আলু ফলনে বিশ্বে সপ্তম

এক সময়কার গরিবের খাবারখ্যাত আলু এখন বিত্তশালীদের মেন্যুতেও। ভর্তার গ-ি পেরিয়ে আলু থেকেই তৈরি হচ্ছে পটেটো স্যান্ডউইচ, চিপস আর ফ্রাঞ্জ ফ্রাই। শুধু তাই নয়, খাবারের প্রধান উপকরণ হিসেবে আলুর ব্যবহার পরোটা, চপ ও চাটনিসহ হরেক পদে। নতুন আইটেমে আলুর ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশে প্রতিবছরই বেড়েছে আলুর উৎপাদন। ধারণা করা হচ্ছে চলতি মৌসুমেই দেশে আলুর উৎপাদন কোটি টন স্পর্শ করবে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য মতে চলতি মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ২০ মেট্রিক টন করে আলুর ফলন হয়েছে। বর্তমানে দেশের পাইকারি বাজারগুলোতে মণপ্রতি

আলু বিক্রি হচ্ছে ৫২০ টাকায়। এ বছর ভাল দাম পাওয়ায় কৃষকের মুখেও তৃপ্তির হাসি। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে আলু রফতানি হচ্ছে বিদেশেও। সংশ্লিষ্ট এ খাতে প্রতিবছরই বাড়ছে দেশের রফতানি আয়। বিস্ময়কর হলেও সত্য অন্তর্জাতিক কয়েকটি প্রতিবেদনের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরেই নীরবে আলুর বিপ্লব ঘটে গেছে। পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম খাদ্যশস্য আলু উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের সপ্তম অবস্থানে থাকার এ যেন স্পষ্ট প্রতিফলন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশে ৪ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে এ বছর আলুর ফলন হয়েছে ৪ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর জমিতে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১৬ হাজার হেক্টর বেশি। আর বছরটিতে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৪ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন, যা গত বছরের উৎপাদনের চেয়ে ১ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন বেশি।

প্রাপ্ত সর্ব শেষ খবর অনুযায়ী, চলতি মৌসুমেও দেশে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কোন নেতিবাচক খবর পাওয়া যায়নি। প্রায় ৮৫ শতাংশ জমির আলু কর্তন ও উত্তোলন সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণের হিসাব মতে, হেক্টরপ্রতি আলুর ফলন হয়েছে প্রায় ২০ মেট্রিক টন। প্রতিষ্ঠানটির সরেজমিন উইং ধারণা করছে, এ বছর আলুর উৎপাদন কোটি টন স্পর্শ করবে, যা হবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উৎপাদনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পেতে আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন ইউংয়ের উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবদুহু জনকণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে প্রতিবছরই আলুর উৎপাদন বাড়ছে। এ বছরও পূর্বের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। বছরটিতে হেক্টরপ্রতি ২০ মেট্রিক টন আলুর ফলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে, কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো হিসাব হাতে পাওয়া যাবে। তবে ধারণা করা যাচ্ছে চলতি মৌসুমে আলুর উৎপাদন কোটি টন স্পর্শ করবে।’

জানা গেছে, টানা কয়েক বছর ধরে আলুর উৎপাদন ৮২ থেকে ৮৯ লাখ টনের ঘরে ওঠানামা করছিল। গত বছরই প্রথমবারের মতো তা ৯০ লাখ টন ছাড়িয়ে ৯২ লাখ ৫৪ হাজার টনে পৌঁছে- যা এ যাবতকালে আলু উৎপাদনের সর্বোচ্চ রেকর্ড। তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদন ৮৩ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। যদিও পরের অর্থবছর তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৮২ লাখ ৫ হাজার টনে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা আবার বেড়ে ৮৬ লাখ ৩ হাজার টনে পৌঁছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টন। আর সর্বশেষ গত অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদন হয় ৯২ লাখ ৫৪ হাজার টন।

চলতি মৌসুমে মুন্সীগঞ্জ জেলায় আলুর ফলন কিছুটা কম হলেও গত বছরের তুলনায় দাম বেশি। পাইকারি বাজারে মণপ্রতি ৫২০ টাকায় আলু বিক্রি হচ্ছে। আর ভাল দাম পাওয়ায় কৃষকের মুখেও হাসি। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়িতে কৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত মোঃ আসলাম ঢালী। তিনি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় আলুর ফলন কিছুটা কম, তবে দাম বেশি। ভাল দাম পাওয়ায় খরচের পুরোটাই উঠে আসছে।’ একই অবস্থা কিশোরগঞ্জেও। জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার হরশী গ্রামের কৃষক হিমেল কবির জনকণ্ঠকে বলেন, এবারও আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। আবার দাম নিয়েও শঙ্কা নেই। পাইকারি বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৫২০ টাকায়। তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি একরে ২৫০ মণ আলু উৎপাদন হলে সেই ফলনকে উচ্চ ফলন ধরা হয়। আমার প্রতি একর জমিতে ২২০ মণের মতো আলুর ফলন হয়েছে।’ চলতি মৌসুমে একই সঙ্গে উচ্চ ফলন ও ভাল দাম পাওয়ায় অন্যান্য কৃষকের মতো হিমেলের মুখেও হাসির আভা স্পষ্ট।

জানা গেছে, ১৯৮০ সালে মুন্সীগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় শুরু হয় আলুর চাষাবাদ। আর বর্তমানে দেশের সর্বত্রই আলুর চাষ। তবে মুন্সীগঞ্জ, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী অঞ্চলেই ফলন বেশি। কয়েকজনের অভিযোগ, দিন দিন আলুর উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণে রয়েছে অপ্রতুলতা। প্রচলিত প্রাকৃতিক পদ্ধতি ছাড়াও কোল্ড স্টোরেজ পদ্ধতিতে আলু সংরক্ষিত হলেও দেশে কোল্ড স্টোরেজের সংখ্যা নেহায়েত কম। কৃষিবিদরা বলেন, বৃহৎ আকারে আলুর সংরক্ষণের জন্য দেশে কোল্ড স্টোরেজের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। তবে ‘অপর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ’ বিষয়টি মানতে নারাজ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ। এ খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে কোল্ড স্টোরেজের পর্যাপ্ততা নিয়ে এখন আর কোন সমস্যা নেই। এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনোয়োগ হয়েছে। কোল্ড স্টোরেজ এখন কোন সমস্যাই নয়। তবে আলু সংরক্ষণে কৃষককে অনেক ক্ষেত্রে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়।’

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্ব বাজারেও রফতানি হচ্ছে আলু। উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দেশের রফতানি আয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্যমতে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাত্র ৩২ কোটি ২২ লাখ টাকার আলু রফতানি হলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ২৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

আলু উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আলুর উৎপাদন বিষয়ক সর্বশেষ এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় আলু উৎপাদনে বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে রয়েছে। তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে চীন। ক্রমানুসারে তার পরেই আছে ভারত, রাশিয়া, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি।

এ ছাড়াও খাবার তালিকায় ভাতের পরেই আলুর অবস্থান। আলু বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম খাদ্যশস্য, যার পূর্বে রয়েছ ভুট্টা, গম ও চাল। ফলে আলুর চাহিদাও বাড়ছে। গত এক যুগে দেশীয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত নতুন প্রজাতির ৬০টি জাত থেকেই দেশের ৭৫ শতাংশ আলুর উৎপাদন হয়েছেÑএমনটাই দাবি তাদের। চাহিদা ও উৎপাদন উভয়ই বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশেই ১৫টি আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপিত হয়েছে, আর তা থেকেই উৎপাদিত চিপস ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, আলুর উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও উদ্বৃত্তের সবটাই বিদেশে রফতানি হয় না। সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক মৌসুমেই কৃষক কম দাম পেয়ে থাকেন। এ ছাড়াও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে উৎপাদিত আলুর একটি অংশ নষ্ট হয়ে যায়, ফলে কৃষককে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের লোকসান। এ সমস্যা সমাধানে ‘অপরিকল্পিত উৎপাদনকে’ দায়ী করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ‘উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে আমাদের দেশে পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে। কোন একটি এলাকায় এক বছর আলুর দাম বেশি পাওয়া গেলে পরবর্তী বছর সে এলাকার সবাই আলু উৎপাদন করে বসেন। ফলে কৃষককে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসাররণ অধিদফতরের দায়িত্ব রয়েছে। তারা এক্ষেত্রে কৃষককে কম আলু উৎপাদনে উৎসাহিত করতে পারেন। কৃষককে সচেতন করে পরিকল্পিত উৎপাদনেও মনোযোগী হওয়া যেতে পারে।’ সর্বোপরি ঘটনমান নীরব আলু বিপ্লবের বিষয়টি মাথায় রেখে পরিকল্পিত উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে অধিকতর রফতানি বৃদ্ধিতেও মনোযোগী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন কেউ কেউ।