, সদিচ্ছা এবং ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊধর্ে্ব উঠে সবার কর্তব্য হওয়া দরকার দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া। আমরা মনে করি, কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ধরা দেয়া হয়তো সময়সাপেক্ষ, কিন্তু অসম্ভব নয়।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে প্রয়োজন বিনিয়োগ বৃদ্ধি :

মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি প্রথমবারের মতো ৭ শতাংশ ছাড়ালেও চলতি অর্থবছরে বেসরকারি বা ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে জিডিপির ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ অনুপাত ২০১৪-১৪ অর্থবছরের ছিল ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ। তবে সরকারি বিনিয়োগ গত অর্থবছরের চেয়ে বেড়েছে। আর সার্বিকভাবে বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাতও বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রধানত সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোয় ভোগ ব্যয় বেড়েছে, যা বাড়তি জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূল কারণ। এ ছাড়া সরকারি বিনিয়োগবৃদ্ধি, পোশাক রপ্তানি ও বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদনশীলতা জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলে তা টেকসই হয়। কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার বেসরকারি বিনিয়োগ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে ধীরগতি কাটাতে অবকাঠামো উন্ননের পাশাপাশি সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা এলেও কোথায় যেন একটু অস্বস্তি আছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হলেও গ্যাস সংযোগের অভাবে নতুন বিনিয়োগ থমকে আছে। সামগ্রিকভাবে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাব রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে না পারলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে না। ফলে আগামীতে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জ হবে।

বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারি খাতে বিনিয়োগ ও জনগণের ভোগ বৃদ্ধির কারণে জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান বেড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে ওঠার প্রধান কারণ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি।

তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর জিডপিতে যে দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বেশি হচ্ছে, তার মধ্যে দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে সেবা খাত থেকে। যার দশমিক ৩০ শতাংশই সরকারি ব্যয় বাড়ার কারণে হয়েছে। বিশেষত বেতন বাড়ার কারণে। প্রসঙ্গত, বিবিএসের প্রাক্কলন অনুযায়ী সরকারের ভোগ ব্যয় গত অর্থবছরে ছিল জিডিপির ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

বেসরকারি বিনিয়োগ কমার কারণ হিসেবে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ২০১২ সালের পর থেকে বেসরকারি বিনিয়োগে একটি স্থবিরতা রয়েছে। এ সময়ে সামাজিক উন্নয়ন বা ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থানের বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাব ও অবকাঠামো দুর্বলতা রয়ে গেছে। যে কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি। যে কারণে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যাবে কি-না।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরও মনে করেন, সরকারি খাতে বেতন বাড়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তবে এর পাশাপাশি তৈরি পোশাক পণ্যের রপ্তানি ও বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিও জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই ধারাবিহকতা থাকবে কি-না এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ বছর বেতন বেড়েছে। আগামী বছর তা আর বাড়বে না। তাহলে প্রবৃদ্ধির এই ধারাবাহিততা থাকবে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কৃষি পণ্যের মূল্য পতনের কারণে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়েনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

উল্লেখ্য, বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ গত অর্থবছরের চেয়ে এবারও বেশি। বরাবরই আগের অর্থবছরের তুলনায় সরকারি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ে। তবে প্রকৃত বিনিয়োগ বেড়েছে কি-না তা নির্ধারিত হয় জিডিপির অংশ হিসেবে তা কতটুকু বেড়েছে সেটির ওপর। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রাক্কলন হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রবৃদ্ধি অর্জন :

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার পথে হাঁটছে। সরকারের পক্ষ থেকে আশাবাদ রয়েছে ২০২১ সালের মধ্যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের। এ খবর আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া। বলার অপেক্ষা রাখে না, মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে গেলে কিছু সীমাবদ্ধতা সন্তোষজনকভাবে অতিক্রম করেই সামনে এগোতে হবে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। ইতিপূর্বে এমন পূর্বাভাসই দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকসহ অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। এবার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। পাশাপাশি আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলেও মত দিয়েছে সংস্থাটি। আমরা মনে করি, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রবৃদ্ধি অর্জন আশানুরূপ হওয়া চাই।

একটি অর্থবছরে দেশে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় তার আর্থিক মূল্য হচ্ছে জিডিপি। বিগত অর্থবছরের চেয়ে এর পরিমাণ যত শতাংশ বাড়ে সেটিই প্রবৃদ্ধি। সত্য যে, কোনো দেশের অর্থনীতি কতটুকু এগোচ্ছে তার পরিমাপক হচ্ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছর শেষে হতে এখনো তিন মাস বাকি। ফলে এখনই চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া না গেলেও প্রচারিত তথ্যে এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, এই সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত অর্জন হয়তো সম্ভব হতে পারে। বিগত কয়েকটি অর্থবছরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের সব আর্থিক খাতে। তার রেশ কাটিয়ে এখনো বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি দেশে। সুতরাং এটা নিশ্চিত করেই বলা চলে, রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে প্রধান অন্তরায়। এসব প্রতিবন্ধকতা নিরসন না হলে দেশের অর্থনীতির নানা সূচক যে ধীরে ধীরে নিম্নমুখী হয়ে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। দেশে এখন রাজনৈতিক অস্থিরতার মাত্রা কম, সুতরাং এ অবস্থায় বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা গেলে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি আসতে পারে বলে মনে করা যায়।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রণীত ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক-২০১৬’ প্রতিবেদনে আশা করা হয়েছে,

(ক) বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আদায, রপ্তানি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে ডিজিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে।

(খ) এ ছাড়া পোশাক খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হাত ধরেও সার্বিক রপ্তানি বাড়বে বলেও আশা করা হয়েছে।

(গ) পাশাপাশি সরকারি পে-স্কেলের বাস্তবায়ন এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি ভোগ বাড়বে এসব বিবেচনায় রেখে সংস্থাটির পূর্বাভাস হচ্ছে,

(ঘ) চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ২ শতাংশে, যা ২০১৫ অর্থবছরের চেয়ে দশমিক ২ শতাংশ কম।

এরপরও সংস্থাটি প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছে। আর চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে ভ্যাট আইনের প্রয়োগ, ভূমি রেকর্ড ও ব্যবস্থাপনা ডিজিটালকরণ, জ্বালানির সঠিক ব্যবহার, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানো এবং একই সঙ্গে করনীতির আধুনিকায়ন। পাশাপাশি অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের উৎপাদন আরো বাড়ানো যাবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

আমরা মনে করি, মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে আরো সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, নানামুখী বাস্তবায়ন মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময়ও এগিয়ে আসছে, প্রতি বছরের মতো এবারো বাজেট ঘোষণার পর পণ্যের মূল্য আগের চেয়ে বাড়বে না এমন প্রতিশ্রুতি কি সরকার দিতে পারছে? আমরা মনে করি এজন্য আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দেয়া সমীচীন।

প্রতিবেদনে শিল্প-প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, পর্যটন, টেলিযোগাযোগ, মানবসম্পদ, তৈরি পোশাক, ম্যানুফ্যাকচারিং, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং নির্মাণশিল্প ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এজন্য খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখা দরকার, দুর্বল অর্থনীতির দেশে বাস্তবতা ও নৈতিকতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। উৎপাদনে ধীরগতি উন্নয়নের চাকা শ্লথ করে দিতে পারে। ফলে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্টরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এ প্রত্যাশা আমাদের।

[লেখক : প্রাবন্ধিক, অর্থনীতির বিশ্লেষক]

anumahmud@yahoo.com