পদ্মায় মূল সেতুর কাজে নতুন গতি

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মাওয়া থেকে ফিরে ॥ পদ্মায় মূল সেতুর কাজে নতুন গতি আসছে। পদ্মা সেতুর বিশেষজ্ঞ প্যানেল মূল সেতুর কাজে গতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এই কাজ এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে মাটি এবং ট্রায়াল ও টেস্টিং পাইলের রিপোর্টের বিষয়েও বিশেষজ্ঞ দল পরামর্শ দিয়েছেন। তাই দ্রুত পাইল স্থাপনে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ৩৯ নম্বর পিলারে তিনটি পাইল স্থাপন হয়েছে। এখন ৩৭ নম্বর পিলারে পাইল স্থাপনে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। পাইল স্থাপনে চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে এখন। এছাড়া ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিলারর মাঝে ট্রায়াল পাইলেও অগ্রগতি রয়েছে। পাইলটির মাটি অপসারণ করা হচ্ছে। এই মাটি অপসারণের পরই কংক্রিট ঢালাই হবে। এর পরই লোড পরীক্ষা হবে।

পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইল স্থাপনে গতি আরও বাড়বে। আর সে কারণেই উচ্চ ক্ষমতার আরও একটি হ্যামার আনা হচ্ছে। আসন্ন বর্ষার পরের বর্ষার আগেই সেতুর সব পাইল স্থাপন এবং পাইলের উপরের ক্যাপ হয়ে যাবে। সেভাবেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এখন ৭০ মিটার দীর্ঘ বটম পাইল স্থাপন হচ্ছে। এর পরই বসবে টপ পাইল ও ক্যাপ। তখনই সেতুর অনেক কিছুই দৃশ্যমান হবে।

পদ্মায় মূল পিলার ৪২টি। প্রতিটি পিলারে ছয়টি করে পাইল স্থাপন করতে হবে। কাজের সুবিধার্থে তিনটি করে পাইল প্রথমে বসবে ৭০ মিটার করে। পরবর্তীতে আরও ৫০ মিটার করে এর ওপর পাইল বসানো হবে। তখনই বাকি তিনটি পাইল স্থাপন হবে। ৩৯ নম্বর পিলারের ১, ৬ ও ৩ নম্বর পাইল স্থাপন হয়েছে। ৩৮ নম্বর পিলারের কাছে ট্রায়াল পাইলের কাজ চলছে। তাই ৩৭ নম্বরে তিনটি পাইল স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। পরে করা হব ৩৮ নম্বর পিলারের কাজ। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৩৬ নম্বর পিলারও।

গত শনিবার পর্যন্ত তিন দিন ধরে প্রকল্পস্থলে অবস্থান করে পদ্মা সেতুন বিশেষজ্ঞ প্যানেল। তারা সরেজমিন পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট নিয়ে দীর্ঘ সভা করেছেন। তিন দিনের এই সভায় দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্পটির অনেক বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। তাই মূল সেতুর কাজে এখন আসবে বিশেষ গতি। প্যানেল অব এক্সপার্টের চেয়ারম্যান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্ব ১০ সদস্যই এতে অংশ নেন। কলম্বিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এং ডেনমার্কের পাঁচজন বিশেষজ্ঞ যোগ দেন। জাজিরার সার্ভিস এরিয়া-৩ মিলনায়তনে বসে তারা চলমান প্রকল্পটির নানা বিষয় চিহ্নিত করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাটি পরীক্ষায় গুণগতমান, পাইলের লোড টেস্ট রেজাল্ট, কোন্ পাইল কী পরিমাণ লোড নিতে পারছে তা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্য দিয়েই পাইল ডিজাইন ফাইনাল করে চার লেনবিশিষ্ট ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটির কাজ চলছে পুরোদমে।

মূল পাইল স্থাপনে এখন দুই হাজার ৪শ’ কিলো জুল ক্ষমতার হ্যামার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে পাইল স্থাপনে এক হাজার কিলো জুলের বেশি ক্ষমতার এখনও প্রয়োজন হচ্ছে না। তাই নতুন যে হ্যামারটি আনা হচ্ছে সেটির ক্ষমতা হবে দুই হাজার কিলো জুল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞ প্যানেল সবগুলো রিপোর্ট এবং সরেজমিন পরিদর্শনের পরই পাইলের ফাইনাল ডিজাইনের নির্দেশনা দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের অবজারভেশন অনুযায়ী এখন পুরোদমে কাজ শুরু করা হচ্ছে।

তবে বৈচিত্র্যময় পদ্মার তীব্র স্রোত আর পলিকে মোকাবেলা করতে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে গভীরে সেতুর পাইল স্থাপন করা হচ্ছে। বঙ্গোপসগারের কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় মাটির স্তরে নানা রকম বৈচিত্র্যতা রয়েছে। এসব বিবেচনায় পাইল নদীর তলদেশের প্রায় প্রায় ৪শ’ ফুট গভীরে স্থাপন করা হচ্ছে।

এদিকে, নদী শাসনেও শীঘ্রই কাজের দৃশ্যমান লক্ষ্য করা যাবে। আগামী মাসে মাওয়া প্রান্তে প্রায় ৩০ লাখ ব্লক স্থাপন করা হচ্ছে। মাওয়ার পুরনো ফেরিঘান থেকে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার এলাকার নদীর তীর বাঁধাই করে হবে। এতে মাওয়া প্রান্তে আর পদ্মার ভাঙ্গনের ঝুঁকি থাকছে না। তবে পাশের খড়িয়া গ্রামে গত বছরের ভাঙ্গনের ঘটনার পর এখন গ্রামবাসী আতঙ্কে রয়েছেন। আসন্ন বর্ষার আগেই তাদের গ্রাম রক্ষায় ড্রেজিং করে নদীর গতিপথ সঠিক করার কথা ছিল। ভাঙ্গন পরিদর্শন করে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী এবং পানিমন্ত্রী ভাঙ্গন রোধে কার্যকর পদক্ষেপের আশা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও এর সুফল পাচ্ছেন না গ্রামবাসী। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান তালুকদার জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। সামান্য কিছু ড্রেজিং করা গেলে ভাঙ্গন রোধ হবে।

এদিকে, নদী শাসনে কাওড়াকান্দি এবং জাজিরা পয়েন্টে বড় আকারের ড্রেজিং শুরু হচ্ছে আগামী সপ্তাহে। প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ প্রান্তে নদী শাসনকাজ চলছে এখন পুরোদমে। নদী শাসনের সুবিধার্থে নদীতীর ধরে একটি রাস্তাও তৈরি হয়েছে। ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের বিশাল এই প্রকল্পজুড়ে চারদিকেই চলছে নানা রকম কাজ। পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের কাজের পাশপাশি মাওয়া প্রান্তেও বিরামহীন কাজ চলছে। কুমারভোগ ইয়ার্ডে বিশাল বিশাল পাইল নির্মাণের দৃশ্য যে কাউকেই বিস্মিত করবে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাইল তৈরি হচ্ছে এখন পদ্মাপারের নিজস্ব ওয়ার্কশপে। সেখানে বিদেশীদের সঙ্গে দেশী প্রকৌশলীরাও কাজ করছেন। শুধু ওয়ার্কশপ কেন, সবখানেই বিদেশীদের সঙ্গে দেশীয় কর্মীরাও দক্ষ ভূমিকা রাখছেন। তাই এই সেতু নির্মাণে শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্র ছাড়াও দেশের বিরাট সক্ষমতা অর্জিত হবে।