ঘুরে দাঁড়াচ্ছে গার্মেন্ট শিল্প

২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প যে বড় ধরনের একটি সঙ্কটের আভাস দেখা গিয়েছিল, তিন বছর পর এখন সেই শিল্প অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন গার্মেন্ট শিল্প মালিকরা।

গতবছর গার্মেন্ট পণ্য রফতানিতে প্রবৃদ্ধিও হয়েছে সাড়ে নয় শতাংশের বেশি। শিল্প মালিকরা নিরাপত্তার মানোন্নয়নকে এই প্রবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে দেখলেও, সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের স্বল্পমূল্যে পোশাক তৈরির সক্ষমতাকে।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা ছিল, গার্মেন্টসের সেলাই মেশিনের চাকা আগের মতো সচল থাকবে কিনা। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বড় একটি ধাক্কার মুখে পড়লেও, তিন বছর পর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রফতানি ২০১২-১৩ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে বেড়েছে প্রায় ৪০০ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯.৮ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র প্রেসিডেন্ট সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বিল্ডিং সেফটি, ফায়ার সেফটি এবং ইলেকট্রিকাল সেফটির বিষয়ে খুব গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের উদ্যোক্তারা কাজ করেছে। আমরা মনে করি এ্যাকর্ড, এ্যালায়েন্স এবং ন্যাশনাল এ্যাকশন প্ল্যানের সঙ্গে মিলে একসঙ্গে কাজ করে একটি জায়গায় আমরা পৌঁছাতে পেরেছি।’ প্রায় চার বছর আগে এক সকালে বিকট শব্দে ধসে পড়ে সাত তলা বিশিষ্ট রানা প্লাজা। ধংসস্তূপ থেকে একের পর এক বের করে আনা হচ্ছিল শ্রমিকদের মৃতদেহ। মরদেহ গণনা যেন শেষই হচ্ছিল না। দুই সপ্তাহের উদ্ধার অভিযানে শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৩৪ জনে। এই ঘটনা শিল্প মালিকদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল যে শ্রমিক নিরাপত্তাকে তারা কতটা অগ্রাহ্য করেন।

রানা প্লাজা ধসের পর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়, তারই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর নিরাপত্তা তদারকির জন্য তৈরি হয় ইউরোপীয় ক্রেতাদের সংগঠন এ্যাকর্ড এবং মার্কিন ক্রেতাদের সংগঠন এ্যালায়েন্স। যারা ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে কাজ করার কথা রয়েছে।

রফতানি প্রবৃদ্ধির বিষয়ে এ্যালায়েন্স এবং এ্যাকর্ডকে সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়টিকে বিজিএমইএ বড় করে দেখলেও, ক্রেতাদের দিক থেকে বিষয়টা ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস এ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট কাজি ইফতেখার হোসেন।

তিনি বলেন, ‘কাস্টমারদের কাছে প্রথম চয়েস বাংলাদেশ এই কারণে যে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখান থেকে সে সস্তায় মাল কিনতে পারছে। যেটা সে চীন বা অন্য কোথাও পারছে না। কিন্তু আপনি যদি ব্র্যান্ড কাস্টমারের দিকে তাকান, তারা কিন্তু সেভাবে ফিরে আসছে না’।

মি. হোসেনের মতে, ‘ভাবমূর্তির সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে না পারায় বড় ক্রেতা এবং উচ্চমানের পণ্যের ক্রেতাদের অনেকেই এখনও বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন।’ এই পরিস্থিতিতে ২০২১ সালের মধ্যেই বর্তমান রফতানি প্রায় দ্বিগুণ করে ৫ হাজার কোটি ডলার তৈরি পোশাক রফতানির যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নিয়েছে সেটা অর্জনের সম্ভাব্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষক ড. গোলাম মোয়াজ্জেমের বলেন, রফতানিতে উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। যে সংস্কার কাজগুলো এখন হচ্ছে সেগুলো বাইরের থেকে সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে হচ্ছে। তারা এই কাজগুলো শেষ করে ২০১৮ সালে চলে যাবেন। সুতরাং পরবর্তীতে এগুলো পর্যবেক্ষণে রাখার দায়িত্বটি কিন্তু সরকারের ওপরেই পড়বে।’

ড. মোয়াজ্জেমের মতে, তৈরি পোশাক কারখানার চাকা সচল রাখতে হলে উন্নত পরিবেশ তৈরিতে আরও যে বিনিয়োগ করতে হবে, তার ফলে পোশাক প্রস্তুতের খরচও ভবিষ্যতে বাড়বে। এদিকে চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও রফতানিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী বিজিএমইএ। তবে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করেন, ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে এখনও বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিতে হবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে। যদিও ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে উদ্যোক্তারা তৈরি পোশাকশিল্পকে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করার চেষ্টা করছেন। এতে বিদেশী ক্রেতাদের আস্থা ফিরছে, তাই এ খাতের প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, ‘ইলেকট্রিফিকেশন করার আগে আমরা এখন চিন্তা করি বাসবাসের ক্যাপাসিটি কেমন হবে, ওয়্যারের মাপ কেমন হবে। আগে কিন্তু আমরা জানতাম না। আমরা ধারণার বশবর্তী হয়ে কাজগুলো করতাম। এখন আমরা অনেক কিছু শিখেছি যে কারণে আগামী দিনে আমরা বেনিফিটেড হব।’

গত তিন বছরে এ্যাকর্ড, এ্যালায়েন্সসহ ন্যাশনাল ট্রাই-পার্টিট প্ল্যান অব এ্যাকশনের আওতায় দেশের তিন হাজার ৬০০ কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে। পরিদর্শনে প্রায় সব কারখানায়ই কোন না কোন ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে অগ্নি ও বিদ্যুত-সংক্রান্ত ত্রুটিই বেশি। এছাড়া কাঠামোগত বড় ত্রুটির কারণে বন্ধই করে দেয়া হয়েছে ৩৯টি পোশাক কারখানা। বাকিদের ত্রুটি শনাক্ত করে দেয়া হয়েছে সংস্কারের পরিকল্পনা। তবে আশার বিষয় হচ্ছে, তৈরি পোশাকের রফতানি বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে।

এ বিষয়ে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘২০১৬-এর শেষের মধ্যে আমরা আশা করি, এ্যাকর্ড ও এ্যালায়েন্সের যে কারখানাগুলো আছে, সেগুলো সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যাবে। তবে ন্যাশনাল এ্যাকশন প্ল্যানের আন্ডারে যে কারখানাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে, সে কারখানাগুলোর জন্য দেরি হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রোথ যেটা নেগেটিভ ছিল রানা প্লাজার পরে, সেটা কিন্তু আস্তে আস্তে পজিটিভ হচ্ছে। কিছুটা হলেও ইমেজ ক্রাইসিসের উত্তরণ হয়েছে এবং বায়ারদের আস্থা অনেকটাই ফিরে এসেছে।’ এ কে আজাদ বলেন, ‘যখন সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছে এ্যালায়েন্স ও এ্যাকর্ড, তখন কিন্তু কাস্টমাররা কনিফিডেন্টস পাচ্ছে। আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে এবং ব্যয়বাহুল্য, কিন্তু তার পরও তাদের সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে কাস্টমারের কনফিডেন্সটা ফিরে পাচ্ছি।’

সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাটাকে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বিদেশ থেকে চাপিয়ে দেয়া শ্রমমানের শর্ত, কারখানার পরিবেশের শর্ত এগুলো এখন দেখাতে হচ্ছে যে পরিপালন করা হচ্ছে।

আগে থেকে সতর্ক থাকলে এতটা খেসারত দিতে হতো না। আমরা তো শুরু করেছিলাম সংখ্যার দিক থেকে অনেক বেশি কারখানা। সে সংখ্যা হয়ত বাড়বে না, কমেও যেতে পারে। কিন্তু সেগুলোর আকার বাড়বে, সেগুলোর মান গুণগতভাবে বাড়বে।’ দেশে এখনও অনেক কারখানাই বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ’র সদস্য না হওয়ায় এগুলো পরিদর্শনের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। তাই সেগুলোর ব্যাপারেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।