দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় ওই অঞ্চলে গড়ে তোলা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইকোনমিক জোন), সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, এলএনজি টার্মিনাল প্রভৃতি। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে একে একে এসব প্রকল্প চালু হবে। সেই লক্ষ্যে কাজ করছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার (প্রা.) কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) আওতায় পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মাণ করা হবে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। চলতি মাসের ২৯ তারিখ কোম্পানিটির সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ডিসেম্বর থেকে দ্বিতীয় ইউনিটটি চালু করা হবে। চিনের এই কোম্পানির সঙ্গে রাষ্ট্রচালিত নর্থ-ওয়েস্ট জেনারেশন কোম্পানি যৌথ মালিকানায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করবে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে কয়লা আসবে পায়রা সমুদ্রবন্দর হয়ে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে পায়রা সমুদ্রবন্দরের অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ চলছে।

প্রসঙ্গত, ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের রাবনাবাদ চ্যানেলে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রার নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। এ সমুদ্রবন্দর ঘিরেই ওই এলাকায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলও স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশব্যাপী ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে সরকারের যে মহাপরিকল্পনা, এর মধ্যে বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন যে ৩০টি জোন, তার মধ্যে এ জোনটিও রয়েছে।

সূত্রে জানা যায়, সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে যে উন্নয়ন প্রকল্প, সেগুলো স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়নে হাতে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম।

বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ার ইসলামের সভাপতিত্বে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক সূত্রে জানা যায়, স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের আওতায় চলতি বছর থেকেই পায়রায় সীমিত পরিমাণে লাইটার ভ্যাসেল বা ছোট জাহাজ চলাচলের জন্য বন্দর উন্মুক্ত করা হয়েছে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০১৮ সালের মধ্যে আড়াই কিলোমিটার টার্মিনালসহ বন্দর পরিচালনা কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০২৩ সালের মধ্যে ১০ কিলোমিটার কনটেইনার টার্মিনালসহ বন্দরের অন্যান্য সুবিধাধী চালু করা হবে।

জানা যায়, ২০১৮ সালের মধ্যে ১০ মিটার, ২০২০ সালের মধ্যে ১৪ মিটার ও ২০২২ সালের মধ্যে ১৮ মিটার প্রস্তাবিত চ্যানেলের ড্রাফট গভীরতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ড্রেজিং করা হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পায়রা সমুদ্রবন্দর ঘিরে ওই এলাকায় ইতোমধ্যে একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রাপ্ত সুবিধাসমূহ কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলে নির্মাণ করা হবে নতুন একটি সার কারখানা। গ্যাস-সংকটের কারণে বর্তমানে দেশের সার কারখানাগুলো অনেক সময় বন্ধ রাখতে হয়। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে যেন সার কারখানা চালানো যায়, সে পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এক্ষেত্রে বন্দরের নিকটবর্তী অঞ্চলে সার কারখানা গড়ে তোলাই শ্রেয়তর।

সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাবনাবাদ চ্যানেলে ৮০ হাজার টন কয়লা পরিবাহী জাহাজ চলাচলের সক্ষমতা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে বন্দরে জেটি ও সংরক্ষণ সুবিধাও থাকবে।

এদিকে বন্দর ব্যবহার ও নির্মাণকাজের ব্যয় নির্ধারণে স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে ট্যারিফ আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, প্রতিদিন ১৩ হাজার ২৬০ টন কয়লা প্রয়োজন হবে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য। একই অঞ্চলে আরও কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে কয়লা আমদানির সুবিধার্থে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি কৌল টার্মিনাল স্থাপনেরও উদ্যোগ নিয়েছে, যার নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০১৮ সালের মধ্যে। তবে পরিকল্পনায় রয়েছে, নির্ধারিত সময়ে বন্দরের পূর্ণাঙ্গ নির্মাণকাজ শেষ না হলে রাবনাবাদ চ্যানেলের নিকটবর্তী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে সমুদ্রগামী ৭০ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মাদার ভ্যাসেল বা বড় জাহাজ থেকে প্রতিদিন ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন ছোট জাহাজের মাধ্যমে প্রকল্পের জেটিতে কয়লা আনলোড করা হবে। এ লক্ষ্যে রাবনাবাদ চ্যানেলের ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ জলভাগে অন্তত ৯ মিটার গভীরতা নিশ্চিত করতে ড্রেজিং করতে হবে, যা বর্তমানে সাড়ে চার মিটার পর্যন্ত আছে। ফলে এ চ্যানেল ড্রেজিং ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজের লক্ষ্যে বাংলদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড, পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হওয়ার কথা। যদিও কিছু বিষয়ে মতবিরোধ থাকায় তা এখনো হয়নি।

পরিকল্পনামাফিক সবকিছু এগিয়ে গেলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি পাল্টে যাবে, যা দেশের অর্থনীতিতেও ব্যাপক অবদান রাখবে। এ ছাড়া ওই অঞ্চলের ব্যাপক জনগোষ্ঠীরও কর্মসংস্থান হবে। মোট কথা, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর পাল্টে যাবে ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন-মান।