মানুষের জীবন বাঁচানো শ্রেষ্ঠ পুরস্কার

‘১৯৮০ সালের কথা। এমবিবিএস পড়া শেষ করেছি কিছুদিন আগে। গ্রামে গিয়েছি। হঠাত্ পাশের গ্রামের একজন এসে ডাকাডাকি শুরু করলো। বললো, খুব দ্রুত যেতে হবে, এক মহিলার বাচ্চা হবে। আমি তরুণ ডাক্তার। পুরুষ ডাক্তারের ডেলিভারি করানোটা তখনো সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। আমি ইতস্তত করছিলাম। তার বাড়িতে যেয়ে দেখি বাচ্চার পুরো শরীর বের হয়ে আছে। মাথা ভেতরে আটকে রয়েছে। এ অবস্থায় কোনো হাসপাতালে নেয়া সম্ভব না। হাতে নারকেল তেল মেখে ডেলিভারি করিয়েছিলাম। মা-বাচ্চা দুজনেই বেঁচে গেল। আমার ডাক্তারি জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতার দিন সেটি।’ বলছিলেন একুশে পদক পাওয়া চিকিত্সক এ বি এম আবদুল্লাহ। একটু থেমে যোগ করলেন, জীবনে পুরস্কার সম্মান পেয়েছি অনেক। কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচানোর মত পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। একদিন হাসপাতালের ডিউটি আওয়ারে কাজ করছি। হঠাত্ একজন সামনে এসে দাঁড়িয়ে নিজের নাম বলে জানালো- সে ডাক্তার হয়েছে। এ সেই, যে ছেলেটি বাঁচিয়ে ছিলাম। সেদিন যেন আরো বড় পুরস্কার পেলাম।’

যার কথা বলছি, তিনি দেশের খ্যাতিমান চিকিত্সক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এবং মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছরই পেয়েছেন একুশে পদক। সে প্রসঙ্গে বললেন, পুরস্কার পাওয়া সম্মানের আর তা যদি হয় রাষ্ট্রীয় পদক সেটা অত্যন্ত খুশির ঘটনা আমার জীবনে। তবে চিকিত্সা সেবা একার কোনো বিষয় নয় এটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সে অর্থে এ পুরস্কার চিকিত্সক সমাজেরও।

এ শতাব্দীর শুরুর দিকে দেশে যখন ডেঙ্গুজ্বর একটি আতঙ্কের নাম, তখন জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসংখ্য রোগীকে সফলভাবে চিকিত্সা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত চিকিত্সা বিষয়ক বইগুলো দেশে-বিদেশে বেশ সমাদৃত। শুধু চিকিত্সা দিয়েই নয় সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন জার্নালে লেখালেখির মাধ্যমেও ওষুধের ভুল ব্যবহার, অপচিকিত্সার কুফল, চিকিত্সক এবং রোগীর সম্পর্ক নিয়ে সারা বছরই তাঁর কলম থাকে সক্রিয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাধ্য অনুযায়ী চিকিত্সা সেবার মান অনেক এগিয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়েনি। ফলে যে হাসপাতালে এক হাজার রোগীর চিকিত্সা সেবা দেয়ার ক্ষমতা সেখানে যদি প্রতিদিন দুই হাজার রোগী আসে তবে ডাক্তার চিকিত্সা সেবা দিলেও রোগী এর পরবর্তী সেবা পাবেন না। সে ব্যর্থতা ডাক্তারের নয় কিন্তু রোগীরা মনে করেন এটাও আমাদের কাজ।

তাছাড়া প্রশাসনিক বিষয়গুলোতেও রোগীদের যেসব অভিযোগ আসে যেমন- বিছানা খারাপ, হসপিটাল অপরিষ্কার, কর্মচারীর অভাব- এ ব্যাপারে আসলে আমাদের করণীয় খুব বেশি কিছু নেই। এ ব্যাপারটা দেখাশুনা করছেন প্রশাসন। অথচ রোগীরা তা বুঝতে চান না। তারা ডাক্তারদেরই দায়ী মনে করেন। আবার এটাও ঠিক অনেক চিকিত্সক অর্থ উপার্জনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এটা অনৈতিক। একজন ভাল চিকিত্সক আয় করবেনই, এটা তার ভবিতব্য। কিন্তু তার জন্য অনৈতিক বা লোভী হওয়ার প্রয়োজন নেই। সেবাটাই গুরুত্ব দেয়া জরুরি। কিন্তু সবাই তো এক হয় না। সব মানুষের স্বভাব এক হবে না।

এই স্বনামধন্য চিকিত্সক বলছিলেন, ’৭৮ সালে এমবিবিএস পাস করে বের হই। ১৯৮৪ সালে সৌদিতে যাই চাকরি নিয়ে। পাঁচ বছর ছিলাম। লোভনীয় চাকরি। অনেক টাকাও পেলাম। কিন্তু মনের মধ্যে অপূর্ণতা ছিল। তা হলো উচ্চশিক্ষা গ্রহণের অপূর্ণতা। ১৯৯২ সালে লন্ডনে যাই। লন্ডনের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করি। কিছু ভালো হাসপাতালে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছি। পাস করার পর বাইরের দেশে যাওয়ার লোভনীয় অফার ছিল। এরপরও দেশে চলে আসি। দেশের মানুষকে সেবা করার ইচ্ছা ছিল মনে।

১৯৯৫ সালে তত্কালীন পিজি হাসপাতালে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেই। তখন থেকে এখানেই। চিকিত্সা করা, শিক্ষা দেয়া সবকিছুই ভাল লাগে তবে সবচেয়ে আগ্রহ পাই বই লেখায়। বইয়ে অভিজ্ঞতাটা জমা থাকে যা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায়। আমি যখন থাকবো না তখনও বই থেকে যাবে। এ পর্যন্ত পাঁচটি বই লিখেছি। বইগুলো হলো ‘শর্ট কেসেস ইন ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, রেডিওলজি ইন মেডিক্যাল প্র্যাকটিস, লং কেস ইন ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, ডেটা ইন্টারপ্রিটেশন অফ মেডিক্যাল প্র্যাকটিস ও স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্বাচিত কলাম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই এই বইগুলো চিকিত্সা শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। তাছাড়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে বইগুলো পড়া যায়। এদিকে, শর্ট কেসেস ইন ক্লিনিক্যাল মেডিসিন বইটি ইউজিসি ইউনির্ভাসিটি গ্র্যান্ড কমিশনে ২০১৩ সালে পুরস্কৃত হয়েছে।