সৌর বিদ্যুতের আলোয় ঝলমলে গ্রামের মেঠোপথ

ঘর নয়। বাড়ি নয়। আবার গ্রামও নয়। একেবারে গ্রামের মেঠোপথ। সৌর বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করছে। এমনি একটি গ্রামের নাম পাটলী। গ্রামটি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলী ইউনিয়নের পাটলী গ্রাম। এ ইউনিয়নের শুধু পাটলী গ্রামই নয়। এর আশপাশের চানপুর, কামিনীপুর, সাতহাল, সামাত, কুঞ্জনপুর ও গোয়ালকুড়ি এ ৫টি গ্রামের মেঠোপথ সৌর বিদ্যুতের আলোয় সন্ধ্যা হলেও ঝলমল শুরু করে।
এ ইউনিয়নের প্রায় ৭ কিলোমিটার গ্রামের মেঠোপথ সন্ধা থেকে সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত ঝলমল করে। এ যেন গ্রাম নয়, সবুজের সমারোহে আলোর ঝলকানি।
২০১২ সালে পাটলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল হক উদ্যোগ নেন গ্রামের রাস্তাঘাটে বিদ্যুৎ সংযোগের। সেই থেকে তিনি নিজের অর্থে ও ইউনিয়নবাসী ও প্রবাসীদের সহযোগিতায় শুরু করেন গ্রামের রাস্তায় সৌর বিদ্যুতে মাধ্যমে সড়ক বাতি স্থাপনের। যেই উদ্যোগ সেই কাজ।
পাটলী গ্রামের সচেতন যুবক মো. ফারুক মিয়া জানান, প্রথমে লোকজন গ্রামের রাস্তায় রাতের আঁধারে বাতি জলবে এ কথা বিশ্বাস করতে পারেননি। যখন সড়ক বাতি বসানো হলো তখনই সবাই হতবাক। একি কাণ্ড গ্রামের ঝোপঝাড়ে সন্ধ্যা হলেই জ্বলছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৌর বিদ্যুতের আলো।
ইউনিয়নের কুঞ্জনপুর গ্রামের হাজি জমসেদ তালুকদার জানান, রাতে কোনো তার ছাড়া বা কোনো সুইচ ছাড়াই রাস্তার ওপর বাতি জ্বলে। একি সুন্দর সিস্টেম। এখন এশা ও ফজরের নামাজ মসজিদে গিয়ে পড়তে কোনো অসুবিধা হয় না।
একই বক্তব্য চানপুর গ্রামের কুদ্দুছ মিয়ার। তিনি জানান, বাড়িতে পল্লী বিদ্যুৎ আছে। এই বিদ্যুৎ এই আছে তো এই নেই। কিন্তু গ্রামের রাস্তার ওপর বাতি ঝড়-তুফান হলেও নিভে যায় না। আপন গতিতে জ্বলতে থাকে।
কামিনীপুর গ্রামের আবদুস ছত্তার মেম্বার জানান, গ্রামের রাস্তার ওপর বাতি জ্বালাতে কোনো সুইচ টিপতে হয় না। দিনের আলো চলে গেলে নিজে নিজে সারা রাতা জ্বলে। আবার সকালে সূর্য উঠলে নিজে নিজে নিভে যায়।
পাটলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়নের ৭টি গ্রামের রাস্তায় সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোক্তা সিরাজুল হক জানান, ২০১২ সালে তার মাথায় বুদ্ধি আসে। কিভাবে গ্রামের অন্ধকার রাস্তাতে আলো জ্বালানো যায়। সেই অনুযায়ী তিনি কাজ করতে থাকেন। নিজে পকেট থেকে প্রথমে কয়েক লাখ টাকা খরচ করে পরীক্ষামূলভাবে নিজ গ্রামের রাস্তায় সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে সড়ক বাতি বসান। এ বাতি অটোমেটিকভাবে সূর্যের আলোর সঙ্গে জ্বলে ওঠে ও নিভে যায়। তিনি জানান, সন্ধ্যায় সূর্যের আলো চলে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সড়ক বাতিগুলো জ্বলে ওঠে। আবার সকালে সূর্য উঠলেই নিভে যায়। এতে নেই কোনো সুইচ টেপার ঝামেলা। নেই বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের তাগাদা।
পাটলী ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, এ ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রাম। জনসংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। এ ইউনিয়নের প্রায় ত্রিশভাগ লোক প্রবাসে থাকেন। ইউনিয়নের প্রায় গ্রামেই পল্লী বিদ্যুৎ না হয় পিডিবির বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল হক আরো জানান, ইউনিয়নের প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে প্রায় ৪শ’ সড়ক বাতি দেয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তিনি জানান, এ টাকা ইউনিয়নবাসী ও ইউনিয়নের প্রবাসে থাকা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সহযোগিতায় পাওয়া গেছে।
ইউপি চেয়ারম্যান আরো জানান, জগন্নাথপুর থেকে রসুলগঞ্জ বাজার পর্যন্ত সড়কের পাটলী ইউনিয়নের সাতহাল এলাকা থেকে রসুলগঞ্জবাজার পর্যন্ত। কামিনীপুর-পাটলী। পাটলী-কুঞ্জনপুর। গোয়ালকুড়ি-চানপুর গ্রামের সংযোগ সড়কে এসব সড়ক বাতি স্থাপন করা হয়েছে।
একটি বড় পিলারের সঙ্গে একটি ছোট সৌর প্যানেল, একটি মাঝারি সাইজের টিউবলাইট ও একটি ব্যাটারি সংযোগ করে চোখে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে চিনতে পারেন এমন দূরত্বে সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে সড়কে বাতিগুলো স্থাপন করা হয়েছে।
সিরাজুল ইসলাম আরো জানান, আগামীতে পরিষদের নির্বাচিত হয়ে আসতে পারলে তিনি ইউনিয়নের অন্যান্য গ্রামের রাস্তায় সড়ক বাতি স্থাপন করবেন।