শেখ হাসিনার কণ্ঠে নির্মোহ সত্যের উচ্চারণ

বাংলা বর্ষবরণ বাঙালির প্রাণের উৎসব। জাতির আবেগ মতিত এই সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাসের বিপরীতে কোন অপশক্তি দাঁড়াতে পারেনি। একটি দেশ ও জাতি যেখানেই থাকুক, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাই নয়, দেশজুড়ে মেলা, বাংলা খাবারের বাহারি আয়োজন, উৎসবের বর্ণিল ফ্যাশন, সাজসজ্জা মিলে প্রাণে প্রাণে একাকার হয়ে যায় বাউলের একতারায়। দলমত নির্বিশেষে বাঙালি জাতির প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উৎসবের

মোহনায় আত্মপরিচয় তুলে ধরার দিন পহেলা বৈশাখ। এবারও তাপদাহের মধ্যে আমাদের আনন্দের বন্যায় ভাসিয়েছে। উৎসব-পার্বণ করপোরেট সংস্কৃতির বাণিজ্যের আগ্রাসনে পতিত হলেও বাঙালির শাশ্বত বর্ষবরণের চেতনা বিচ্যুত হয়নি। এটি মানুষের আবেগ, প্রেম, চেতনা ও হৃদয় নিঃসৃত বিষয়। সেখান থেকে কেউ সরেনি।

নববর্ষের দিন গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে দেওয়া বক্তব্য পড়ে মুগ্ধ হই। যেন মানুষের হৃদয়ের কথা বলছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আবেগ-অনুভূতি ও বিশ্বাস তার কণ্ঠে নির্মোহ সত্য হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে যে কথাগুলো বলতে চেয়েও পারিনি, সেটিই তিনি উচ্চারণ করেছেন। নববর্ষের আগের রাতে একাত্তর টিভির জার্নালে অতিথি হয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের বক্তব্যের প্রসঙ্গ এসেছিল। পহেলা বৈশাখ বিকাল ৫টার পর রমনাসহ উন্মুক্ত স্থানে বর্ষবরণের সব অনুষ্ঠান আয়োজনে পুলিশ যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, সুলতানা কামাল তার জন্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন। কিন্তু আমি তার বক্তব্যের সঙ্গে সেদিন একমত হতে পারিনি। তিনি বলেছেন, এটি মধ্যযুগীয় সিদ্ধান্ত। সরকার মুক্তবুদ্ধির মানুষদের কোণঠাসা করে ধর্মান্ধ, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাচ্ছে না। যারা মুক্তবুদ্ধির মানুষ তাদের ওপরে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই শক্তিগুলোকে অনেক বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছে, শক্তিশালী করে তুলছে। মানুষের বাইরে আসার অধিকারকে ক্ষুণœ করে, উৎসবের আনন্দকে মলিন করে কীভাবে তারা দাবি করে গণতন্ত্রের সরকার, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার।’

বিএনপির নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। সেদিন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চেয়েছিলেন। তা করতে না পারার অপারগতা এবং যেসব ঘটনাবলির সঙ্গে একমত নন, সেসব ঘটনা দেখতে দেখতে কান্ত হয়ে চারজন উপদেষ্টার একজন হয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। সেদিন মরহুম মাহবুবে আলম পদত্যাগ না করলেও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী, ড. আকবর আলি খান, সিএম শফি সামি ও তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। সেদিন সুলতানা কামালের সামনে এটিই ছিল বাস্তবতা। সেটিই ছিল তাদের সামনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একমাত্র পথ। এবারের নববর্ষে সরকার ৫টার পর উন্মুক্ত স্থানে উৎসব-অনুষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাস্তব সত্যকেই গ্রহণ করেছে। মানুষের জীবন ও সম্ভ্রম রক্ষার সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের হয়ে মানুষের জীবন ও সম্ভ্রম রক্ষায় সরকার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা কারও কারও মনে বেদনা জাগালেও বাস্তবসম্মত। উৎসবের আনন্দ খানিকটা মলিন হলে কিংবা ছন্দপতন ঘটলে ক্ষতি নেই। মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতায় নিরাপত্তার জন্য এমন আনন্দ উৎসবে রমনার বটমূলের মতো বোমা হামলা বা টিএসসির নারীর সম্ভ্রম লুটের নির্লজ্জ নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি শান্তির হতো না। সুলতানা কামাল যেখানে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে না পারার বেদনা নিয়ে পদত্যাগ করে চারজন উপদেষ্টার সঙ্গে অভিনন্দিত হয়েছিলেন, সেখানে বিকাল ৫টার পর উন্মুক্ত স্থানে উৎসবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে মধ্যযুগীয় চিন্তার প্রতিফলন বলেন, কণ্ঠে তার হঠকারী অতিবিপ্লবীর সুর পাওয়া গেলেও কোনো অঘটন কারও জন্য স্বস্তির হতো না। মধ্যযুগীয় চিন্তায় এই জাতি কখনোই নেই। তাই একটি উদার সাংস্কৃতিক গণজাগরণের কারণে তিনি যেমন সনাতন হিন্দু ধর্মের ব্রাহ্মণপুত্রকে বিয়ে করে সুখের জীবন কাটাচ্ছেন, তেমনি প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে যে কারও সঙ্গে হৃদয়ে হৃদয় দিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে মুক্ত জীবন কাটাচ্ছেন। সমাজ তাদের প্রতি সম্মান হারাচ্ছে না।

পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল মুসলিম লীগ। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়েছিল সামন্তশ্রেণি চরিত্রের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করা নেতাকর্মীদের এই দল। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কালের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে দলটির নাম-নিশানা। টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদীর তীর থেকে উঠে আসা মহাত্মা গান্ধির স্নেহসান্নিধ্য পাওয়া, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে রাজনীতিতে পথহাঁটা সাহসী তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের আবেগ অনুভূতিকে হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন। ভাঙাগড়া আর শোষণ-নির্যাতনের রাজনীতির পথে আওয়ামী লীগের নিভু নিভু বাতিকে জ্বালিয়ে তিনি যখন স্বাধীনতার লক্ষ্য নির্ধারণ করে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ হেঁটেছিলেন, ৬ দফার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন মস্কো ও পিকিংপন্থি বামরা বাস্তবতা থেকে হাজার মাইল দূরে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সেøাগান তুলে তার সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে সংগ্রামের কণ্টকাকীর্ণ পথে যখন জীবন বাজি রাখা সংগ্রামে একটি জাতিকে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার আদায়ের পথে স্বাধীনতার ঐক্যের মোহনায় মিলিত করছিলেন, তখন তার সঙ্গে অর্ধশিক্ষিত আর সাধারণ মানুষরা আস্থা রেখেছিলেন। সেদিন গণতন্ত্রের আগেই সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর মধ্যবিত্ত শ্রেণির তথাকথিত মার্কসবাদী লেনিনবাদী মোটা বইয়ে ডুবে থাকা শিক্ষিত প্রগতিশীলরা মস্কো ও পিকিংয়ের ছাতা ধরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরে হেঁটেছিলেন। অতিবিপ্লবীরা ভোটের বাক্সে লাথি মেরে সমাজতন্ত্র কায়েমের সেøাগান তুলেছিলেন। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০-এর নিরঙ্কুশ গণরায় নিয়ে একটি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে গৌরবের সুমহান মুক্তিযুদ্ধে উত্তরণ ঘটিয়েছিলেন।

পাকিস্তানের সেবাদাস মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলামসহ ধর্মনির্ভর সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির কবর রচিত হয়েছিল। সমাজতন্ত্রীরা শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের জন্য এটি ছিল বাস্তবতা। জনগণের আবেগ অনুভূতি ও চিন্তা-চেতনার জায়গা থেকে এ দেশের বামরা বা অতিবিপ্লবীরা বরাবর দূরত্বে ছিলেন বলেই জনগণের হৃদয় জয় করতে ব্যর্থ হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে যেখানে একই আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বামরা ৩৫ বছর শাসন করেছে, এ দেশে জনসমর্থন আদায় দূরে থাক, লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি ও বড় দলে আশ্রিত ক্ষমতার অংশীদারিত্বের লোভ তাদের রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড পল্টন আর তোপখানায় গুটিয়ে এনেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে যারা মুজিব সরকারের করুণাশ্রিত হয়েছিলেন বা যারা অতিবিপ্লবের পথ নিয়েছিলেন তাদের বড় অংশই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর সামরিক শাসকদের হেরেমে ঢুকেছিলেন। বাকি যারা খড়কুটোর মতো রাজনীতিতে সাইনবোর্ডসর্বস্ব দল নিয়ে টিকে ছিলেন, তারা আজ মুজিবকন্যার আঁচল ধরে নৌকায় চড়ে সংসদ ও সরকারে ঠাঁই পেয়েছেন। এটাই আজকের রাজনীতির বাস্তবতা। বঙ্গবন্ধু জগদ্বিখ্যাত ওয়েস্ট মিনিস্টার ডেমোক্রেসির ধাঁচে একটি উদার, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধান দিয়েছিলেন। যেটি ১৯৭২ সালের সংবিধান হিসেবে চিহ্নিত। ’৭৫-উত্তর বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাসহ মুক্তিযুদ্ধের অর্জিত সাংবিধানিক চেতনা অনেকটাই বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ধর্মের রাজনীতি, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রক্তে লেখা যে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে মৈত্রী ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন হয়েছিল সেই ভারতবিরোধী রাজনীতিকে সামনে আনা হয়েছিল। সেই রাজনীতি দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামী আওয়ামী লীগকে একুশ বছর ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়েছে।

আজকের বাস্তবতায় নববর্ষে খিচুড়ি খেতে যেমন মানুষ ভালবাসে তেমনি রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রাখা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের বিধান রাখার মতো সংবিধান বহাল।

গণভবনের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মুক্তচিন্তার নামে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া বিকৃত রুচি ও নোংরা রুচির পরিচয়। যেন এটা একটা ফ্যাশনে দাঁড়িয়ে গেছে। ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তারা হয়ে গেল মুক্তচিন্তার। আমি তো এখানে মুক্তচিন্তা দেখি না। কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে লেখা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আমার ধর্ম আমি পালন করি। আমার ধর্ম সম্পর্কে কেউ যদি নোংরা কথা লেখে সেটা আমরা কেন বরদাশত করব? এত নোংরা নোংরা লেখা কেন লিখবে? যাকে আমি নবী মানি, তার সম্পর্কে নোংরা কথা কেউ যদি লেখে সেটি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, ঠিক তেমনি অন্য ধর্মের যারা আছেন, তাদের সম্পর্কে কেউ যদি লেখে এটাও কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। এসব নোংরা কথা, পর্নের কথা কেন লিখবে? আমি তো মনে করি, এটা সম্পূর্ণ নোংরা মনের পরিচয়, বিকৃত মনের পরিচয়। এটা কোনো ধর্ম বা দর্শন পালন নয়। এটা সম্পূর্ণ তাদের চরিত্রের দোষ এবং তারা বিকৃত মানসিকতায় ভোগে। আশা করি এ ধরনের লেখা কেউ লিখবেন না। আমি একজন মুসলমান হিসেবে প্রতিনিয়ত আমার ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি। সেখানে কেউ যদি লেখে, এতে আমার নিজেরও কষ্ট হয়। আর এই লেখার জন্য অঘটন ঘটলে দোষ সরকারের ওপর আসবে কেন? সবাইকে সংযম হয়ে চলতে হবে। অসভ্যতা কেউ করবেন না। অসভ্যতা করলে তার দায়িত্ব কে নেবে? আর মানুষ খুন করার মধ্যে কোনো সমাধান নেই। একজন লিখল আরেকজন খুন করে সেটার প্রতিশোধ নেবে, এটা তো ইসলাম ধর্ম বলেনি। বিচারের দায়িত্ব আল্লাহ তাদের দেননি। বিচারের মালিক আল্লাহ। তিনিই শেষ বিচার করবেন। তাহলে আল্লাহর ওপর কি তাদের ভরসা নেই? আল্লাহর ওপর যাদের ভরসা নেই তারাই এসব খুনখারাবি করে। কারণ তারা আল্লাহ-রাসুল মানে না।’

ব্যক্তিজীবনে রবীন্দ্র-নজরুল অনুরাগী বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী শেখ হাসিনা তাহাজ্জুদের নামাজ, ফজরের নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত ও সংবাদপত্র পাঠ করার মধ্য দিয়ে তার দিন শুরু করেন। অসংখ্যবার হজ করেছেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুও বলেছিলেন, আমি মুসলমান। মুসলমান একবারই মরে, বারবার মরে না। তার জন্য ফাঁসির আদেশই সেদিন শেষ হয়নি, কবরও খোঁড়া হয়েছিল। তিনি তার স্বাধীন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। এ দেশের মানুষ বাংলাদেশের অভ্যুদয়কালে নফল নামাজ পড়েছে, রোজা রেখেছে বাঙালির মহত্তম নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য। সন্তান মুক্তিযুদ্ধে গেছে, মা জায়নামাজে ইবাদত করেছেন। অন্য ধর্মের মায়েরা প্রার্থনায় বসেছেন। আমাদের ছেলেবেলায় সাম্প্রদায়িকতার বাতাস এতটা ছিল না। মায়ের সুরেলা কণ্ঠে ‘ফাবিআইয়ি আলা ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ কোরআন তেলাওয়াত শুনে ঘুম ভেঙেছে। ফজরের নামাজ পড়ে পড়তে বসা এবং মাগরিবের নামাজ পড়ে পড়ার টেবিলে বসা নিয়মে দাঁড়িয়েছিল। বাবাকে কখনো দেখিনি নামাজ ক্বাজা করতে। তাহাজ্জুদের নামাজ দিয়ে তিনিও আল্লাহর ইবাদতই শুরু করতেন। সন্ধ্যাবেলায় পাড়ার মাসিমারা সন্ধ্যা আরতি ও প্রার্থনায় মগ্ন হতেন। জোছনা রাতে মা-মাসিমারা শীতল পাটি বিছিয়ে উঠোনজোড়া জোছনায় ভিজে পানের বাটা নিয়ে বসতেন। দুর্গাপূজায়, পৌষ সংক্রান্তিতে আমরা পেতাম নিমন্ত্রণ। সবার বাড়ি বাড়ি যেতাম। ঈদের সময় তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাওয়াত করতাম। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা পাঠের আসর, বাউলের জলসা, ছাত্র মিছিল, উৎসবে-পার্বণে হরি হরি আত্মা হয়ে বন্ধুত্বের বাঁধনে জড়িয়ে কিংবা স্নেহছায়ায় সমবয়সী বা অগ্রজ-অনুজরা বেড়ে উঠেছি। আমাদের প্রেমের শহর সুনামগঞ্জে আসাম প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী অক্ষয় কুমার দাশ প্রতি রমজানে শহরের অনেকের বাড়িতে ইফতার পাঠাতেন। ঈদের জামাত শেষে দেখা যেত ঈদগার বাইরে লাঠিতে ভর দিয়ে মাথায় নেহেরু টুপি, কালো পামশু, শ্বেতশুভ্র ধুতি, কালো শেরওয়ানি পরে দাঁড়িয়ে আছেন। ঈদের জামাত শেষে মুসল্লিরা তার সঙ্গে কোলাকুলি করে ঘরে ফিরতেন।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্বের যে বন্ধন সেটি মানসিক ব্যাপার নষ্ট রাজনীতির শিকার একে হতে দেওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধকালে সীমান্তের গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমার এক মরহুম আত্মীয় মাকে মা বলে ডাকি কেন এ জন্য প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন তোরা কি হিন্দু? আম্মা না ডেকে মা ডাকিস। তিনি ভুলে গেলেও সেই কবে মারা গেছেন তবু তার প্রতি রাগটা আমার যায়নি।

এটাই ছিল তার সাম্প্রদায়িক মনের কলুষতা। ছেলেবেলায় বুঝেছি মা বাংলা শব্দ। জন্মদাতাদের মা-বাবা সম্বোধন করেছে বলে গর্ববোধ করি। বুঝতে পারি প্রতিটি সন্তানের কাছেই মা, আম্মা, মাম্মি, মাম, যে শব্দেই ডাকা হোক না কেন তার সঙ্গে অভিন্ন প্রেম ও আবেগ জড়ানো। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলাই অসুস্থতা। বর্ণবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা। এটা ভেতরে পুষে রাখুক বা বাইরে প্রকাশ করুক।

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভবনে একবার গল্পে গল্পে তুলে ধরেছিলাম আমার প্রেমের শহরের সম্পীতির চিত্র। তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। বইপাগল এই রাজনীতিবিদ বলেছিলেন, তার ছোটবেলায় তাদের বাড়িতে সুনামগঞ্জ শহরের একজন লোক তার বাবার কাছে যেতেন। তার পড়া রবীন্দ্রনাথের চয়নিকা বইটি তিনি ফেলে এসেছিলেন। সেটিতে সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরির সিল ছিল। শুনে বুকটা ভরে গিয়েছিল। সেই সম্প্রীতির শহরেও যে কোনো ধর্মীয় উসকানিতে দেখেছি সেকালের সবার ক্রিয় মিষ্টির দোকান দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভা-ারে সুযোগসন্ধানীরা হামলা করত মুনাফার আশায়। এদের অনেকেই নামাজি ছিল না।

আমাদের ছাত্রজীবনে মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও সেতুং নিয়ে আয়রনহীন কাপড় পরা বাম রাজনীতির ছায়ায় থাকা কর্মীরা উষ্কখুষ্ক চুল নিয়ে তত্ত্ব কচলাতেন। জ্ঞানের গভীরে যেতে পারুন আর নাই পারুন, বাস্তবতা বুঝুন আর নাই বুঝুন, নিজেকে বাম বলে কখনো নাক উঁচা, কখনো উগ্রতা নিয়ে গৌরবে হেঁটে বেড়ানোটাকে ফ্যাশন মনে করতেন।

অনেককে পরবর্তী জীবনে সুবিধাবাদীর তালিকায় নষ্ট আদর্শহীন রাজনীতির পথে হাঁটতে দেখেছি।

তারা এখন বিভ্রান্তির চোরাবালিতে ডুবে, বাম পথ ছেড়ে পশ্চিমা হাওয়ায় ইসলাম ধর্মের বিকৃত সমালোচনায় মনে যা খুশি তাই লিখে মুক্তচিন্তার ধারক ও বাহক হচ্ছেন। এতে ধর্মপ্রাণ মানুষরা আঘাত পাচ্ছেন। আরেক পক্ষ জিহাদি সেøাগান নিয়ে রক্তের নেশায় খুন করছেন। দু’পক্ষই সম্প্রীতি ও শান্তি বিনাশ করছেন। সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.) মাজারে সব ধর্মের মানুষরাই যাচ্ছেন। এখান থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণে শ্রী চৈতন্য দেবের আশ্রম। এভাবেই এই জনপদ যার যার ধর্ম নিয়ে শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করছেন। ধর্মের নামে, ধর্মবিদ্বেষের নামে এই শান্তি বিনষ্ট করার এখতিয়ার কারও নেই।

যেখানে রাজনৈতিক দর্শন ও নেতার প্রতি আবেগে অনেকে অন্ধ, সেখানেই ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ তার আল্লাহ রাসুল (সা.) ও পয়গম্বরদের প্রতিই নয়, নিজের ধর্মের প্রতিও অন্ধ থাকা স্বাভাবিক। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সব মত-পথের মানুষ থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল কিনটন বলেছিলেন, বাংলাদেশ একটি মডারেট মুসলিম কান্ট্রি। একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, সেই স্বপ্নের লড়াই এখনো চলছে। এখানে বাংলা নববর্ষে, একুশের প্রথম প্রহরে, বিজয় দিবসের সকালে মানুষের ঢল নামে একাত্ম হয়ে। জুমার নামাজে মসজিদের বাইরে মুসল্লিদের জনস্রোত দেখা যায়। দুর্গাপূজায় মন্দিরে মন্দিরে মানুষের জনস্রোত কিংবা ক্রিটমাসে বর্ণাঢ্য আলোকচ্ছটা শোভা পায়।

মুক্তচিন্তার নামে ধর্মবিদ্বেষ সমাজে অস্থিরতা ও হানাহানি সৃষ্টি করছে। এতে পরিবার ও রাষ্ট্রকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ হলেও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সংবিধান সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করেছে। এখানে জনগণের শক্তি ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী শক্তিকে প্রতিরোধ করে আসছে। ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তি যেভাবে গণরায় জনসমর্থন নিতে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি কবর রচিত হয়েছে বাম ও অতিবিপ্লবীদের। উগ্রতার ঠাঁই এখানে নেই।

জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক শক্তি অভিষিক্ত হয়েছে। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে যেমন ব্যক্তি বা সমাজজীবনে সাফল্য আসেনি, তেমনি মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর, নাস্তিকদের হত্যার মধ্য দিয়ে শান্তি নেমে আসেনি। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও হত্যার মধ্য দিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণের পথ যারা গ্রহণ করছেন কার্যত তারা সমাজের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। যেমনভাবে এক সময় চিহ্নিত হয়েছিলেন শ্রেণিশত্রু খতমের নামে অন্ধকার রাজনীতির অতিবিপ্লবীরা। এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য যথার্থ। দেশের জন্য একটি উদার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাই উত্তম।

রমনার বোমা হামলা ও টিএসসির লাঞ্ছিত নারীর বিচার শেষ করতে না পারা প্রশাসনের বড় ব্যর্থতা। এই ধরনের উৎসবে সব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।