প্রথমবারের মত দেশে টেস্ট টিউব বাছুর জন্ম প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের সাধনার ফল

দীর্ঘ চার বছর গবেষণার পর টেস্ট টিউব পদ্ধতিতে বাছুর জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) বায়োটেকনোলজি বিভাগের একদল গবেষক। গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টায় গবেষণাগারে উত্পাদিত ভ্রুণ থেকে দেশে প্রথমবারের মত দুটি সুস্থ ও সবল টেস্ট টিউব বকনা বাছুর জন্মগ্রহণ করে।

গবেষণাগারে ভ্রুণ উত্পাদন (ইন ভিট্টো এমব্রায়ো প্রোডাকশন, আইভিপি) পদ্ধতি বিশ্বের অনেক উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে ব্যবহূত হলেও বাংলাদেশে এর ব্যবহার ছিল না।

বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদের উত্পাদন বৃদ্ধিতে বিভিন্ন ধরনের জীব-প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং এর ফলপ্রসূ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালে বিএলআরআই বায়োটেকনোলজি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর শুরু হয় বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা কার্যক্রম। যার লক্ষ্য হচ্ছে নতুন নতুন লাগসই জীব-প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং খামার পর্যায়ে তার সফল ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশে দুধ ও মাংসের উত্পাদন বাড়ানো।

বাংলাদেশে গরুর জাত উন্নয়নের জন্য বায়োটেকনোলজি বিভাগের বিজ্ঞানিগণ গত চার বছর ধরে নিরলস সাধনা করে আসছিলেন।

বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আইভিপি পদ্ধতিতে অধিক উত্পাদনশীল দাতা গাভীর ডিম্বাশয় থেকে অপরিপক্ক/বাড়ন্ত ডিম্বাণু সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পরিপক্ককরণ (ইন ভিট্টো ম্যাটিউরেশন), নিষিক্তকরণ (ইন ভিট্টো ফার্টিলাইজেশন) এবং কালচার করে ব্ল্যাস্টোসিস্ট পর্যায় পর্যন্ত বাড়িয়ে তোলা হয়। গবেষণাগারে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ৭/৮ দিন সময় লাগে। এরপর ভ্রুণ গাভীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ভ্রুণ বড় হয়ে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে ১০ মাসের কমবেশি সময়ে বাছুর জন্ম নেয়।

এভাবে একটি অধিক উত্পাদনশীল গাভী থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে কম উত্পাদনশীল ২০-২৫টি গাভীর জরায়ুতে স্থাপন করলে সমসংখ্যক বাছুর উত্পাদন করা যাবে। এতে অধিক উত্পাদনশীল গাভীর সব ডিম্বাণুর সদব্যবহারের পাশাপশি কম উত্পাদনশীল গাভীর উত্পাদন ক্ষমতা বাড়ানো যাবে।

বিএলআরআই’র মহাপরিচালক ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. তালুকদার নূরুন্নাহার বলেন, পদ্ধতিটি প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির সাথে ব্যবহার করে অধিক উত্পাদনশীল গরুর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি করা যাবে। একই সাথে স্বল্প মেয়াদে দেশের দুধ ও মাংসের ঘাটতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

তার সার্বিক দিক নির্দেশনায় ও ড. গৌতম কুমার দেবের সহযোগিতায় এই গবেষণায় আরো কাজ করেছেন ড. এস.এম. জাহাঙ্গীর হোসেন, মোছা. ফারহানা আফরোজ, মো. আহসানুল কবির এবং মো. ফয়জুল হোসেন মিরাজ। এছাড়া গাভীতে ভ্রুণ প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়নে ড. মো. সাহেব আলী বিজ্ঞানীদের সাথে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।

ড. নূরুন্নাহার আরো বলেন, আইভিপি পদ্ধতি সাধারণ মানুষকে বোঝানো গেলে বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন সময়ের ব্যাপার। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর উন্নত দেশের মতো আইভিপি প্রযুক্তি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে দেশে দুধ ও আমিষের চাহিদা সহজে পূরণ সম্ভব হবে।

এবিষয়ে বায়োটেকনোলজি বিভাগের গবেষক ড. গৌতম বলেন, চার বছর পূর্বে আমরা আইভিপি প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেই। দীর্ঘ সাধনার ফসল এই টেস্টটিউব বাছুর দুটি। এর ফলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন দিগন্তের সূচনা হল। আমরা দু’টি ভ্রুণের মাধ্যমে দুটিই সুস্থ ও সবল বকনা বাছুর পেয়েছি। বর্তমানে গাভী ও বাছুর দুটি সুস্থ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতিতে বাছুর উত্পাদনের মাধ্যমে সফলতা পেয়েছে। মানুষ যেমন ছেলে সন্তান প্রত্যাশা করেন তেমনি খামারিরা প্রত্যাশা করেন বকনা (মেয়ে) বাছুর। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে তা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।