পার্বত্যাঞ্চলে মৎস্য চাষ উন্নয়ন বৈপ্লবিক পরিবর্তন

পার্বত্য চট্টগ্রামে মৎস্য চাষ উন্নয়ন এবং সমপ্রসারণে দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। মৎস্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলার ২৫টি উপজেলায় দু’পাহাড়ের মাঝে ক্রিকের (ঘোনায় মাছ চাষের জন্য বাঁধ) মাধ্যমে মৎস্য চাষের এ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় দু’শ ক্রিক নির্মাণ করা হয়েছে। আরও পাঁচ শতাধিক ক্রিক নির্মাণের জন্য সমপ্রতি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।
এসব ক্রিক নির্মাণের ফলে খুব সহসাই পার্বত্য এলাকায় মাছ চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং মাছ চাষের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
মাছের রেণু এবং পোনার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে ইতোমধ্যে দুটি মিনি মৎস্য হ্যাচারি নির্মাণ করা হয়েছে। খাগড়াছড়িতে আরও একটি মিনি মৎস্য হ্যাচারি নির্মাণ করা হবে বলে জানা গেছে। জুলাই ২০১২-জুন ২০১৭ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে সাড়ে আটষট্টি কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে বলে মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে।
দেশের সমতল জেলাগুলোতে পুকুর, নদী, নালা, ডোবা থাকলেও পার্বত্য এলাকায় কয়েকটি নদীছাড়া তেমন কোন নদী, নালা, পুকুর বা ডোবা নেই। বিভিন্ন পার্বত্য এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু কিছু পুকুর ও ডোবা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা সীমিত। উপরন্তু কারিগরি এবং আর্থিক সমস্যার কারণে অনেকে চাষ চাষ করতে নিজেদের পাহাড় ব্যবহার করতে পারে না। সে লক্ষ্যে দু’পাহাড়ের ঘোনার মধ্যে বাঁধ তৈরি করে সেখানে মাছ চাষ করা হচ্ছে। মূলত পার্বত্য এলাকায় মাছের চাহিদা বৃদ্ধি করার জন্য সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
সূত্র জানায়, সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্য চাষ উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ প্রকল্প (৩য় পর্যায়) নামে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। সে প্রকল্পের অধীনে পার্বত্য তিনটি জেলার ২৫টি উপজেলার প্রত্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ঝিড়ি ও পাহাড়ের মধ্যে ক্রিক তৈরি করে তাতে মাছ চাষের উপযোগী হিসেবে ইতোমধ্যে প্রায় দু’শটি ক্রিক তৈরি করা হয়েছে। আরও পাঁচ শতাধিক ক্রিক তৈরির কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্য চাষ উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও রাঙ্গামাটি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল হান্নান মিয়া জানান, এ প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, পাহাড়ি জনগণের পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং আমিষের ঘাটতি পূরণে পুষ্টিমান উন্নয়ন করা হবে।
তিনি আরও জানান, মৎস্য চাষ উন্নয়নের লক্ষ্যে পাহাড়ে ক্রিক নির্মাণের মাধ্যমে যে জলাশয় সৃষ্টি হবে তা পরবর্তীতে পানির রিজার্ভার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া মাছের পোনা উৎপাদন ও লালন পালনের লক্ষ্যে নার্সারি উন্নয়ন এবং প্রায় ছয় হাজার জনকে মাছ চাষের ওপর বিভিন্ন প্রযুক্তি প্যাকেজ ও সমপ্রসারণের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এ প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকল্পের মেয়াদকালীন সময়ে সর্বমোট ৮০৪টি ক্রিক নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
কাউখালীর দুর্গম মিতিঙ্গাছড়ি এলাকার সঞ্চয় চাকমা জানান, কাউখালী উপজেলা মৎস্য অফিসে তিনি ক্রিক নির্মাণ করে দেয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে মৎস্য অফিসের একটি প্রতিনিধিদল মিতিঙ্গাছড়ি এলাকা সরজমিনে পরিদর্শন করে এবং ক্রিক নির্মাণ হলে কারা কারা সুবিধাভোগী হবে তার সম্ভাব্যতা যাচাই বাছাই করে তা উপজেলা পরিষদ সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করা হয়।
সেখান থেকে যাচাই বাছাই শেষে এ প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা হয়। চলতি বছরের প্রথম দিকে সঞ্চয় চাকমার ক্রিকের দরপত্র আহবান করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সেই ক্রিক নির্মাণ করে মৎস্য অফিসের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন। এখন তৈরি করা সেই ক্রিকে অথৈ পানি জমেছে। পুরোপুরি মাছ চাষের জন্য উপযোগী করে তোলা হয়েছে।
কাউখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসএম চৌধুরী জানান, পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ি ঘোনায় বাঁধ দিয়ে যে ক্রিক তৈরি করা হচ্ছে তা যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায় তাহলে এ এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। তিনি ক্রিকগুলো নির্মাণের পর সেখানে মাছ চাষ করা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করার জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।
কাউখালীতে এ ধরনের আরও যাদের ক্রিক তৈরি করা হয়েছে তাদের মধ্যে মংমং মারমা,পাইচা মং মারমা ও মংচানু মারমা জানিয়েছেন, তাদের নিজেদের দু’পাহাড়ের মাঝখানে মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি করে যে ক্রিক নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে এই ক্রিকে মাছ চাষ করে বেশ কয়েকটি পরিবার অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারবে।
এ ধরনের আরও অনেক ক্রিক তিন পার্বত্য জেলার প্রতিটি উপজেলায় নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ক্রিক তৈরি করতে প্রকল্পের সুবিধাভোগিদের নিকট হতে কোন টাকা পয়সা খরচ হয়নি বলে জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্য চাষ উন্নয়ন ও সমপ্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল হান্নান মিয়া। এসব ক্রিকে মাছ চাষ সফল হলে পুরো পার্বত্যাঞ্চলের মৎস্য খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে বলে জানান তিনি।