এবার বেসরকারি খাত উন্নয়নের উদ্যোগ

দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এবার বেসরকারি খাত উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ‘প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট পলিসি কো-অর্ডিনেশন কমিটি’ কাজ শুরু করেছে। এই কার্যক্রমে তারা ব্যবসায়ে ব্যয় কমানোর জন্য ব্যাংক চার্জগুলোকে যুক্তিযুক্ত করা, কোম্পানি আইন যুগোপযোগী করা, প্রচ্ছন্ন রফতানির জন্য নীতিমালা তৈরি করা, উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা, ব্যাংকের জন্য সিএসআর নীতি সহজ করা, মহিলা উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা ও তাদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল বরাদ্দ দেয়া, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের মধ্যে সমন্বয় করা, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্যারান্টি ইস্যু করাসহ অন্যান্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এফবিসিসিআই সভাপতিসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশে ব্যবসার ব্যয় বেশি বলে উল্লেখ করেছে। এ বিষয়ে তারা ‘ডুয়িং বিজনেস’ প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। যে প্রতিবেদনে ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় বেশি ব্যয় হয় সে বিষয়ে বিশেষভাবে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি সরকার গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতকে বর্তমান পর্যায় থেকে আরো উন্নতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এই কমিটি গঠন করা হয়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত থেকে রাজস্ব প্রাপ্তির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। যে কারণে আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের চিন্তাভাবনা চলছে। এক্ষেত্রে শুধু রাজস্ব বোর্ডে রাজস্ব প্রাপ্তির প্রাক্কলন করা হতে পারে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।
এ ব্যাপারে ঢাকা চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ ইব্রাহিম গতকাল জানান, সরকার ইতিমধ্যে বেসরকারি খাতের দিকে বেশ নজর দিয়েছে। যে কারণে বেসরকারি খাতের উন্নয়নের জন্য তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু সুপারিশ চায়। সুপারিশগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো জানান, বিনিয়োগের জন্য ইতিমধ্যে ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হয়েছে। আগামীতে এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি।
জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায় ব্যয় কমানোর জন্য ব্যাংক চার্জগুলোকে যুক্তিযুক্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন সেবার চার্জ কাস্টমারকে অবহিত করা, এলসির চার্জ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিষয়টি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ কার্যক্রমের অগ্রগতি পরিবীক্ষণ করবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব মনে করেন, ব্যাংক ও বীমা অফিসগুলোর উচিত তাদের দক্ষতা বাড়ানো। এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ব্যাংকের স্প্রেড যাতে কোনোভাবে ২ শতাংশের বেশি না হয়। সে লক্ষ্য নিয়েই কাজ করা প্রয়োজন। তিনি ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা বাড়িয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে অপারেটিং ব্যয় কমানোর বিষয়টি তুলে ধরেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব উল্লেখ করেছেন, বিদেশি অর্থায়ন থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতকে ঋণ দেয়ার জন্য সুদের হার সিংগেল ডিজিট রাখা দরকার।
জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সার্কুলারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের অনেক ক্ষেত্রে তারতম্য দেখা যায়। যার ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। যে কারণে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তালিকা সমন্বয় করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় পরিবেশগত ধারণ ক্ষমতা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে এনবিআরের তালিকার মধ্যে বেশিরভাগই কমিউনিটি উন্নয়নের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সরকার কর্তৃক অনুমোদিত কর সুবিধা পাওয়ার জন্য পরিবেশগত উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ সক্ষমতা বাড়ানো, দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এনবিআর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ইতিমধ্যে সুপারিশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ব্যাংকের জন্য সিএসআর সংজ্ঞা একটি নীতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের নিজ নিজ ওয়েব সাইটের মাধ্যমে তা প্রচার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। বর্তমানে রফতানি উন্নয়ন তহবিল থাকলেও, তা অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যালোচনা করে থাকে। ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনকে মূল্য সংযোজনের হার নির্ধারণ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করে। কিন্তু বিষয়টি এখন জটিল পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে সংশ্লিষ্টরা। যে কারণে যত দ্রুত সম্ভব বিষয়টি নিষ্পত্তি করে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রচ্ছন্ন রফতানির জন্য একটি নীতিমালা তৈরি ও তা যেন সহজ হয় সে ব্যাপারে ইতিমধ্যে সুপারিশ এসেছে। তবে বাণিজ্য সচিব উল্লেখ করেছেন, এ ব্যাপারে বেসরকারি খাতের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (মূসক) উল্লেখ করেছেন নতুন আইনে আমদানি বিকল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচ্ছন্ন রফতানি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য কোম্পানি আইন সংশোধন কিংবা যুগোপযোগী করা জরুরি বলে মনে করেন ব্যবসায়ী নেতারা। এ বিষয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে খুব শিগগির কোম্পানি আইন যুগোপযোগী করা হবে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইড লাইন আপডেট করারও কথা বলা হয়েছে।
বৈঠকে রফতানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে মাংস ও মাংস পণ্য রফতানির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে একটি গাইড লাইন তৈরি করা হচ্ছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। তবে এর আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ গাইড লাইনের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করবে।
চা খাতকে কৃষি খাতে রূপান্তর করার জন্য সুপারিশ এসেছে। একই সঙ্গে সেচ ও জমি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে চা সংসদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
বৈঠকে বীজ ও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ভর্তুকি চায়ের ক্ষেত্রেও বরাদ্দ রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে চা শিল্পে ৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে ঋণের সুবিধা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কৃষিভিত্তিক শিল্পের ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিলের রেয়াত কোল্ড স্টোরেজ শিল্পের ওপর প্রযোজ্য হওয়ার ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন। বয়লার উৎপাদনের জন্য নীতিমালা সহজ করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিষয়টি এখন শিল্প মন্ত্রণালয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে বলে জানা গেছে।
বৈঠকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তা হলো মহিলা উদ্যোক্তাদের সহায়তার অর্থায়ন নীতিমালা সহজ করা। একই সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি কিংবা দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল বরাদ্দ দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।