এক কোটি দরিদ্রকে ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেবে সরকার

* চালু হচ্ছে ইউনিয়ন রেশনিং * প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায়

ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ কোটি হতদরিদ্রকে ১০ টাকা কেজিতে চাল খাওয়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। নির্ধারিত মূল্যে কার্ডের মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণ নীতিমালা ২০১১ এর আওতায় খাদ্যশস্য বিতরণ কার্যক্রম পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ইউনিয়ন রেশনিং নামে একটি প্রস্তাব আগামী বুধবার সরকারি অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এই কমিটি অনুমোদন দিলেই চলতি মার্চ মাস থেকে চাল বিতরণ শুরু হবে। এতে প্রতিটি কার্ডধারীর জন্য চালের বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০ কেজি। এর জোগান আসবে সরকারি মজুদকৃত ১১ লাখ মেট্রিকটন চাল, ওএমএস (খোলাবাজারে বিক্রি), ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং), কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি (কাবিখা), পরীক্ষামূলক ত্রাণ (টিআর) ও বাজেট বাড়িয়ে ভর্তুকির মাধ্যমে। এর জন্য সরকারের ভর্তুকি প্রয়োজন হবে ৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা। এ কর্মসূচি বছরের চার মাস চালু থাকবে বলে খাদ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে স্বল্প ও সীমিত আয়ের জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহায়তা দেয়ার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চাল ও আটা এবং অন্যান্য মহানগর ও জেলা সদরে আটা বিক্রি হচ্ছে। এ কর্মসূচি উপজেলা পর্যায়েও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বল্প আয়ের দরিদ্র জনসাধারণ এ কর্মসূচির কোন সুবিধা পাচ্ছে না। এজন্য সরকারের রূপকল্প ২০২১ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০ থেকে ২০২০ প্রস্তাবিত ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ২০১৫ থেকে ২০২০ এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে ইউনিয়ন পর্যায়ে বসবাসকারী হতদরিদ্রকে স্বল্প মূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করতে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে অধিদপ্তর থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে। পাশাপাশি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে। যা আগামী অর্থনৈতিক মন্ত্রিসভা বৈঠকে পেশ করা হবে।

খাদ্য বিভাগের দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিয়ন রেশনিং আদেশ ও নীতিমালা অনুযায়ী বছরের দুই প্রান্তিকে ৪ মাসে (মার্চ-এপ্রিল ও সেপ্টেম্বর- অক্টোবর) দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ২০১১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে ১ কোটি স্বল্প আয়ের দরিদ্র পরিবারকে কার্ডপ্রতি প্রতি কেজি ১০ টাকা করে মাসিক ৩০ কেজি চাল দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে মাসে ৩ লাখ মেট্রিকটন করে চার মাসে মোট ১২ লাখ মেট্রিকটন চালের প্রয়োজন হবে। এজন্য প্রতি মেট্রিকটন ২৭ হাজার ৮৩৫ টাকা হিসেবে মাসে প্রায় ৮৩৫ কোটি টাকাসহ আর চার মাসে ৩ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।

বর্তমান অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে মার্চ ও এপ্রিল এ ২ মাসের জন্য এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে ৬ লাখ মেট্রিকটন চালের প্রয়োজন হবে। যা খাদ্য অধিদপ্তরের বর্তমান মজুদ থেকে বিতরণ করা হবে। এছাড়া ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ভিজিএফ খাতের বাজেট বরাদ্দ ৪ লাখ মে.টন চালের মধ্যে এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ মেট্রিকটন খরচ করেছে। এ খাতে আরও ১ লাখ মেট্রিকটন চাল প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে ভিজিএফ খাতের অবশিষ্ট ২ লাখ মেট্রিকটন চালের অর্থ খাদ্য মন্ত্রণালয় স্থানান্তর এবং ওএমএন খাতের বাজেট বরাদ্দ ৩ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিকটন চাল থেকে এ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ২ লাখ মেট্রিকটন। অবশিষ্ট ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিকটন এ কর্মসূচিতে স্থানান্তর করে বিতরণ করা যেতে পারে।

খাদ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, ওএমএস খাতে প্রতি কেজি চালের এক্স-গুদাম মূল্য ১৩ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু প্রস্তাবিত ইউনিয়ন সুলভ মূল্যে প্রতি কেজি চালের এক্স-গুদাম মূল্য ৮ টাকা ৫০ পয়সা। এতে ওএমএস খাতের প্রতি কেজি চালের জন্য অতিরিক্ত ভর্তুকি দাঁড়াবে ৫ টাকা। সে হিসাবে ১ লাখ মেট্রিকটন চালের নিট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ কর্মসূচি চালু হবে ভিজিএফ এবং ওএমএস খাতে ৩ লাখ মেট্রিকটন চালে। অবশিষ্ট ৩ লাখ মেট্রিকটন চালের বাজেট বৃদ্ধি করে ভর্তুকির মাধ্যমে মেটাতে হবে। এছাড়া পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে ভিজিএফ খাতের বরাদ্দ ৪ লাখ মেট্রিকটন প্রত্যাহার করে তা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাতে স্থানান্তর এবং বাকি ৮ লাখ মেট্রিকটন চাল এ খাতে বাজেট বৃদ্ধি করে ভর্তুকির মূল্য খাদ্য মন্ত্রণালয় হতে মেটানোর ব্যবস্থা করা হবে।

খাদ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা সংবাদকে বলেন, এ কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ কোটি উপকারভোগী পরিবার নির্বাচন করা হবে। উপ-জেলাওয়ারী দারিদ্র্যের সূচক ও জনসংখ্যার ঘনত্বের ভিত্তিতে যথাক্রমে ৭৫ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ উপকারভোগী পরিবার নির্বাচন করা হবে। এ কর্মসূচির আওতায় ২০১১ সালে ইউনিয়নওয়ারী মোট ৬৭ লাখ উপকারভোগীর তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল তা বর্তমানে যাচাই করে হালনাগাদ করতে হবে। দারিদ্র্যের সূচক ও জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুযায়ী ইউনিয়নওয়ারী নতুনভাবে বর্ধিত উপকারভোগী তালিকা করতে হবে। তবে কোন ইউনিয়নে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ হাজারের কম করা হবে না।

তিনি বলেন, উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য মহিলাপ্রধান পরিবার ও শিশু অন্তর্ভুক্ত পরিবারকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। মোট উপকারভোগীদের মধ্যে এ জাতীয় উপকারভোগীর সংখ্যা কত তার আলাদা হিসাব সংরক্ষণ করা হবে। এ নীতিমালার আওতায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডিলার নিয়োগের কাজ সম্পন্ন করে রাখতে হবে। যাতে উপকার ভোগীদের তালিকা অনুমোদন করার সঙ্গে সঙ্গে বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা যায়। এক্ষেত্রে আগের নিয়োজিত ডিলারদের বৈধতা-যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে কাজে লাগানো হবে।

খ্যাদ্য মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা সংবাদকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি গুদামে থাকা পুরনো চাল বিতরণে কখনো ইউনিয়ন রেশনিং, বিশেষ ভিজিএফ, কখনো দেশব্যাপী ওএমএস_ কখনো ৩৭ লাখ তৈরি পোশাককর্মীদের রেশনিংয়ের আওতায় আনার উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন কারণে ওইসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে নানা বাধা দেখা দেয়ায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বছরের পর বছর গুদামে থাকায় লাখ লাখ টন চালের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, পাশাপাশি মানও নিম্নমুখী হচ্ছে। এছাড়া সরকারি গুদামে এখনও ১১ লাখ মেট্রিকটন চাল মজুদ রয়েছে। আগামী বোর মৌসুমে সরকার আরও ১২ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু গুদাম খালি না হলে চাল সংগ্রহ করে সরকার কোথায় রাখবে? এ সংকট কাটাতে ৪ বছর পর আবার ‘সুলভমূল্য কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। খাদ্য বিভাগের প্রস্তাব আগামী অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদিত হলে আপাতত বছরের মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে এ কর্মসূচি চালানো হবে।