সব টিকার আওয়াত এসেছে ৮২ ভাগ

দেশে বছরে ৩২ লাখ ৫০ হাজার শিশুকে বিভিন্ন ধরনের টিকা দেওয়া হয়। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতাধীন ১০টি মারাত্মক সংক্রামক রোগের টিকার সব এখন পর্যন্ত প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৮২ জনকে অর্থাত্ ৮২ ভাগ শিশুকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ইপিআই ও সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থাপক ড. মো. তাজুল ইসলাম এ বারী গতকাল এসব তথ্য জানান।
তিনি জানান, ১০টি মারাত্মক সংক্রামক রোগের মধ্যে অন্যতম পোলিও নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘পোলিও ইরাডিকেশন অ্যান্ড গেম স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০১৩-২০১৮’ নামক কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশে নতুন টিকা চালু করা হবে আগামী ২৩ এপ্রিল। এ দিনটি ‘জাতীয় সুইচ দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। এদিন থেকে পোলিওর টিকা হিসেবে এতদিন ব্যবহূত ট্রাই-ভ্যালেন্ট ওপিভি (টি-ওপিভি) বাদ দিয়ে নতুন বাই-ভ্যালেন্ট (বি-ওপিভি) নিয়মিতভাবে রুটিন টিকাদান কার্যক্রমে ব্যবহার করা হবে। আর আগের অব্যবহূত সব টি-ওপিভি ‘জৈব বর্জ্য’ হিসেবে সারাদেশ থেকে সংগ্রহ করে ধ্বংস করা হবে। আগামী ২৪ এপ্রিল থেকে বিশ্ব টিকা সপ্তাহ শুরুর আগের দিন পোলিওর নতুন এই টিকা চালু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পোলিও ভাইরাসের তিনটি ধরনের মধ্যে একটি টাইপ-২-এর অস্তিত্ব এখন আর পৃথিবীতে নেই। তাই এ ভাইরাস প্রতিরোধে টিকার প্রয়োজন নেই। এখন টাইপ-১ এবং টাইপ-৩ ধরনের পোলিও ভাইরাস প্রতিরোধে নতুন বি-ওপিভি টিকা দেওয়া হবে। এ টিকাটিও আগের মতো ফোটায় ফোটায় শিশুদের মুখে দেওয়া হবে। টিকার ডোজ, সময়সূচি, প্রয়োগ ও ব্যবস্থাপনা সব একই রকম থাকবে।
সুইচ দিবসের আগে টিকার সময়সূচি অনুযায়ী কোনো শিশু টি-ওপিভি টিকার প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ নিয়ে থাকলে তাকে পরবর্তী সময়ে নতুন বি-ওপিভির দ্বিতীয় বা তৃতীয় ডোজ দেওয়া যাবে। কারণ দুই ধরনের টিকাই নিরাপদ। তবে জাতীয় সুইচ দিবসের পর কোনোভাবেই টি-ওপিভি টিকা আর ব্যবহার করা যাবে না বলে জানান ড. মো. তাজুল ইসলাম এ বারী। এর কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, সুইচের পর এই টিকার ব্যবহার অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এতে পোলিও নির্মূল কার্যক্রম
ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ সুইচের পর টি-ওপিভি টিকার ব্যবহারে টাইপ-২ জনিত ভ্যাকসিন ডিরাইভড পোলিও ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। তাই সুইচের পর পোলিও নির্মূল বিষয়ক জাতীয় কমিটি ‘দ্য ন্যাশনাল সার্টিফিকেশন কমিটি ফর পোলিওমাইলাইটিস ইরাডিকেশন (এনসিসিপিই) টি-ওপিভি ধ্বংস করা বিষয়ক সব তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করবেন এবং আগামী ৭ মে ‘জাতীয় ভ্যালিডেশন দিবস’ পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে টি-ওপিভি মুক্ত হিসেবে বৈধতা দেবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানাবে। আজ ইপিআই সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাবে। উল্লেখ্য, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা পোলিও ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হয়। এ রোগে আক্রান্ত শিশু প্রথমে পঙ্গু হয় এবং একপর্যায়ে মারা যায়।
মো. তাজুল ইসলাম এ বারী জানান, বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর টাইপ-২ ধরনের ওয়াইল্ড পোলিও ভাইরাসের রোগী পাওয়া যায়। বিগত প্রায় সাড়ে ৯ বছরে বাংলাদেশে আর কোনো পোলিও রোগী পাওয়া যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত দেশ হিসেবে সনদ অর্জন করে।
সারাবিশ্বে ১৯৯৯ সালে সর্বশেষ টাইপ-২ ওয়াইল্ড পোলিও ভাইরাস শনাক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল সার্টিফিকেশন কমিশন গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর পৃথিবী থেকে টাইপ-২ পোলিও নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। তবে এখনও আফগানিস্তান ও পাকিস্তান-এই দেশ দুটিতে ওয়াইল্ড পোলিও ভাইরাসের সংক্রমণ বজায় রয়েছে।
সম্প্রতি বিবিসির এক খবরে বলা হয়, চলতি বছরে এ পর্যন্ত পোলিও আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে ১০ জন। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৪ জন। শনাক্ত হওয়া সবাই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের নাগরিক। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আফ্রিকা সম্পূর্ণভাবে পোলিওমুক্ত রয়েছে।
এ অবস্থায় ‘পোলিও ইরাডিকেশন অ্যান্ড গেম স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০১৩-২০১৮’ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ওপিভি ব্যবহারকারী ১৫০টিরও বেশি দেশ সমন্বিতভাবে চলতি এপ্রিল মাসের মধ্যে টি-ওপিভি টিকা বন্ধ করে বি-ওপিভি টিকার ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত ১৭ এপ্রিল থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী ১ মে’র মধ্যে নির্দিষ্ট দিনে সব দেশ নতুন টিকার ব্যবহার শুরু করবে।
প্রসঙ্গত, পোলিও রোগ নির্মূলে ১৯৮৮ সালে ‘বিশ্ব পোলিও নির্মূল পদক্ষেপ’ বা ‘দ্য গ্লোবাল পোলিও ইরাডিকেশন ইনিশিয়েটিভ’-এর কার্যক্রম শুরু হয়। ফলে বিশ্বজুড়ে পোলিও রোগীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত শতকরা ৯৯ ভাগ কমেছে।
ইপিআই থেকে জানা যায়, শিশুর বয়স ৬ সপ্তাহ বা ৪২ দিন পূর্ণ হলেই ১০টি মারাত্মক সংক্রামক রোগের টিকা দেওয়া শুরু করতে হবে। সব টিকা দিতে শিশুকে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত কমপক্ষে ছয়বার টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। সব টিকা সময়মতো নেওয়া শিশু যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হপিংকাঁশি, ধনুস্টঙ্কার, হোপটাইটিস-বি, কিমো ফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি জনিত রোগ, পোলিওমাইলাইটিস, নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া, হাম ও রুবেলার মতো ১০টি সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পাবে।