কেবল অর্থে নয় তথ্যেও সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশ

হীরক রাজার মন্ত্র ছিল ‘লেখাপড়া করে যে/ অনাহারে মরে সে। জানার কোনো শেষ নাই/ জানার চেষ্টা বৃথা তাই। লেখাপড়ায় লোকসান/ নাহি অর্থ নাহি মান। হীরক রাজা বুদ্ধিমান/ করো সবে তার জয়গান।’ এখন হীরক রাজা থাকলে তার মন্ত্র হতো, ‘জানাতে হবে প্রজাকে/পেতে হলে সম্মান। দিতে হবে তথ্য /শুনতে হলে জয়গান। তথ্যই জ্ঞান/ জ্ঞানই মান। হীরক রাজা বুদ্ধিমান/ অবাধ তথ্যপ্রবাহ তারই প্রমাণ।’ যোগাযোগবিদ ডেভিড কে বার্লোর ভাষায় ‘মানুষ সারা জীবন ধরে আর কিছুই নয়, বহু স্তরে, বহু কারণে, বহু মানুষের সঙ্গে বহুভাবে যোগাযোগ করে মাত্র।’ আর এই যোগাযোগের কেন্দ্র থাকে তথ্য। বর্তমানে দেশ, জাতি, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বে তথ্যকে ক্ষমতার প্রধান উৎস এবং উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে গণ্য করা হয়। সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তথ্যের ভূমিকা অপরিসীম। তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হচ্ছে ধনী- গরিব। কেবল আর্থিক উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন নয়, তথ্যের
দিকে থেকে পরিপূর্ণতা অর্জনও উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। বর্তমানে বাংলাদেশ
কেবল ডলারের ভিত্তিতেই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করছে না, তথ্যেও ধনী হয়ে উঠছে।
বর্তমান সরকার তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়েই ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা নাগরিকগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত এবং তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জনগণ প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক ও জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতি হ্রাস পাবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়। এই তথ্য অধিকার আইনের আলোকে যে কোনো প্রতিষ্ঠান তথ্য প্রদানে বাধ্য। তা নিশ্চিত করার জন্য গঠন করা হয়েছে তথ্য কমিশন। আর দেশের জনগণ যাতে তথ্যসমৃদ্ধ হয়ে এ সব প্রতিষ্ঠানের ওপর নজর রাখতে পারে এবং এ সব প্রতিষ্ঠান যেন তাদের নিকট দায়বদ্ধ থাকে, তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তথ্য অধিকার আইনটির সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণ এ অধিকার পাবেন বলে তথ্য কমিশন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। এর ফলে জনগণ যেমন তথ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে পাশাপাশি তারা কি করে এর প্রয়োগ ঘটাবে সে সম্পর্কেও জানতে সক্ষম হচ্ছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে জনগণের ক্ষমতায়নকেও প্রতিষ্ঠিত করে। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিতের মাধ্যমে সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য অধিকার আইনের ভূমিকা অপরিসীম। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে তথ্যই হচ্ছে প্রধান অস্ত্র। গবেষণায় পরিলক্ষিত হয়, তথ্যের অবাধ সরবরাহের সঙ্গে দুর্নীতি হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ দুর্নীতির ধারণা সূচকের ভিত্তিতে দেখা যায়, যে সব দেশ (বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ড) তথ্য অধিকার আইন গ্রহণও বাস্তবায়ন করেছে, তারাই সর্বনি¤œ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। যদিও সিঙ্গাপুর এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তথ্য অধিকার আইন ছাড়াই কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে, যা দুর্নীতির ধারণাসূচক এবং তথ্য অধিকারের মধ্যকার চূড়ান্ত সম্পর্ককে চ্যালেঞ্জ করে। বস্তুত দুর্নীতি এবং তথ্য অধিকারকে সুনির্দিষ্টভাবে সম্পর্কিত করা যায় না, কারণ তা অন্যান্য আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সর্বময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তথ্য অধিকার আইন নাগরিকের ক্ষমতায়নের সঙ্গে জড়িত এবং নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র ও এর অঙ্গসংগঠন, রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব, প্রশাসন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে।
তথ্যের সঙ্গে প্রযুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তথ্য এখন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তির সুবাদে আমরা তথ্যের মহাসাগরে ডুবে আছি। বিন্দুমাত্র সময় তথ্য থেকে দূরে থাকার কোনো সুযোগ নেই। হাতের নাগালে তথ্যপ্রাপ্তির এই পথ দেখিয়ে প্রযুক্তির নতুন নতুন আবিষ্কার হয়েছে এবং হচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ফের ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তথ্যের আলোকে প্রতিদিনের কার্যবলি সম্পাদন করতে হয়। তথ্য এখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়। পথঘাটে, যানজটে, আলাপ-আলোচনাকালে মুঠোফোনসহ নানা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে আমরা যুক্ত হতে পারছি বিশাল তথ্যভাণ্ডারে। তথ্য পেতে সেই পুরনো দিনের ভোগান্তি আর পোহাতে হয় না। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো মুহূর্তে সব বিষয়ে তথ্য প্রাপ্তির এই সুবিধা আমাদের জীবনযাত্রার মান শতগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তথ্যের আলোকে বেড়ে উঠছে আমাদের নতুন প্রজš§। তথ্যের এই সহজ প্রাপ্তিতে বর্তমানে আমাদের তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হচ্ছে। সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে তারা বিনোদনের সঙ্গে তথ্যসমৃদ্ধ হয়ে
উঠছে। তাদের সময় এখন নীরবে কাটছে তথ্যের আবরণে।
সম্প্রতি নতুন বিপ্লব বর্তমান সরকারের আমলে তৃণমূল পর্যায়ে তথ্যসেবা গ্রামীণ জনপদের চিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। পোস্ট অফিস বা ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের ঝামেলা নেই। মাঠের কৃষকের কৃষি পরামর্শ নিতে ছুটতে হয় না স্থানীয় কৃষি অফিসে। নিজের স্বাস্থ্যসেবার প্রাথমিক কাজটুকু তারা সেরে নিতে পারছেন হাতের নাগালের তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে। শুধু এগুলোই নয়, প্রায় ৬০ ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সেবাগ্রহণ করছেন তারা। গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র (ইউআইএসসি)। এখন ঘরে বসেই তারা জানতে পারছে কৃষিসংক্রান্ত তথ্য, স্বাস্থ্যসেবাসহ মাঠ পর্চার মতো জটিল বিষয়ের সহজ সমাধানও। এই তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন রকম সনদ প্রদান, ই-মেইল, ইন্টারনেট, ছবি তোলা, অনলাইনে বিভিন্ন সরকারি ফরম পূরণ, জমির খতিয়ানের আবেদন ও সরবরাহ, মোবাইল ব্যাংকিং, জীবন বীমা, বিদ্যুৎ বিল গ্রহণ, বিমানের টিকিট করা, পরীক্ষার ফলাফল জানা প্রভৃতি কাজ করা হচ্ছে।
স্কাইপিতে ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রবাসী ছেলের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন তার বৃদ্ধ মা। কম্পিউটারের মনিটরে সরাসরি দেখে নেন সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে থাকা তার বুকের মানিককে। গ্রামীণ মানুষের জীবনকে প্রযুক্তির সঙ্গে একাকার করে দিয়েছে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র। হাতের কাছেই এমন অনেক কিছুই পাচ্ছেন, যা আগে ছিল না। সামান্য একটু কাজের জন্য যেখানে উপজেলা এবং জেলায় যেতে হতো, এখন ইউনিয়ন পরিষদ তথ্যসেবা তা মিটিয়ে দিচ্ছে। এতে সময় এবং অর্থ বেঁচে যাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্র। জš§ নিবন্ধন বা মৃত্যু সনদ, কম্পিউটার কম্পোজ, ই-মেইল, ইন্টারনেট, অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আবেদন পূরণ কিংবা চাকরির আবেদন, বিদেশ যাওয়ার জন্য নিবন্ধন, বিদেশের ভিসা আবেদন এবং ভিসা যাচাই, ছবি তোলা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সব করা যাচ্ছে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে তথ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ও ইউএনডিপির প্রশাসক হেলেন ক্লার্ক যৌথভাবে দেশব্যাপী ৪ হাজার ৫০১টি ইউনিয়নে তথ্য সেবাকেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। দেশের গ্রামে এখন দেখা যায় অন্যরকম এক দৃশ্য সাইকেল চালিয়ে তরুণীরা যাচ্ছেন মানুষের বাড়ি বাড়ি, তার সঙ্গে ল্যাপটপ কম্পিউটার বা নোটবুক, ইন্টারনেট ব্যবহার করে তথ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে, কখনো গ্রামের মেয়েদের বা ছোট ছোট স্কুলের ছেলেমেয়েদের শেখাচ্ছেন কিভাবে ব্যবহার করতে হয় কম্পিউটার এদের নাম দেয়া হয়েছে ‘ইনফো-লেডি’ বা ‘তথ্য-কল্যাণী’ তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবাকে তারা নিয়ে যাচ্ছেন সরাসরি গ্রামীণ জনগণের দোরগোড়ায়।
গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতার মাধ্যমেই জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। দেশে গণমাধ্যমের বিকাশ ও অগ্রযাত্রায় বর্তমান সরকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহকে আরো বিস্তৃত করতে সরকার বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি ওয়ার্ল্ড এবং সংসদ টেলিভিশনের পাশাপাশি ৪১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সম্প্রচারের অনুমতি দিয়েছে। এর ফলে তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা সহজতর হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২৮টি এফএম বেতার কেন্দ্র এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তথ্যের এই অবাধ প্রবাহ শহর এবং গ্রামের জীবনযাত্রার মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে আনছে। সমাজের অধিকার বঞ্চিতরা উপকৃত হচ্ছে। নারী ক্ষমতায়নে তথ্যের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ।
বিজ্ঞানের কল্যাণে অত্যাধুনিক সব বাহনের সুবাদে পুরো বিশ্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। পৃথিবীর এক প্রান্তের তথ্য মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে অপর প্রান্তে। ২০১৪ সালে গ্রামীণ এলাকায় তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে বাংলাদেশ।
সাড়ে চার হাজারের মতো ইউনিয়নের লাখ লাখ মানুষের কাছে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য জাতিসংঘের একটি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকম ইউনিয়ন, আইটিইউ বাংলাদেশকে সরকারকে এই সম্মান দিয়েছে। জেনেভায় তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন খাতে মোট দশটি দেশকে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে। তথ্যই হয়ে উঠুক আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশ পরিচালনার প্রধান শক্তি। যথাযথ তথ্যপ্রবাহ পারে সরকার ও জনগণের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে। বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশের তথ্যসেবা ব্যবস্থা আরো এগিয়ে যাক। তথ্যের আলোকে সুগম হোক আগামীর পথচলা।