তেজগাঁও শিল্প এলাকা হবে অত্যাধুনিক ঢাকা

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় রূপান্তরের মাস্টারপ্ল্যান (মহাপরিকল্পনা) চূড়ান্ত হয়েছে। গতকাল রোববার সচিবালয়ের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় রূপান্তর মাস্টারপ্ল্যান পর্যালোচনা’ সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় এ বিষয়ক সুপারিশমালা চূড়ান্ত করা হয়। এসব সুপারিশ শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হবে। সভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সভাপতিত্ব করেন।

গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় রূপান্তর করতে অনেকেই দাবি করেছিলেন। এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা একটি কমিটি করি। কমিটি একটি মাস্টারপ্ল্যান ফাইনাল (চূড়ান্ত) করেছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় রূপান্তরের মাধ্যমে অত্যাধুনিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এই এলাকায় যে কোনো স্থাপনা নির্মাণে মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করতে হবে। এখন মাস্টারপ্ল্যানটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। তিনি দেখবেন। তিনি ডাকলে আমরা বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করব।

তেজগাঁওয়ে সরকারি ও ব্যক্তিগত জমি আছে। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এখানে ভারী ও শ্রমঘন কোনো শিল্প থাকবে না। যে ভবনগুলো থাকবে সেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ এলাকায় কাজের জন্য আগত বা অতিথিদের গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য পৃথক পার্কিং ভবন নির্মাণ করা হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রিত প্লটগুলোয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। বেসরকারি প্লটে শিল্প, বাণিজ্যিক, হোটেল, হাসপাতাল ইত্যাদি স্থপনা নির্মাণ করা হলে পয়ঃবর্জ্য, রাসায়নিক বর্জ্য ও বায়ু পরিশোধনের নিজস্ব ব্যবস্থা থাকতে হবে। মাস্টারপ্ল্যানের বিভিন্ন সুপারিশ সঠিকভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে তেজগাঁও শিল্প মালিক কল্যাণ সমিতিকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এ সমিতি কোনো বিষয়ে ত্রুটি দেখলে তা রাজউককে জানাবে। ২০২০ সালের মধ্যে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে।

মাস্টারপ্ল্যানে উল্লেখ করা হয়েছেÑ ১৯৪৮ সালে ৫০০ দশমিক ২০ একর জমি নিয়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয়। তেজগাঁওয়ে মোট প্লটের সংখ্যা ৪৩০টি। এই এলাকা এক সময় শহরের এক প্রান্তে ছিল। বর্তমানে এটি শহরের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৮ সালে তেজগাঁও-গুলশান সংযোগ সড়কের পার্শ¦বর্তী প্লটগুলো বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তরের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন জারির পর সংযোগ সড়কের পার্শ্ববর্তী প্লটগুলো বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তর করা হয়। পরে তেজগাঁও শিল্প এলাকার অন্য প্লটের মালিকরাও শিল্প প্লটকে বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তরের আবেদন করেন। ২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এফডিসি মোড় থেকে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তার দুপাশের শিল্প প্লটগুলোকে বাণিজ্যিক প্লটে রূপান্তর করতে ডিও লেটার দেন। এরপর তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় রূপান্তরের যৌক্তিকতা ও রূপান্তরের ফলে শহরবাসী যে সুবিধা ভোগ করবে তা তুলে ধরে ২০১৪ সালে ২১ মে তেজগাঁও শিল্প মালিক কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে একটি আবেদন করা হয়। নবম জাতীয় সংসদে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ৪১ ও ৫২তম বৈঠকে তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় রূপান্তর করার সুপারিশ করা হয়।

এসব সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় রূপান্তরের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে একটি সারসংক্ষেপ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয় এবং ৮ সেপ্টেম্বর দুটি শর্তে তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় রূপান্তর প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথমত, পুরো তেজগাঁও শিল্প এলাকার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। দ্বিতীয় শর্তানুযায়ী, গণপূর্তমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ২০ সদস্যবিশিষ্ট একটি মাস্টারপ্ল্যান পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়।

মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কমিটি তেজগাঁও শিল্প এলাকার প্লটের হালনাগাদ তথ্য সংক্রান্ত ডেটাবেজ, ম্যাপ ও একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেন। কমিটি তেজগাঁও শিল্প এলাকাকে শিল্প কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা হিসেবে রূপান্তরের বিষয়ে ২১টি সুপারিশ তুলে ধরেন। এসব সুপারিশে উল্লেখ করা হয়Ñ তেজগাঁও শিল্প এলাকার ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিদ্যমান আবাসিক প্লটগুলোকে আবাসিক কাম বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যমান শিল্প প্লটগুলো শিল্প (হালকা ও স্বল্প ঘনশ্রম) কাম বাণিজ্যিক ও আবাসিক ব্যবহারে পরিবর্তন করা যেতে পারে। বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকাধীন প্লট বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অফিস, বিজনেস সেন্টার, ছোট ও মাঝারি কনভেনশন সেন্টার নির্মাণে অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় অবস্থিত খাদ্য গুদাম, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন ভবিষ্যতে অন্যত্র সুবিধাজনক স্থানে স্থানান্তরপূর্বক তদস্থলের কিছু অংশ বাণিজ্যিক প্লট আকারে বিক্রির অর্থ দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের পুনর্বাসন করা যেতে পারে।

সভায় গণপূর্ত সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, রাজউক চেয়ারম্যান জিএম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া, তেজগাঁও শিল্প মালিক কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি মোহা. নূর আলী ও গোলাম মোস্তফা, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. রইছউল আলম ম-লসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।