মালদ্বীপে বাংলাদেশের মাটি!

বাংলাদেশ থেকে মাটি ও বালু নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মালদ্বীপ। খবরটি অবশ্য নতুন নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মাটি ও বালু আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছিল সিঙ্গাপুর এবং শ্রীলঙ্কা। অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, একদা নীল চাষের জন্য বিখ্যাত উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশ থেকে মাটি নিয়ে সেই সুদূর ইংল্যান্ডে নীল চাষের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ ও চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি কখনই। বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলের একমাত্র আন্তর্জাতিক নৌরুট মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলে সারা বছর নাব্য রাখার জন্য প্রতিবছর ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন হয়। এর জন্য চ্যানেলটির কম-বেশি ২০ থেকে ৩০টি পয়েন্টে নিয়মিত ড্রেজিং করতে হয়। এসব খননকৃত পয়েন্ট ইতোমধ্যে সরেজমিন ঘুরে দেখেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মালদ্বীপের হাইকমিশনার। সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন মাটির নমুনাও। মাটির ধরন ও গুণাগুণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মালদ্বীপে এই মাটির চাহিদা আছে কিনা, তা নিরূপণ করেই সে দেশে রফতানি করা যাবে মাটি। অন্যদিকে মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল প্রতিবছর খনন করতে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ মাটি ও বালু সংগৃহীত হয়ে থাকে, তা দু’পাশে স্তূপীকৃত করে রাখাও নাকি একটি সমস্যা। ২০১৪ সালে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ২৮০ কোটি টাকা দরে উত্তোলন করা হয় ১ কোটি ২৫ লাখ কিউবিক মাটি। আবার নৈমিত্তিক জোয়ার-ভাটার কারণে প্রতিনিয়ত জমে পলিমাটি, যে জন্য ৩০-৪০ ভাগ পুনরায় জমে ভরাট হয়ে যায়। প্রতিবছর প্রায় অর্ধ কোটি ঘনমিটার পলি জমার কারণে প্রায়ই নাব্য সঙ্কটও দেখা দেয়। এসব কারণেও এ অঞ্চল থেকে মালদ্বীপে মাটি ও বালু রফতানির কথা ভাবা হচ্ছে।

কারণ যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ থেকে শুধু মালদ্বীপ কেন, অন্য কোন দেশেই বালু ও মাটি রফতানি করা সঙ্গত ও সমীচীন হবে না। কারণ বাংলাদেশের পলিমাটি অত্যন্ত উর্বর ও সুফলা। বালুও নানা মূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। সর্বোপরি বাংলাদেশও রয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী বায়ুম-লে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিবৃষ্টি এবং হিমবাহের গলনে প্রতিনিয়তই বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এর ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল তলিয়ে যেতে পারে সমুদ্রগর্ভে। দ্বীপরাষ্ট্র্র হিসেবে মালদ্বীপের অস্তিত্ব থাকা নিয়েও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বৈশ্বিক মানচিত্রে। সে অবস্থায় বাংলাদেশের জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়বে এবং অনিবার্য দেখা দেবে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের সমস্যা। নদী ভাঙ্গনজনিত কারণে দেশে প্রতিবছর বাড়ছে ভূমিহীন উদ্বাস্তুর সংখ্যা। রাজধানীসহ সারাদেশের শহর-নগর-বন্দরগুলো গড়ে উঠছে শনৈঃশনৈ গতিতে। এসব উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়ও দেখা দেয় মাটি ও বালুর ঘাটতি। সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাখ লাখ ইটভাঁটিতেও মাটির চাহিদা সমধিক। এর বাইরেও কৃষিকাজে ব্যবহৃত জমিতে ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে অতি ব্যবহারে দেখা দেয় উর্বরা সঙ্কট। এসব ক্ষেত্রেই মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল থেকে খননকৃত মাটি আহরণ করে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। এতে মাটির উর্বরা শক্তি বাড়বে, অন্যদিকে ভূমিক্ষয় রোধ করা সম্ভব হতে পারে।

বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল ও নদ-নদীর অববাহিকায় ছোট-বড় অসংখ্য দ্বীপ-উপদ্বীপ, চর ও ডুবোচর রয়েছে। পরিকল্পিত উপায়ে মাটি ও বালি ফেলে এসবও ভরাট করা যেতে পারে। তাতে চাষাবাদের জমি পত্তনসহ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে সহায়ক হবে। যৎসামান্য লাভের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ থেকে মাটি রফতানি করা কোনভাবেই সঙ্গত হবে না।

Views: 12