ধোলাইখালে দেশীয় প্রযুক্তিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি হাজারো মেশিন ও পার্টস্ তৈরি হচ্ছে আড়াই লাখ কারিগরের শ্রমে-উদ্যমে

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে পুরনো ঢাকার ধোলাইখাল। এখানে মোটর পার্ট্স ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর এক বিশাল সম্ভাবনাময় ভাণ্ডার গড়ে উঠেছে। লায়ন, পিস্টন, বিয়ারিং থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি মোটর পার্ট্স গাড়ির ব্রেকডাম, ইঞ্জিন, কার্টিজ, সকেট, জগ, জাম্পার, স্প্রিং, হ্যামার, ম্যাকেল জয়েন্ট, বল জয়েন্টসহ নানা মেশিনারিজ ও পার্ট্স তৈরি হচ্ছে এখানে। বর্তমানে এ শিল্পে উদ্যমী উদ্যোক্তারা প্রায় ৩৮ হাজার রকমের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করছেন।

ধোলাইখালে তৈরি মেশিনারি পার্ট্স ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া ভালো রিকন্ডিশন্ড পাটর্্সের জন্য ধোলাইখালের দেশব্যাপী সুনাম রয়েছে। পুরনো গাড়ি ভেঙেও পার্ট্স সংগ্রহ করা হয় এখানে। ধোলাইখালের পার্টেসর চাহিদা রয়েছে গোটা দেশে। এখানে তৈরি পাটর্্স ইতিমধ্যেই সারাদেশে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। আর সেচপাম্প, পাওয়ার পাম্প, পাওয়ার টিলারসহ নানা ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি ও মেশিনারি তৈরি হচ্ছে বগুড়ায়। দেশের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ মিটিয়ে এগুলো ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের অপার সম্ভাবনাময় এই ধোলাইখালের মেশিনারি পার্ট্স শিল্প বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

স্বাধীনতার আগে থেকেই এই এলাকায় মোটর পার্ট্স শিল্পের গোড়াপত্তন ঘটে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ধোলাইখাল ভরাট হতে থাকে। এইসঙ্গে এখানে প্রসার ঘটতে থাকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের। কমমূল্যে ভালো রিকন্ডিশন্ড পার্টস কেনার জন্য ধোলাইখাল সুনাম অর্জন করেছে। বর্তমানে এ এলাকায় ছোট-বড় কয়েক হাজার দোকান ও কারখানা রয়েছে। এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আড়াই লক্ষাধিক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী। ধোলাইখালের পুরো এলাকাতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পার্ট্স এবং ইলেকট্রনিক্স দোকান ও কারখানা। গাড়ির পার্ট্সসহ বিভিন্ন অংশের জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা মার্কেট। মার্কেটের মধ্যে রয়েছে হাজী মনসুর মার্কেট, বাঁশপট্টি মার্কেট, গাছ মার্কেট এবং টং মার্কেট। হাজী মনসুর মার্কেটে প্রাইভেটকারের স্পেয়ার পার্ট্স, বাঁশপট্টি মার্কেটে টয়োটা, হোন্ডাসহ অন্যান্য গাড়ির পাটর্্স, গাছ মার্কেটে বেডফোর্ডের পার্ট্স, টং মার্কেটে প্রায় সবধরনের স্পেয়র পার্ট্স এবং এর পাশেই গাড়ির পুরনো টায়ার ও রিম পাওয়া যায়।

এছাড়া এসব মার্কেটে প্রায় সবধরনের প্রাইভেটকার, বাস ও ট্রাকের স্পেয়ার পার্ট্স পাওয়া যায়। সুলভমূল্যে ভালো রিকন্ডিশন্ড পার্ট্স কিনতে গাড়ির মালিকরা বাধ্য হয়েই ধোলাইখাল যান।

ধোলাইখালের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বিক্রিযোগ্য এসব পাটর্্স বিভিন্ন গ্যারেজ থেকে এবং কিছু জিনিস নিজস্ব কারিগরি দক্ষতায় তৈরি করা হয়। এছাড়া পুরনো গাড়ি ভেঙেও পাটর্্স সংগ্রহ করা হয়।

হালকা প্রকৌশল শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিইআইওএ) সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, ধোলাইখালের ফাতেমা ইঞ্জিনিয়ারিং ওষুধ শিল্পের জন্য বিলিষ্টার মেশিন তৈরি করেছেন দেশীয় প্রযুক্তিতে, যা আগে বিদেশ থেকে আমদানি করতে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা লাগতো। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই মেশিনের মূল্য পড়ছে এখন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা।

শিল্পের কারিগর ও উদ্যোক্তারা প্রায় ৩৮ হাজার রকমের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করছেন। এসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ শিল্প, গৃহস্থালী, কৃষি, বৈদ্যুতিক, যানবাহন, খেলনা ও চিকিত্সাক্ষেত্রে ব্যবহূত হচ্ছে। এসবের মধ্যে কাগজ ও সিমেন্ট কারখানার যন্ত্রাংশ, বাইসাইকেল, ফ্যান্সি লাইট ফিটিংস্, নির্মাণযন্ত্র, ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার, আয়রন চেইন, কার্বন রড, অটোমোবাইল পার্ট্স, বৈদ্যুতিক ও স্টেনলেস স্টিল ওয়্যার রপ্তানি হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে এসব পণ্য। বিইআইওএর সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক জানান, এ শিল্পের মালিকরা যে কোনো যন্ত্র একবার দেখে তা হুবহু তৈরি করতে পারেন।

মেসার্স ফাতেমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মালিক মো.ইব্রাহিম খলিল বলেন,ওষুধ শিল্পের বিকাশে আমরা বিলিষ্টার প্যাকিং মেশিন তৈরি করেছি। প্রতিটি মেশিন তৈরি করতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। আগে এই মেশিনগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায়। প্রতিবছর ১৮ থেকে ২০টি মেশিন তৈরি করা যায়। এই মেশিন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বলে জানান তিনি।