১০ টাকায় ‘সুখ সাগর’!

এক কেজি পেঁয়াজের দাম ১০ টাকা। দুর্মূল্যের বাজারে এই তথ্যটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না? কথাটি কিন্তু সত্য, রাজধানীর খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি ১০ টাকা। পাইকারি বাজারে আরও কম, ৭-৮ টাকা কেজি। এটি মেহেরপুরের পেঁয়াজ, উচ্চ ফলনশীল জাত ‘সুখ সাগর’।
পেঁয়াজ কত করে বিক্রি করছেন? জানতে চাইলে গতকাল শনিবার বিকেলে কারওয়ান বাজারের খুচরা সবজি বিক্রেতা আবদুল হামিদের পাল্টা প্রশ্ন, ‘কোনটা চান? ১০ টাকা থেকে ৩২ টাকা পর্যন্ত পেঁয়াজ আছে।’ কথাটা বলেই একগাল হেসে তাকালেন হামিদ। লোকটি রসিকতা করছেন কি না, বোঝার চেষ্টা করলাম। শেষে প্রশ্নটা করেই বসলাম, ‘১০ টাকায় পেঁয়াজ! কোন দেশি?’
নিজের গদিতে বসে কথা বলছিলেন আবদুল হামিদ। একজন ক্রেতা আলুর দাম জানতে চাইলেন। তাঁকে আলুর দাম বলতে বলতে এক ফাঁকে আমাকে বললেন, ‘পেঁয়াজটা মনে হয় বার্মিজ।’ কথা প্রসঙ্গে জানালেন, ‘দেশি পেঁয়াজ ৩০-৩২ টাকা ও আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ ২২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে দেশি পেঁয়াজ ৩৫ টাকা ও ভারতীয়টা ছিল ২৫-২৬ টাকা।
‘মনে হয় বার্মিজ’ শব্দটা খটকা লাগল। তাই ছুটলাম পাশের পেঁয়াজ, রসুন ও আলুর আড়তে। সেখানে লিটন আলী নামে এক আড়তদার জানালেন, ১০ টাকার পেঁয়াজ আসলে মেহেরপুরের। জিজ্ঞেস করলে বললেন, বড় আকারের দেশি পেঁয়াজের পাল্লা (৫ কেজি) ১৫০ টাকা। ছোট আকারের পেঁয়াজের পাল্লা ১৩০ টাকা। আর ভারতীয় পেঁয়াজ ১০০ টাকা পাল্লা বিক্রি হচ্ছে।’ তবে মেহেরপুরের পেঁয়াজের দাম এত কম হওয়ার বিষয়ে কিছু জানাতে পারলেন না তিনি।
আড়তের অধিকাংশ গদিতেই ‘সুখ সাগরের’ দেখা মিলল। তবে পরিমাণে দেশি ও ভারতীয় পেঁয়াজের চেয়ে অনেক কম। মেহেরপুরের পেঁয়াজটি দেখতে অনেকটা ভারতীয় পেঁয়াজের মতোই। তবে আকারে বেশ বড় এবং পেঁয়াজের গায়ের রং কালচে।
দামের বিষয়টি খোলাসা হতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলাম পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী রতন কুমার সাহার সঙ্গে। বললেন, ‘শ্যামবাজারে আজ (গতকাল) মেহেরপুরের পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭-৮ টাকা দরে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক মাস ধরেই এই পেঁয়াজটার দাম কম। তবে সম্প্রতি এতটা কমে গেল কেন সেটি আমরা ব্যবসায়ীরাও বুঝে উঠতে পারছি না। মেহেরপুরের কৃষকদের এক কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনের খরচ ১৫ টাকার কাছাকাছি। মানে অনেক টাকা লোকসান গুনছেন।’
রতন সাহা বললেন, মেহেরপুরের পেঁয়াজের মান আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের চেয়ে ভালো। তবে দেশি জাতের পেঁয়াজ ভালো উৎপাদন হয়েছে। এ ছাড়া দেশি পেঁয়াজের প্রতি মানুষের বেশি ঝোঁক ও দেখতে অতটা সুন্দর না হওয়ার কারণেই হয়তো মেহেরপুরের পেঁয়াজের চাহিদা কমে গেছে। তবে গত বছরও এতটা খারাপ অবস্থা ছিল না।
কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজের দাম কমলেও সবজি ও ব্রয়লার মুরগির দাম গত সপ্তাহের মতোই আছে। গতকাল এখানে খুচরা সবজি বিক্রেতারা আলুর কেজি ১৫-১৭, ছোট গোল আলু ২০, পটোল ৩০, করলা ২৫, মরিচ ৪০, লম্বা বেগুন ২৫-৩০, চিচিঙ্গা ৩০, পেঁপে ২০, ঢ্যাঁড়স ৩০, শিম ৩০, গাজর ২৫, টমেটো ৩০, বরবটি ৪০-৫০ টাকা দাম হাঁকেন। এ ছাড়া চীনা রসুন ১৯০-২০০, দেশি রসুন ৭০-৮০, চীনা আদা ৭০ ও দেশি আদা ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহের মতো ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা দাম হাঁকেন ব্যবসায়ীরা। আর ফার্মের মুরগির ডিমের হালি ৩২ টাকা ও হাঁসের ডিম ৩৮-৪০ টাকা।
মোহাম্মদ সুমন নামের এক খুচরা ব্যবসায়ী জানালেন, ‘শীতের সবজি শেষের দিকে। গরমের সবজি আসতে শুরু করেছে। তাই দাম এখনো কমের মধ্যেই আছে। তবে গরম যত বাড়বে, সবজির দামও বাড়তে থাকবে।’ দেলোয়ার হোসেন নামের আরেক ব্যবসায়ী বললেন, সপ্তাহ দু-একের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন সবজির আমদানি বাড়বে।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি-বিদেশি মসুর ডালের দাম ৫-৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশি মসুর ডালের কেজি ১৩৫-১৪০ টাকা, তুরস্ক ও কানাডার বড় দানার মসুরের ডাল ৯৫-১০০ এবং ছোট দানার মসুর ডাল ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।