সৌরবিদ্যুতে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া

পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী যে দুর্যোগের মুখোমুখি তার বোঝা বাংলাদেশকেই বেশি বহন করতে হবে। অথচ পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য বাংলাদেশের মানুষ খুবই কম দায়ী। যথেচ্ছ কয়লা-তেল ব্যবহার করে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ঢেলে আকাশ তাতিয়ে ফুটো করে দেয়া ধনী ও উন্নত দেশের মানুষের কর্ম। তবে বনাঞ্চল ধ্বংস, নদী ভরাট ইত্যাদি প্রকৃতি-বিরুদ্ধে কর্মে আমরাও কম যাই না। দায়ী যে বা যারাই হোক, খেসারত দিতে হবে কমবেশি সবাইকে। আজ তাই সারা বিশ্বে বিকল্প শক্তির সন্ধান চলছে। তাছাড়া কয়লা-তেল-গ্যাসের মজুদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, সে দুশ্চিন্তাও আছে। নবায়নযোগ্য বিকল্প শক্তি ছাড়া তাই মানুষের উপায় নেই। সৌরশক্তি এমনই একটা বিকল্প যা কাজে লাগানোর বিরাট সুযোগ রয়েছে। আশার কথা, আমাদের দেশও সৌরশক্তির ব্যবহারে বেশ এগিয়ে আছে। দিনেদিনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে ও আরো বাড়বে। এ অগ্রগতির গুরুত্ব কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগ মোকাবিলার দৃষ্টিতে নয়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের সার্বিক কল্যাণের দিক থেকেও অনেক।
২০১৫ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে সৌরশক্তি ব্যবহারে বাংলাদেশের এ এগিয়ে যাওয়ার একটা আশাব্যঞ্জক ছবি পাওয়া যায়। আফ্রিকার ৩টি ও এশিয়ার ৫টি দেশের মানুষের বিদ্যুৎবঞ্চনা ও সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে তাদের চাহিদা পূরণের একটা তুলনা দেয়া হয়েছে। কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েতে ৭৭, ১৫ ও ৬০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের সরবরাহ থেকে বঞ্চিত। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার, ১ লাখ ৫০ হাজার ও ১ লাখ ১৩ হাজার গৃহে সৌরবিদ্যুৎ দেয়া হয়েছে। আবার বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ৪০, ২১, ৪, ২৪ ও ১১ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের সরবরাহ থেকে বঞ্চিত। তাদের মধ্যে ৩৮ লাখ, ৮ লাখ ৯২ হাজার, ২ লাখ ৬৪ হাজার, ২ লাখ ২৯ হাজার ও ১ লাখ ৩২ হাজার গৃহে সৌরবিদ্যুৎ দেয়া হয়েছে। মানুষের ঘরে সৌরবিদ্যুৎ পেঁৗছানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য চোখে পড়ার মতো।
গত বছর জানুারিতে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম সৌরবিদ্যুতালোকিত দেশ হতে চায়।” তাতে বলা হয়, বর্তমানে দেশের দেড় কোটি মানুষ সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে, দেশের ১০ শতাংশ ঘর সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় এসেছে ও ২০১৭ সালের মধ্যে ৬০ লাখ গৃহকে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের মালিকানাধীন ইডকলের (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লি.) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ মালিক সংবাদ সংস্থাটিকে জানান, প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার পরিবারকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হচ্ছে আর ২০১৪ সালের মে মাসে ৮০ হাজারের বেশি সংযোগ দেয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনটি থেকে আরো জানা যায়, ঘরে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ফলে প্রতিবছর ২ লাখ টন কেরোসিন ও সেজন্য ১৮ কোটি মার্কিন ডলার খরচ বেঁচে যাচ্ছে।
আমাদের মতো দেশে বিদ্যুতের অভাব শিল্পক্ষেত্রের উন্নয়নে একটা বড় বাধা। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া এসব জায়গায় শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা যাবে না। এছাড়াও সৌরশক্তি ব্যবহার পদ্ধতি বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার বিভিন্ন সামাজিক সুফল আছে। ধরা যাক, রান্নার জন্য জ্বালানির কথা। সাধারণত গাছের পাতা, ডাল ইত্যাদি রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। এতে অনেকক্ষেত্রে গাছপালা নিধন হয়। এসব সংগ্রহ করতে হয় মেয়েদেরকেই। গোবর থেকে ঘুঁটে বানানোর কাজও মেয়েরাই করে। এছাড়া অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে বেশ দূর থেকে খাবার ও রান্নার পানি জোগাড় করতে হয়। বিপুল সংখ্যক নারী এসব কাজের শৃঙ্খলে আটকে পড়ে আছে। তারা শিক্ষাজীবন ধরে রাখতে পারে না ও একসময় ঝরে পড়ে। দরিদ্র পরিবারে শিশুরাও এসব কাজে ব্যস্ত থাকে, ফলে তাদের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত হয়। রান্নায় ও পানি বিশুদ্ধকরণে সৌরশক্তি ব্যবহার করা গেলে বহু নারী ও শিশু এ সনাতনী দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে পারে। আবার ঘরে বিদ্যুতের অভাবে শিশুর পড়ালেখা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌরবিদ্যুৎ সহজেই এ অভাব পূরণ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিদ্যুতালোকিত পরিবেশে শিশুরা পড়ালেখায় বেশি সময় ব্যয় করে।
২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সম্ভবপর, নির্ভরযোগ্য ও নবায়নযোগ্য শক্তি সরবরাহের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৭ পূরণে সৌরশক্তি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। পরিবেশের জন্য মঙ্গলজনক হওয়া ছাড়াও সৌরশক্তির বিভিন্ন প্রযুক্তি ইতিমধ্যে পৃথিবীতে ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। আর বিভিন্নরূপ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার চীন ও ভারতে ২ কোটি ৩০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। সুতরাং সৌরশক্তির ব্যবহার যে কেবল পরিবেশকে রক্ষা করছে তাই নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করে তা মানব উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের পরিচালক বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান এ ব্যাপারে বলেন, “যদি ব্রাজিল, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র এ পাঁচটি দেশ প্রতি বছর তাদের জিডিপির মাত্র ১.২ শতাংশ ব্যয় করে, নবায়নযোগ্য শক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১ কোটি ৪০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।”
জেমস র‌্যান্ডারসন ব্রিটেনের গার্ডিয়ান (৫ অক্টোবর ২০১৫) পত্রিকার এক লেখায় জানান, ২০০৯ সাল থেকে সৌরশক্তি ব্যবহারের খরচ ৭০ শতাংশ কমেছে এবং তা প্রতিদিনই কমছে। বেশি বেশি সৌরশক্তির ব্যবহার এখন বহু দেশের উন্নয়ননীতির অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সৌরশক্তির ব্যবহার দ্রুততম হারে বাড়ছে। এ বছর বুরু-িতে একটি সৌরক্ষেত্র তৈরি সম্পূর্ণ হবে, যা ৬০ হাজার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। তানজানিয়ার সরকার ‘১০ লাখ সৌরবাড়ি’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে যা দেশটির ১০ শতাংশ মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে ও ১৫ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
মধ্য প্রাচ্যের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণে নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষত সৌরশক্তি কী বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে, মোহা এনাজি মরক্কোর নূর ১, নূর ২, নূর ৩ ও নূর মিডেল্ট প্রকল্পের উপর এক লেখায় (প্রোজেক্ট সিন্ডিকেটে, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬) তা দেখিয়েছেন। নূর এককে পৃথিবীর বৃহত্তম সৌরশক্তি কেন্দ্র মনে করা হয়। ধারণা করা হয়, এটি ১০ লক্ষের বেশি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করবে এবং বাড়তি বিদ্যুৎ ইউরোপ ও আফ্রিকায় রপ্তানি করা যাবে। এনাজি লিখেছেন, “নিজস্ব তেল ও গ্যাস না থাকায় মরক্কোকে চাহিদার ৯৭ শতাংশ শক্তি আমদানি করতে হয়। সেখানে সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা সচল রাখার একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছে। … কোনোকোনোটি ১২ মিটার উঁচু এমন ৫ লাখ দর্পণ বসানো ৪.৫ বর্গকিলোমিটার (১.৭ বর্গমাইল) এলাকাজুড়ে স্থাপিত নূর ১ প্রকল্পের ব্যয় ৭০ কোটি ডলার।”
বাংলাদেশ সৌরশক্তি-সম্পদ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে এবং তার বিদ্যুৎ চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করতে পেরেছে। এ অগ্রগতি কেবল বজায় রাখলেই চলবে না, বাড়িবাড়ি বিদ্যুৎ পেঁৗছে দেয়ার সরকারি লক্ষ্য পূরণ করতে হলে একে আরো ত্বরান্বিত করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানোর এখনো অনেক পথ আছে, একে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার আরো অনেক সুযোগ আছে, সৌরবিদ্যুতালোকিত দেশ হয়ে ওঠার আমাদের সম্ভাবনা অনেক _ এসব কাজে লাগাতে হবে।