একনেকে কৃষি উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা সহ ৮ প্রকল্প অনুমোদন

কৃষি উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনাসহ আট উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে তিন হাজার ৫৮৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিল থেকে এক হাজার ৫৭১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৯৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে এক হাজার ৯১৩ কোটি ৮১ লাখ ব্যয় হবে টাকা। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন- পরিকল্পনা সচিব তারিক-উল-ইসলাম, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব কানিজ ফাতেমা এবং সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম।

একনেক বৈঠকে আগামী ২০১৮ সালের মধ্যে পুরো দেশের ৯০ শতাংশ বিদ্যুতায়নের আওতায় আসবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যেভাবে বিদ্যুত উৎপাদন হচ্ছে এতে করে ৯০ শতাংশ বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে সারাদেশে বিদুতের ওভারলোডেড ট্রান্সফর্মারগুলো দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে যেসব দূতাবাস রয়েছে সেগুলো ভাড়া বাসার পরিবর্তে নিজস্ব ভবনে নিতে হবে। সৌদি আরবে নির্মাণাধীন চ্যান্সারি ভবনে যাতে কারপার্কিং এবং ভিজিটরদের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা থাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। পরিকল্পনামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর এসব বক্তব্যের বিষয়ে জনকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, গ্যাস খাতে বেসরকারী বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জামালপুর ইকোনমিক জোন স্থাপন প্রকল্পের বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আগামীতে সারাদেশে শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। গ্যাস আমদানি করার পরিকল্পনা চলছে, সেটি হলে শিল্প স্থাপনে আর সমস্যা থাকবে না। অন্যদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিষয়ে শনিবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ৬ দশমিক ৩ শতাংশ পূর্বাভাসের বিষয়ে সমালোচনা করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, তারা সব সময়ই কম পূর্বাভাস দেয়। এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, একনেক বৈঠকে শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার কাছে জানতে চান বিশ্বব্যাংক সব সময় এত কম পূর্বাভাস দেয় কেন? এর উত্তরে বলেছি বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস কম দিলেও চূড়ান্ত হিসাবে আমরা যা হিসাব করি সেটিই আবার মেনে নেয়। তারা ভাবে তাদের কম বলার কারণে আমরা কষ্ট করে হলেও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করি। এভাবে তারা ক্রেডিড নিতে চায়।

একনেক অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হচ্ছেÑ ন্যাশনাল এ্যাগ্রিকালচারাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম-২য় পর্যায় প্রকল্প, এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প, এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। প্রাণিসম্পদ উৎপাদন উপকরণ ও প্রাণিজাত খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার স্থাপন প্রকল্প, ব্যয় হবে ৬৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা। পল্লী বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের আওতায় ৭০ হাজার ওভারলোডেড বিতরণ ট্রান্সফর্মার প্রতিস্থাপন প্রকল্প, এর ব্যয় ৭৯৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্প, এর ব্যয় ৩০২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ইনস্টেলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুড়িং প্রকল্প, এর ব্যয় কমিয়ে করা হয়েছে ৮৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প, এর ব্যয় ৪৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। গাইবান্ধা-ফুলছড়ি-ভারতখালী-সাঘাটা সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প, এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।

কৃষি উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা বিষয়ে বিস্তারিত হচ্ছে, টেকসই কৃষি ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে ১৫ বছর মেয়াদী এ পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে ন্যাশনাল এ্যাগ্রিকালচার টেকনোলজি প্রোগ্রাম-দ্বিতীয় পর্যায় (এনএটিপি-২) নামের একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। ২০২১ সালের মধ্যে এটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, মৎস্য অধিদফতর, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট। এর আগে সাত বছর (২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ) মেয়াদী প্রথম পর্যায় বাস্তবায়িত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, ইফাদ এবং ইউএসএআইডি। সাত বছর মেয়াদী এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২৭১ কোটি চার লাখ এবং তিন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার ঋণ ও অনুদান থেকে এক হাজার ৬০৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

এ বিষয়ে ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি চাহিদাভিত্তিক সম্প্রসারণ সেবা প্রদান এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণে কৃষিপণ্যের (ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ) উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। তাছাড়া প্রকল্পের আওতায় উচ্চশিক্ষা, কৃষক প্রশিক্ষণ, আইসিটি যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ল্যাবরেটরি আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন করা সম্ভব হবে, যা গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে শক্তিশালী করবে। প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছেÑ ১০০টি কম্পিটেটিভ রিসার্চ গ্রান্ট (সিআরজি) প্রপ্রোজাল বাস্তবায়ন, ৩৩টি প্রোগ্রাম বেজ রিসার্চ গ্রান্ট (পিবিআরজি) প্রপ্রোজাল বাস্তবায়ন, ৪০টি উন্নত প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে প্রদর্শন করা, উচ্চশিক্ষা বাস্তবায়নে দেশের অভ্যন্তরে ৮০ জনকে এবং দেশের বাইরে ৬০ জনকে পিএইচডি বৃত্তি প্রদান, জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত উন্নয়ন, কৃষকদের সংগঠন সিআইজি গঠন এবং প্রায় ২৮ লাখ ৪১ হাজার কৃষক পরিবারের উন্নয়নসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা।