পাঁচ বছরে ভুট্টার আবাদ বেড়েছে ৫৫ শতাংশ

খাদ্য হিসেবে ভুট্টার ব্যবহার বেড়েছে। অবশ্য মাছ ও পোল্ট্রি খাদ্য হিসেবেই বেশি ব্যবহার হচ্ছে। বাজারে চাহিদা বাড়ায় সমান তালে বৃদ্ধি পেয়েছে ভুট্টা চাষ। গত পাঁচ বছরে ভুট্টা আবাদের জমি বেড়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ। উত্পাদন বাড়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ভুট্টা চাষ। এমনটাই মনে করছেন ভুট্টা বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সরেজমিন বিভাগের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে শীত ও গ্রীষ্ম মিলে মোট উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে ২৫ লাখ ৭২ হাজার টন। এর মধ্যে শীতকালে ৩ লাখ হেক্টর ও গ্রীষ্মকালে ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা আবাদ হচ্ছে। গত বছর ৩ লাখ ৫৫ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা উত্পাদিত হয়েছিল ২৩ লাখ ৬১ হাজার টন। ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ ২৭ হাজার হেক্টরে ভুট্টা চাষ হয়েছিল। উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৫২ হাজার টন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ছিল ৬ দশমিক ৮৪ টন। ২০১১-১২ অর্থবছরে ২ লাখ ৮৩ হাজার হেক্টরে ভুট্টা চাষ হয়েছিল। উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ৫৪ হাজার টন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ছিল ৬ দশমিক ৯০ টন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ১২ হাজার হেক্টরে ভুট্টা চায় হয়। উত্পাদনের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৭৮ হাজার টন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ছিল ৬ দশমিক ৯৮ টন।
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার বাঁচামরা ইউনিয়নের আমতলী গ্রামের ভুট্টাচাষি ইসমাইল হোসেন বলেন, ভুট্টা চাষে খরচ কম হয়। ভুট্টার পাতা গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। আবার গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। ভুট্টার ফলন ভালো। দামও বেশি। দৌলতপুরের বিভিন্ন গ্রামে প্রতি মণ ভুট্টা ৬০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
ভুট্টা গবেষকরা জানিয়েছেন, আগে দেশে স্বল্প পরিসরে ভুট্টা চাষ হতো। দেশে পোল্ট্রি শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভুট্টার চাহিদা বেড়ে চলেছে। বর্তমানে দেশে ভুট্টার চাহিদা আনুমানিক ৫০ লাখ টন। বিদেশ থেকে ভুট্টা আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়ে থাকে। এ ছাড়া কিছু পরিমাণ গমের সঙ্গে মিশিয়ে আটা তৈরি হয়ে থাকে। তবে ভুট্টা খাদ্যশস্য হিসেবে ব্যবহারের অভ্যাস দেশে গড়ে ওঠেনি। তবে যমুনার চর অঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদে ভুট্টার আটা খাওয়ার চল রয়েছে।
ভুট্টার চাষ বেড়েছে অধিকাংশ জেলায়। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাসহ চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জেলাতে এবারও বিপুল পরিমাণ ভুট্টা চাষ হয়েছে। ভুট্টার উত্পাদন বেড়েছে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়ও।
ডিএইর দিনাজপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক জুলফিকার হায়দার বলেন, গত এক বছরে দিনাজপুর অঞ্চলে তিন জেলায় ৫ হাজার হেক্টর আবাদ বেড়েছে। চলতি বছর ৯৫ হাজার হেক্টর জমি আবাদ হয়েছে। জেলাগুলোতে ভুট্টার ফলনও অধিক।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ভুট্টা নিয়ে গবেষণারত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গে ভুট্টা অধিক সম্প্রসারিত হয়েছে। এ ছাড়াও কুমিল্লা, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী এলাকায় এর আবাদ বেড়েছে। ভুট্টা খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। দেশে মানুষের খাদ্য হিসেবে ভুট্টার ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হলে আবাদ আরও বাড়বে।
বারি উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞনিক কর্মকর্তা ড. আমিরুজ্জামান বলেন, ভুট্টা আবাদ বাড়ানোর জন্য ঝড়, খরা ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের পথে রয়েছে বারি। ইতোমধ্যে ঝড় সহিষ্ণু জাত বারি ভুট্টা-১২ ও বারি ভুট্টা-১৩ উদ্ভাবিত হয়েছে। এ ছাড়াও মানুষের খাদ্য হিসেবে ভুট্টার ব্যবহার বাড়াতে সাদা ভুট্টার জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। ফুল আসার আগে একটিমাত্র সেচ দিয়ে ভুট্টার আবাদ করা সম্ভব এমন জাতও উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ ছাড়াও পপকর্ন ও বেবিকর্ন নিয়ে কাজ করছেন গবেষকরা।
তিনি বলেন, উত্পাদন ভালো হওয়ায় কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে খাদ্যশস্যটি আবাদে। একদিকে ধানের দাম না পাওয়া এবং তুলনামূলকভাবে সেচের পানি কম প্রয়োজন হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষক এখন ভুট্টার আবাদে ঝুঁকছে। উন্নত বীজ ও দামের নিশ্চয়তা দিতে পারলে ভুট্টা চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে।