কৃষি উন্নয়ন ও সম্ভাবনা

‘ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল/ গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।’ পৃথিবীর বিশাল মানচিত্রের মাঝে আমাদের অস্তিত্ব খুঁজতে গেলে একটু কষ্ট হবে বৈকি। কিন্তু অস্তিত্ব কি আর বিশাল মানচিত্রের মাঝে সন্ধান করলেই খুঁজে পাওয়া যায়! অস্তিত্ব খুঁজতে হয় না, সম্ভবত অর্জন করলেই পাওয়া যায়। আয়তনে ছোটো হলেই তো কেউ অর্জনে ছোট হয়ে যায় না। আমাদের দেশটি আয়তনে ছোট হলেও এর আছে প্রাচুর্যের ভাণ্ডার, আছে উর্বর ভূমি, সহজলভ্য পানির উৎস, শ্রমশক্তি, প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল খনি, কয়লা, খনিজ তেল ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরনের অনাকাক্সিক্ষত কারণে এ দেশে কৃষিখাত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং কৃষি কাজের প্রতি অনেকেরই অনাস্থা চলে এসেছে। যার ফলে বেকারত্ব বাড়ছে, কাজের অভাবে অনেকেই শহরমুখী হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সে হারে আবাদি জমির পরিমাণ বৃদ্ধি না পেলেও এই বাড়তি জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করে শহরমুখী মনোভাবে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
কৃষি এবং কৃষক আমাদের গর্ব। বাংলাদেশের ভূমি উর্বরও পানির উৎস সহজলভ্য হওয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রধান জীবিকা হলো কৃষি। কৃষিখাত আজ অনেকটা পেছনে পড়ে আছে যতটা না সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এর পেছনে দায়ী প্রধানত বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যথা নদী ভাঙন, ঝড়, বন্যা, খরা, লবনাক্ততা ইত্যাদি; আবার আবহাওয়ার তারতম্য ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি, মরুর বুকে জমা বরফ গলে যাওয়া ইত্যাদি; এছাড়াও রয়েছে আবাদি জমির অভাব, কৃষিখাতে স্বল্প ভর্তুকি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, অবকাঠামোগত সমস্যা, প্রযুক্তি ব্যবহারে স্বল্পতা, অনুন্নত যোগাযোগ বাবস্থা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, মধ্যসত্ত্বভোগী ব্যবসায়ীর দৌরাত্ম্য ইত্যাদি। জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাৎসরিক ‘কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ’ ২০১১-এ ১৯৭৬-৭৭ থেকে ২০১০-১১ সময় পর্যন্ত আবাদি জমির প্রাপ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অনুযাযী ১৯৭৬-৭৭-এ মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল ৯.৩৯ মিলিয়ন হেক্টর যা কিনা ২০১০-১১ এ ৮.৫২ মিলিয়ন হেক্টর। এভাবে যদি আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ দিন দিন কমতে থাকে তবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব হবে কি! শহরমুখী মনোভাবের পরিবর্তনের জন্য কৃষকদের বহুমুখী সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে তাদেরকে আরো উৎসাহী করে তুলতে হবে কৃষিকাজে আর বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে।
ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শহরের যে তালিকা তৈরি করেছে তাতে বিশ্বে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহর বলে বিবেচিত হয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বর্তমানে এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ বাস করছে এবং প্রতিদিন একহাজার ৪১৮ জন মানুষ বাড়ছে। ঢাকার বাইরে বেকারদের কর্মসংস্থান তৈরি করে এই অতিরিক্ত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা এখন একটি জরুরি বিবেচ্য বিষয়।
কৃষিখাতসহ আরো বিভিন্ন সম্ভাবনাময় শিল্পখাতকে গুরুত্ব দিয়ে এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন অতি প্রয়োজনীয়।
পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে এক সময় বাংলাদেশ অধিকাংশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত যার জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্য ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দা অবস্থা বিরাজ করার কারণে পাট চাষে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অনেকে। আদমজী জুটমিল, কর্ণফুলী জুটমিল, পিপলস জুটমিলসহ আরো বেশ কয়েকটি জুট মিল বন্ধ হয়ে যাবার কারণে পাটশিল্পের সাথে সাথে এদের সংযোগ শিল্পও ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাছাড়া শ্রমিক ছাঁটাইও করা হয় অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে। ফলে সৃষ্টি হয় হাজার হাজার কর্মসংস্থানহীন নিঃস্ব মানুষ। দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে অন্যতম হলো চা শিল্প ও চামড়া শিল্প। চা শিল্পের ক্ষেত্রে ভারত ও শ্রীলঙ্কা রপ্তানির বাজার দখল করে নিয়েছে আগে থেকেই। তবে তৃণমূল শিক্ষা ও গবেষণা পারে এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে ও সঙ্গে সঙ্গে তৈরি করতে পারে অতিরিক্ত জনসংখ্যার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। বাংলাদেশে আরো একটি সম্ভাবনাময় হিমায়িত মৎস্য রপ্তানিখাত হচ্ছে চিংড়ি, বিশ্ববাজারে চিংড়ির চাহিদা হ্রাস পেয়েছে এর গুণগত মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি আরো বিভিন্ন কারণে। তৈরি পোশাক শিল্প যা কিনা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিখাত বর্তমানে তা শ্রমিকদের নিরাপত্তার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। বেশিরভাগ পোশাক কারখানাই ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠার কারণে ঢাকাতে যোগ হচ্ছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা।
কৃষকদের বহুমুখী সমস্যার সমাধান, পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ, গবেষণা কাজে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দুর্যোগ মোকাবেলায় কঠোর হস্তক্ষেপ, দুর্যোগ পরবর্তী পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি ইত্যাদির মাধ্যমে রাজধানীবিমুখী পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে একদিকে যেমন দূষণমুক্ত রাজধানী সৃষ্টি করা সম্ভব অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে কৃষিখাতে, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্ভবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দুর্যোগের এই দেশে দুর্যোগ মোকাবেলা করে এবং দুর্যোগ সহনীয় কৃষি পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকরা ইতোমধ্যেই বহুমুখী সাফল্য অর্জন করেছে। কৃষিখাতে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ যেমন খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিখাতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যাবহার, কৃষি গবেষণায় অবদান, সার, কীটনাশক ও বীজের মূল্য হ্রাসসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কৃষিতে অগ্রগতি এনে দিয়েছে। এই ধারাকে বেগবান রাখতে হবে।