পোশাক খাত বদলে দিয়েছে রানা প্লাজা

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত হলো পোশাকশিল্প। এই খাত থেকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো দেশে নারীর ক্ষমতায়নেও শীর্ষ ভূমিকা রাখছে পোশাক খাত। প্রায় ৪০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক কাজ করছেন ছোট-বড় প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি পোশাক কারখানায়। কিন্তু এই খাতের ওপর কালো মেঘ নেমে এসেছিল ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। ওই দিন ঢাকার অদূরে সাভারে ধসে পড়ে রানা প্লাজা। এই দুর্ঘটনায় এক হাজার এক শরও বেশি শ্রমিক নিহত হন, আর আহত হন দুই হাজারেরও বেশি। আজ সেই ভয়াবহ রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির দিন। এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠর নিজস্ব প্রতিবেদক এম সায়েম টিপুর কথা হয় তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি রাইজিং ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খানের সঙ্গে

রানা প্লাজা ধসের পর দেশের পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে বিজিএমইএ সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘দেশের পোশাক খাত বদলে দিয়েছে রানা প্লাজা। কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে যে পোশাক খাত এখন বিশ্বমানের। পরিবেশ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী বেশ কয়েকটি কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের সনদ পেয়েছে। তা ছাড়া ক্রেতা জোটের সংগঠন অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের চাপে কারখানায় ব্যাপক সংস্কার হয়েছে।’

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসা থাকবে কি থাকবে না—এমন একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এমনকি এক মাসের মাথায় বিশ্বখ্যাত ডিজনি ব্যান্ড (শিশুদের পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের ক্রেতা) বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর একে একে সারা বিশ্বে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ ইউরোপ এবং আমেরিকা যেন তাদের ছায়া সরিয়ে নিতে থাকে। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক খাতে তাদের বাজারে অগ্রাধিকার সুবিধা (জিএসপি) না দিলেও তা প্রত্যাহার করে নেয়।

মাহমুদ হাসান খান আরো বলেন, ‘আশার কথা তাদের সংস্কার চাপে আমরা অনেকটা হতাশ হলেও প্রাথমিক পরিদর্শনের পর আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছি। যদিও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে সংস্কার বাস্তবায়নে অর্থের অভাবে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। ক্রেতারা কারখানা সংস্কারের অর্থায়ন করার করা থাকলেও এটা এখনো কিতাবে আছে। দাতা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বল্প সুদে কিছু ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনেক বেশি সুদ হওয়ায় তা এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।’

সংস্কার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি কতটুকু জানতে চাইলে মাহমুদ হাসান খান বলেন, তৈরি পোশাক খাতের কারখানার মান উন্নয়নে গঠিত অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর নেতৃত্বে জাতীয় কর্মসূচির (এনএপি) আওতায় যেসব সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে, এসব পরিকল্পনা ২০১৭ সালে শেষ করতে পারবেন বলে তাঁর বিশ্বাস। পোশাক কারখানাগুলো শুরুতেই অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স এবং আইএলওর আওতায় ভবনে অবকাঠামো, বৈদ্যুতিক এবং অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ সময় তিন হাজার ৫০৭টি কারখানার মধ্যে ৩৬টি কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ বলে বন্ধ করে দেয়। তবে এর মধ্যে চারটি কারখানা পুনর্বিবেচনায় আবার কাজ শুরু করে।

অগ্নি নিরাপত্তায় কারখানাগুলোর উদ্যোগ তুলে ধরে মাহমুদ হাসান খান বলেন, অগ্নি নিরাপত্তায় ক্রেতা জোটের সুপারিশ অনুসারে যে হাইড্রেন্ট পাম্প ব্যবহার করা হতো, তা নিয়ে আগে কোনো সচেতনতা ছিল না। বর্তমানে ওই হাইড্রেন্ট পাম্পের জন্য যে পানির প্রবাহের প্রয়োজন তা নির্দিষ্ট পরিমাপের প্রেশারসহ দুটি পাম্প ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক বলে তিনি জানান।

এ পর্যন্ত কতগুলো কারখানার সম্পূর্ণ সংস্কার হয়েছে জানতে চাইলে মাহমুদ হাসান খান বলেন, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স মিলে ৩১টি কারখানার সংস্কারকাজ চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে অ্যাকর্ডের পাঁচটি কারখানা এবং অ্যালায়েন্সের ২৬টি কারখানা। এই দুই সংগঠনের মোট কারখানার সংখ্যা এক হাজার ৯ শরও বেশি। অ্যালায়েন্সের ৭০০ এবং অ্যাকর্ডের এক হাজার ২০০। এ ছাড়া প্রায় অর্ধেক কারখানা তাদের সংস্কারকাজের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি জানান। তবে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় কারখানা সংস্কারের অগ্রগতি খুব সন্তোষজনক নয়। তিনি আরো বলেন, নন-কমপ্লায়েন্স কারখানার সংখ্যা কমছে। ইতিমধ্যে গত তিন বছরে প্রায় ৭০০ কারখানা বিজিএমইএর সদস্য তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ২০১৮ সালের পর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স না থাকলে এই সংস্কারের অগ্রগতি কী হবে জানতে চাইলে মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক খাতের কারখানা সংস্কারে তাদের অনেক অবদান আছে। তবে ওই সব প্রতিষ্ঠান চলে গেলেও আমাদের একটি তদারকি ব্যবস্থায় থাকতে হবে। তখন সংস্কারকাজের কে দায়িত্ব নেবে, এই নিয়েও আমাদের পরিকল্পনা আছে। কারণ এত বড় একটি খাতকে বিনা নিয়ন্ত্রণে তো আর ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাই নতুন প্ল্যাটফরম হবে। এ সংশ্লিষ্ট সবাই থাকবে। এ বিষয়ে শিগগিরই একটি সিদ্ধান্তে যাবে বিজিএমইএ।’

মাহমুদ হাসান খান বলেন, গত পাঁচ বছরে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে ২১৯ শতাংশ এবং প্রতিবছর শ্রমিকদের বেতন বাড়ছে কমপক্ষে ৫ শতাংশ হারে। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় যে কাজটি হয়েছে, সেটি হচ্ছে একটি শ্রম অধিদপ্তর করা হয়েছে। রানা প্লাজা ধসের আগে এর জনবল ছিল মাত্র ৩১৪ জন। কারখানা পরিদর্শক ছিল ৪২ জন এবং দোকান পরিদর্শক ছিল ৫২ জন। এখন সরকার এখানে জনবল দিয়েছে ৯৯৩ জন। এর মধ্যে ৫৭৫ জনই কারখানা পরিদর্শক। এর পরও বেশ কিছু কাজ এখনো বাকি বলে মনে করেন বিজিএমইএ সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে কারখানা সংস্কারে বেশ অর্থের প্রয়োজন। এ জন্য প্রতিটি কারখানার গড়ে চার কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। তবে এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোকে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাংলাদেশে এখন শুধু কমপ্লায়েন্স নয়, টেকসই পোশাক খাতের কথা ভেবে এখন বিশ্বমানের পরিবেশবান্ধব লিড সনদপ্রাপ্ত কারখানাও হচ্ছে। ইউনাইটেড স্টেট গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল এই সনদ দেয়। এর মধ্যে ২৬টি কারখানা লিড সনদ পেয়েছে। ইউএসজিবিসি সনদ পাওয়ার জন্য আরো শতাধিক কারখানা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।