ডিজিটাল বাংলাদেশ : আশা ও বিপত্তি

নিউ ইয়র্কের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ ব্যাংক থেকে সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থ চুরি যাওয়ার সংবাদ যদি পড়েন, আপনার এ ধারণা হতে পারে যে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তিতে এখনো পশ্চাত্পদ একটি দেশ। এমন ধারণা সত্যের অপলাপ মাত্র। হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি দুঃখকজন। তবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার এবং হ্যাকারদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে। বাংলাদেশ হ্যাকারদের হামলার লক্ষ্য যে হয়েছে তার কারণ হলো দেশটি বিস্তৃত পরিসরে খুব দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। বাংলাদেশে আরো অনেক খাতের মতো তথ্যপ্রযুুক্তি খাতের বিকাশ আলোর গতিতে হচ্ছে। দেশটি এরই মধ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের ডিজিটাল ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে; ব্যবস্থাটি দ্রুতগতির, সহজে ব্যবহারযোগ্য ও সুরক্ষিত। এটা সুখবর। খারাপ দিক হলো, এখনো অনেক অবকাঠামো প্রথম প্রজন্মে রয়ে গেছে, যার ফলে হ্যাকাররা হামলার সহজ লক্ষ্য মনে করছে। তবে মানোন্নয়নের কাজ চলছে। বাংলাদেশের ডিজিটাইজেশন কেমন গতিতে এগোচ্ছে? ২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি হাতে নেওয়ার সময় মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ নাগরিক ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারি সুবিধা নিত। আজ ৩৫ শতাংশ নাগরিক এ সুবিধা পাচ্ছে এবং তাদের সংখ্যা বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির সূচনা করেন। উদ্যোগটির লক্ষ্য হচ্ছে, প্রতিটি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে নাগরিকদের কাছাকাছি যাওয়া। বাংলাদেশে বহু মানুষের বাড়িতে ডেস্কটপ কম্পিউটার বা ইন্টারনেট নেই। তবে ৯৫ শতাংশ মানুষের মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ আছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে, একজন মানুষ দেশের যে স্থানেই থাকুক, তার দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া। এ কাজের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও সরকারের স্বচ্ছতাও দ্রুত বাড়ছে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি রপ্তানি হয়েছিল ২৬ মিলিয়ন (দুই কোটি ৬০ লাখ) ডলার মূল্যের। এখন ৩০০ মিলিয়ন (৩০ কোটি) ডলারেরও বেশি রপ্তানি হয়। তৈরি পোশাকশিল্প এখনো অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তবে একটি মাত্র শিল্পে নির্ভরতা ভালো কথা নয়। তাই হাইটেক খাতেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাবশালী দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আগামী দুই বছরে ৭৫ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাইজেশন যে হচ্ছে তার প্রমাণ এখানে সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সরকার দেশজুড়ে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি ডিজিটাল সেবাকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। একেকটি কেন্দ্র এমন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে যে আশপাশের গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটেই যেন যাতায়াত করা যায়। ঢাকার অদূরে ২৩১ একরের একটি হাইটেক পার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে। গত বছর ৬০ হাজার বর্গফুটের একটি সফটওয়্যার প্রযুক্তির পার্ক চালু করা হয়। এ ধরনের মোট সাতটি পার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশজুড়ে সরকার ডিজিটাল ডাটা সেন্টার স্থাপন করছে এবং তথ্যপ্রযুক্তির জন্য একটি ব্যবসা-সহায়ক কর্মসূচি চালু করেছে। এ ছাড়া দেশের এক লাখ ৭০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ চালুর ভাবনা সরকারের রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে আগামী ২০ বছরে ২০ লাখ প্রোগ্রামার প্রয়োজন হবে এবং বাংলাদেশের নিজেরও লাখ লাখ প্রোগ্রামার দরকার পড়বে। নতুন কর্মসূচিগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে, শ্রমনির্ভর দেশ থেকে ডিজিটাল দেশে রূপান্তর করা। বেসরকারি খাতেও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প এগোচ্ছে। ‘স্টার্টআপ ঢাকা’ নামে ২০১৩ সালের এক প্রামাণ্যচিত্রে এ খাতের বহু উদ্যোক্তার ওপর আলোকপাত করা হয়। এ রকম নজির অসংখ্য। যেমন বিদেশ থেকে যাঁরা বেড়াতে আসেন তাঁদের জন্য ওয়ান-স্টপ বিপণিবিতান হচ্ছে ‘ট্রিপলি’। ‘লাইটক্যাসল ডাটা’ নামের প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়ে একটি কম্পানি রিয়াল টাইম তথা চলমান সময়ে ভোক্তাদের নিয়ে গবেষণা করতে পারে। ‘লেট’স ইট থেকে সব রেস্তোরাঁর তথ্য পাওয়া যায়। ‘বঙ্গবিডি’ সাইটে বাংলা চলচ্চিত্র ও ভিডিও দেখা যায়। ‘চলো’ মোবাইল অ্যাপ দিয়ে তাত্ক্ষণিক গাড়ি ভাড়া নেওয়া যায় এবং যোগাযোগসেবা নিয়ে এ ধরনের আরো অ্যাপস আছে। বাংলাদেশে সম্ভবত সবচেয়ে জনপ্রিয় উদ্যোগটির নাম ‘চালডাল’। খাবার সরবরাহকারী এ সেবাটির পেছনে আছে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াই কম্বিনেটর’। এ ছাড়া শুধু নারীদের নেতৃত্বে অনেক প্রতিষ্ঠান চলছে, যেমন ‘মায়া’। প্রতিষ্ঠানটি মাতৃস্বাস্থ্যসহ নারীদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। বিদেশিরাও এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ পাচ্ছে। বাংলাদেশকে সেরা মেধার চৌম্বক ক্ষেত্র এবং একুশ শতকের গোড়ার এই সময়টাতে প্রযুুক্তিবিষয়ক যেসব বড় গল্প আজও বলা হয়নি তার অন্যতম।ু লেখক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক ‘ওয়াশিংটন টাইমস’-এ ‘র‌্যাপিড ডিজিটাইজেশন ব্রিংস হোপ অ্যান্ড সাম ডেঞ্জার টু বাংলাদেশ’ শিরোনামে তিনি নিবন্ধটি লিখেন – See more at: