গাঁয়ের পথে ছুটছে অ্যাম্বুল্যান্স

গন্তব্য নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা পরিষদ। জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরত্ব। উপজেলা পরিষদে পৌঁছতে দুপুর সাড়ে ১২টা বেজে গেল। উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রবেশ করতেই একটু অবাক হতে হলো। চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন আর পরিপাটি। বিভিন্ন দপ্তরে কাজ নিয়ে আসা মানুষকে আর আগের মতো ঝক্কি-ঝামেলা সইতে হচ্ছে না। স্থাপন করা হয়েছে হেল্প ডেস্ক। পেনশনভোগীদের জন্য হয়েছে আলাদা বসার ব্যবস্থা। দাপ্তরিক সব কাজে এসেছে আলাদা মাত্রার গতি।

মাস পাঁচেক আগে মহাদেবপুর উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বদলি হয়ে এসেছেন এ কে এম তাজকির-উজ-জামান। উপজেলা পরিষদে এত সব পরিবর্তন এই তরুণ কর্মকর্তার হাত ধরেই। তাঁর সাম্প্রতিক এক পদক্ষেপে উদ্দীপ্ত মহাদেবপুরবাসী। তিনি স্বাস্থ্যসেবায় মা ও শিশুদের জন্য ভ্রাম্যমাণ অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করেছেন। ছাদে ঘূর্ণয়মান লাল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে সাইরেন বাজিয়ে গ্রামের কাঁচা-পাকা পথে ছুটে চলেছে অ্যাম্বুল্যান্স। মা ও শিশুর জরুরি সেবায় এমন উদ্যোগে এখন মহাদেবপুর উপজেলা মডেল হতে চলেছে। এই অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিসের যাত্রা শুরু হয়েছে উপজেলার ১০ নম্বর ভীমপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। গত ১১ জানুয়ারি অ্যাম্বুল্যান্সের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার হেলাল উদ্দিন আহমদ। এ সময় নওগাঁর জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

নতুন এই উদ্যোগে একটি ইজিবাইককে (চার্জার) অ্যাম্বুল্যান্সের রূপ দেওয়া হয়েছে। ভেতরে রয়েছে প্রসূতি আর সাহায্যকারীর বসার সুন্দর ব্যবস্থা। গদি আঁটা আসনে শুয়ে-বসে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রাত-বিরাতে মোবাইল ফোন থেকে কল করে ঠিকানা জানিয়ে দিলেই বাড়ির দোরগোড়ায় গিয়ে হাজির হবে এই অ্যাম্বুল্যান্স। এরপর প্রসূতিকে নিয়ে যাওয়া হবে নিকটতম ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র অথবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। জরুরি সেবা নিতে অ্যাম্বুল্যান্সের গায়েই লেখা রয়েছে মোবাইল নম্বর।

আলাপচারিতায় ভীমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রামপ্রসাদ ভদ্র জানান, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা রোগী বহনে প্রস্তুত থাকছে এই অ্যাম্বুল্যান্স। ভাড়াও অতি অল্প। আর ভাড়া বাবদ যেটুকু অর্থ পাওয়া যাবে তা থেকে এর চালক ও বাহন সংরক্ষণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয়ভাবে এর বডি তৈরি করায় ব্যয়ও হয়েছে পরিমিত।

একই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মঞ্জু রানী মণ্ডল বলেন, ‘বিভিন্ন সময় শুধু পরিবহনের অভাবে প্রসূতি ও গর্ভস্থ সন্তানকে ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। বর্তমান ইউএনও সাহেবের এই উদ্যোগ বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য বড় সহায় হবে। আর সাধারণ মানুষও এ উদ্যোগের ব্যাপক প্রশংসা করছে।’

আদিবাসী নেত্রী রেবেকা সরেন বলেন, ‘প্রত্যন্ত পল্লীতে প্রসূতি ও শিশুরা এখন থেকে এই অ্যাম্বুল্যান্সের মাধ্যমে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারবে। এতে যথাসময়ে উপযুক্ত চিকিৎসায় মা ও শিশু রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কাটিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।’

ইউএনও তাজকির-উজ-জামান বলেন, উপজেলা পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন বরাদ্দ থাকে। এর মধ্যে যোগাযোগ, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃষি, বাজার, মানবসম্পদ উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য। এর থেকে এলজিএসপির অর্থায়নে প্রায় এক লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয়ে এই অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস চালু করা হয়েছে। প্রত্যন্ত পল্লীতে একজন প্রসূতি নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে পরিবহন একটি বড় সমস্যা। স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ সেবা নিতে গিয়ে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। এ অবস্থায় ২৪ ঘণ্টাই এই পরিবহন ব্যবস্থা থাকলে প্রসূতি ও তার পরিবারের জন্য খুবই ভালো হয়।

ইউএনও বলেন, আপাতত একটি ইউনিয়নে এই অ্যাম্বুল্যান্স সার্ভিস চালু হয়েছে। আরো অ্যাম্বুল্যান্স তৈরি হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলার সব ইউনিয়নে এমন সার্ভিস চালু হবে। এভাবে সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন সেবা ছড়িয়ে দিতে পারলে প্রসূতি ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।